ডাকাত আতঙ্কে ড্রেজার মালিক-শ্রমিকরা

ঢাকার পার্শ্ববর্তী বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী ও তুরাগ নদ থেকে বালু উত্তোলনের কাজে ব্যবহৃত ড্রেজার মেশিনে গভীর রাতে ঘটছে ডাকাতির ঘটনা। ওই মেশিন পরিচালনাকারী একাধিক প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, নিয়মিত চাঁদা না দিলেই গভীর রাতে ট্রলার ভরে ডাকাতি করতে আসে দুর্বৃত্তরা। বেশিরভাগ ডাকাতির ঘটনা ঘটছে মাসের ৮ থেকে ১০ তারিখের মধ্যে। রাত ২টা থেকে ৩ টার মধ্যে আচমকাই চালক, মিস্ত্রি ও শ্রমিকদের ওপর হামলা করে ড্রেজারের ব্যাটারি, ইঞ্জিনের ভেতর থাকা সেলফ খুলে নিয়ে যায় ডাকাতরা। পরে চাঁদা পরিশোধ করে ফিরিয়ে আনতে হয় এসব যন্ত্রপাতি। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ড্রেজারের ভেতরে থাকা শ্রমিকদের মোবাইল ফোন, টাকা-পয়সা সব নিয়ে যায় ডাকাতরা। বাধা দিলে মারপিট করে তাদের। ডাকাতের ভয়ে ড্রেজার মেশিনের চালক ও মিস্ত্রিরা রাতে মেশিনে থাকতে চান না। তবে চাকরি বাঁচাতে অনেকেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাত কাটায় মেশিনের ভেতরে। মাঝেমধ্যেই ডাকাতির ঘটনা ঘটলেও মামলা করারও সাহস পায় না ড্রেজার মেশিনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) অনুসন্ধানেও ডাকাতির বিষয়টি উঠে এসেছে।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, ডাকাতের উৎপাতে একটি ড্রেজার কোম্পানি এক মাস ধরে বালু উত্তোলন বন্ধ রেখেছে। রাজধানীর গাবতলীতে তুরাগ নদের সুøইসগেট এলাকায় তাদের মেশিনটি বালু উত্তোলন করত। অন্য একাধিক প্রতিষ্ঠানের ড্রেজার মেশিনগুলোও বন্ধ হওয়ার উপক্রম।

বন্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠানটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শত শত ড্রেজার মেশিন থেকে প্রতি মাসেই ডাকাতদের চাঁদা দিতে হচ্ছে। চাঁদা না পেলেই গভীর রাতে হামলা করছে তারা। রাতের বেলা এসব মেশিনে থাকা শ্রমিকদের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতাও থাকে না।’

এদিকে ড্রেজারে চাঁদাবাজি ও ডাকাতির কোনো তথ্য নেই বলে জানিয়েছে নৌ-পুলিশ। কেউ কখনো অভিযোগও করেনি বলে দাবি করেছেন নৌ-পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মাহবুবুর রহমান। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমানে নদীপথের অপরাধ অনেক কমে এসেছে। সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে চলাফেরা করছে। ড্রেজার মেশিনে ডাকাতির কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি। তবে কিছু ক্ষেত্রে এমন হতে পারে, হয়তো ভুক্তভোগীরা ভয়ে অভিযোগ করছে না। অভিযোগ এলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়। তারপরও এ বিষয়ে খবর নেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘নদীপথে নৌ-পুলিশের ফাঁড়ি রয়েছে। তারা সার্বক্ষণিক ডিউটি করে। তবে কিছু ফাঁড়িতে জনবল সংকট রয়েছে।’

৫ জুলাই রাজধানীর আদাবর থানা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হওয়া আন্তঃজেলা ডাকাত দলের ‘সরদার’ মনিরুজ্জামানের (৩৩) কাছ থেকে ড্রেজার মেশিনে ডাকাতির নানা তথ্য পায় ডিবি। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে বের হয়ে এসেছে ডাকাতির নানা তথ্য।

ডিবির সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের অর্গানাইজড ক্রাইম প্রিভেনশন দলের জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ কমিশনার নাজমুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংঘবদ্ধ একটি চক্র ঢাকার পার্শ্বে বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী ও তুরাগ নদে থাকা ড্রেজারে দীর্ঘদিন ধরে ডাকাতি করে আসছে। চক্রের কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। তারা ডাকাতির কথা স্বীকার করেছে। তাদের প্রত্যেকের নামে বিভিন্ন থানায় একাধিক খুন, ডাকাতি, অস্ত্র আইনে মামলা রয়েছে।’

ড্রেজার মেশিন-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী ও তুরাগ নদ থেকে বালু কেটে ডোবা ও গর্ত ভরাট করার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে শতাধিক মেশিন। এসব ড্রেজার মেশিন ব্যবসায় গড়ে উঠেছে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন ল্যান্ড ডেভেলপার কোম্পানিরও নিজেদের কাজের জন্য রয়েছে নিজস্ব ড্রেজার মেশিন। বর্তমানে চরম বিপাকে পড়েছে ড্রেজার মেশিনের প্রতিষ্ঠানগুলো। ডাকাতের নির্যাতনে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার চিন্তা করছে অনেকেই।

ড্রেজার মেশিনের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিটি মেশিনে ১২ ভোল্টের দুটি করে ব্যাটারি থাকে, যার প্রতিটির দাম ১৩ থেকে ১৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া ইঞ্জিনের সেলফের দাম ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা। চাঁদা না পেলে ডাকাতরা এগুলো খুলে নিয়ে যায়।

নাম প্রকাশ না করে গাবতলী তুরাগ নদের সøুইসগেট এলাকার এক ড্রেজার মেশিনের মিস্ত্রি বলেন, ‘ডাকাতদের নিয়মিত চাঁদা দিলে সমস্যা করে না। কিন্তু ড্রেজার কোম্পানি চাঁদা না দিলেই রাতে হামলা চালায় আমাদের ওপর। এক টাকা থাকলেও নিয়ে যায়। গত মাসেও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়েছে। ডাকাতের ভয়ে অনেকেই এই পেশা ছেড়ে দিচ্ছে।’

অপর এক ড্রেজার শ্রমিক বলেন, প্রতি মাসে বিকাশের মাধ্যমে চাঁদার টাকা পরিশোধ করতে হয়। এ ছাড়া কোনো কোনো ডাকাত দল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়াতে হাতে হাতেও টাকা নেয়। মাসের ৫ তারিখের মধ্যে চাঁদার টাকা পরিশোধ করতে হয়। না হলে গভীর রাতে ২০ থেকে ২৪ জন ডাকাত ট্রলারে করে এসে হামলা করে।