বন্যায় প্লাবিত দেশের অন্তত ২০টি জেলায় দুই হাজারেরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে; এর মধ্যে অন্তত ১১৯টিকে আশ্রয়কেন্দ্র ঘোষণা করা হয়েছে। এছাড়া তিন হাজারেরও বেশি প্রতিষ্ঠানের ভূমি, অবকাঠামো, আসবাবপত্র ও অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে পাঠানো সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য জানা গেছে। তবে প্রতিদিনই এ সংখ্যা বাড়ছে। এদিকে বন্যায় নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩২ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো জানা যায়নি।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই) জানিয়েছে, দেশের অন্তত ১৬টি জেলায় ১ হাজার ৩০০ প্রাথমিক বিদ্যালয় পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্কুল রয়েছে কুড়িগ্রামে; জেলার ১২টি উপজেলার ৫৪০টি স্কুলে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। গাইবান্ধার ৯ উপজেলায় পাঠদান বন্ধ রয়েছে ২৫৪টি স্কুলে। এছাড়া ১৪ জেলার বিভিন্ন উপজলায় পাঠদান বন্ধ, ক্ষতিগ্রস্ত ও পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে আরও কয়েকশ বিদ্যালয়।
মাউশির ৯টি আঞ্চলিক কার্যালয় থেকে ৬৪ জেলার বন্যার ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে গত বৃহস্পতিবার প্রাথমিক প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। এতে দেখা গেছে, সর্বমোট ১ হাজার ৫৫৭টি নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পানিবন্দি ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ময়মনসিংহ অঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ৫৭০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪০৮টি প্রতিষ্ঠান জামালপুরের। ময়মনসিংহে বন্যার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০ কোটি টাকা। অন্যান্য আঞ্চলিক কার্যালয় ও বিভাগের মধ্যে রাজশাহীর ১৩৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১ কোটি ২২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা, চট্টগ্রামের ৩৬টিতে ৭৯ লাখ ৫৪ হাজার টাকা, ঢাকা অঞ্চলের ৩৫টিতে ১৩ লাখ ৯০ হাজার টাকা, সিলেটের ২৫২টিতে ১০ কোটি ৮১ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং রংপুর অঞ্চলের ৫২৯টি প্রতিষ্ঠানে ৯ কোটি ৯ লাখ ৪০ হাজার টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এদিকে বন্যার পানির কারণে দেশের ১ হাজার ২৯৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে ঠিক কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো এখনো জানতে পারেনি। পানি না নামায় ক্ষতির হিসাবও সেভাবে নিরূপণ করা যাচ্ছে না। এরই মধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে বলা হয়েছে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পাঠাতে।
শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবন মেরামতের পাশাপাশি অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া হবে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এফ এম মনজুর কাদির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বন্যায় সাধারণত চর এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এজন্য এসব এলাকায় স্থায়ী ভবন নির্মাণের পরিবর্তে সহজে স্থানান্তরযোগ্য ভবন তৈরি করা হবে। এসব ভবন নির্মাণে বেশি টাকা খরচ হবে না। পানিবন্দি এলাকায় অস্থায়ীভাবে ক্লাস-পরীক্ষা চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এজন্য আমাদের জরুরি তহবিলে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে অর্থাৎ ক্ষতিগ্রস্ত জেলা-উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের চিঠি দিয়ে বন্যায় প্লাবিত বিদ্যালয়গুলোর ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ দিতে বলা হয়েছে। প্রতিদিন এসব প্রতিবেদন অধিদপ্তরে পাঠানো হচ্ছে। আগামী এক মাসের মধ্যে বন্যার পানি নেমে গেলে ওইসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতি পরিমাণ নির্ণয় করে মেরামতের কাজ শুরু করা হবে।’
অন্যদিকে মাউশির উপপরিচালক (প্রশাসন) রুহুল মমিন বলেন, ‘বন্যায় আক্রান্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ১১৯টি প্রতিষ্ঠানে আশ্রয়কেন্দ্রও খোলা হয়েছে।’ তিনি জানান, ‘মাঠপর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তাদের পাঠানো প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রাথমিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা হবে।’
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণের কাজ হয় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) অধীনে। এ বিষয়ে ইইডির প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মো. হানজালা বলেন, ‘বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয়ে কাজ করছেন মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীরা। বন্যা শেষ হলে যত দ্রুত সম্ভব ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংস্কার ও মেরামত কাজ শুরু করা হবে।’