কিস্তি আদায় বন্ধ করতে বলল কেন্দ্রীয় ব্যাংক

বন্যায় ভাসিয়ে নিয়ে গেছে ২৮ জেলার কৃষকের ক্ষেতের আউশ, রোপা-বোনা আমন। পানিতে ডুবে পচে গেছে আমনের বীজতলা। গ্রীষ্মকালীন সবজি ভেসে গেছে অনেক কৃষকের। পানি ঢুকে নষ্ট করে দিয়ে গেছে কলাবাগান ও পাট। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে করা এসব ফসল ভেসে যাওয়ায় দুর্দশার অন্ত নেই কৃষকের। এ অবস্থায় ঋণের কিস্তির জন্য কৃষকদের চাপ দিচ্ছে বিভিন্ন ব্যাংক ও এনজিওগুলো। এ পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তরফ থেকে ব্যাংকগুলোকে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কাছ থেকে ঋণের কিস্তি আদায় স্থগিত রাখতে হবে। তাতে কোনো কৃষক ঋণখেলাপি হয়ে গেলে সহজ কিস্তি আদায়ের মাধ্যমে তা নিয়মিতকরণ বা ডাউনপেমেন্টের শর্ত শিথিল করে কৃষকের ঋণ পুনঃতফসিলকরণ করতে হবে।

গতকাল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জারি করা এক সার্কুলারে এ কথা বলা হয়েছে। ব্যাংকের কৃষিঋণ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মো. হাবিবুর রহমান স্বাক্ষরিত সার্কুলারটি দেশের সব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) কাছে পাঠানো হয়েছে। সময়মতো কৃষিঋণ পরিশোধ করতে না পারলে সার্টিফিকেট মামলার আসামি হতে হয় কৃষকদের। সেই সঙ্গে বন্যার পানি সরে যাওয়ার পর নতুন করে চাষাবাদে ঋণ না পাওয়ার আশঙ্কাও আছে কৃষকের। কৃষকের এসব ভয় ও আশঙ্কা দূর করতেই এ উদ্যোগ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। কৃষকদের নামে নতুন করে সার্টিফিকেট মামলা করা যাবে না বলে সার্কুলারে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নতুন করে চাহিদা অনুযায়ী ঋণ দিতেও ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কুড়িগ্রাম, বগুড়া, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, শেরপুর, টাঙ্গাইল, জামালপুর, ফরিদপুর, শরীয়তপুর, রাজবাড়ী, মাদারীপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, চাঁদপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নীলফামারী, লালমনিরহাট, নেত্রকোনা ও মৌলভীবাজারের কৃষক উজান থেকে আসা পানি ও ভারী বৃষ্টিপাতে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় কৃষি ফসলের ক্ষতি হয়েছে উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, এ অঞ্চলের কৃষকরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে, বন্যায় দেশের ২৮ জেলার ১ লাখ ২৫ হাজার ৪১৩ হেক্টর ফসলি জমি পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এর মধ্যে আউশ ৪৩ হাজার ২৩৯ হেক্টর,  রোপা আমন ৩৬৫ হেক্টর, বোনা আমন ১৫ হাজার ২৪৩ হেক্টর, গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি ১৩ হাজার ১১৩ হেক্টর, আমন বীজতলা ১৩ হাজার ৪৩৬ হেক্টর, পাট ৩৮ হাজার ১৩৩ হেক্টর, আখ ৪৯৫ হেক্টর, কলা ৩১৭ হেক্টর এখনো পানির নিচে রয়েছে। যদিও বন্যায় কী পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তা এখনো নিরূপণ করা হয়নি। সার্কুলারে বলা হয়েছে, নতুন করে কোনো সার্টিফিকেট মামলা না করে অনাদায়ী ঋণগুলো তামাদি হওয়া প্রতিবিধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ইতিমধ্যে দায়ের করা সার্টিফিকেট মামলার তাগাদা আপাতত বন্ধ রেখে সোলেনামার মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তির পরামর্শ দিয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা যাতে প্রকৃত চাহিদা মোতাবেক যথাসময়ে  হয়রানি ছাড়াই নতুন ঋণ পান, সে বিষয়ে ব্যাংকগুলোকে নিবিড়ভাবে তদারকি করতে বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের জন্য বসতবাড়ির আঙিনায় হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালন, গোখাদ্য উৎপাদন ও ক্রয় এবং অন্যান্য আয় উৎসারি কর্মকা-ে ঋণ বিতরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে ঋণ বিতরণ বাড়াতে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর মধ্যে কতজন কৃষককে কোন খাতে, কী পরিমাণ নতুন ঋণ দেওয়া হয়েছে, কী পরিমাণ কৃষিঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে এবং সোলেনামার মাধ্যমে কী পরিমাণ সার্টিফিকেট মামলা নিষ্পত্তি করা হয়েছে, সে তথ্য প্রতিটি ব্যাংককে আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে পাঠাতে বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।