বিদেশি হিসেবেই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার পর মিয়ানমারে বসবাসের অনুমতি দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থোয়ে। কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে গতকাল রবিবার বিকেলে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন মিয়ানমার প্রতিনিধিদলের প্রধান মিন্ট থোয়ে। এদিকে দেশটির সেনাবাহিনীর নিপীড়নের মুখে রাখাইন থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা মুসলিম ও খ্রিস্টানরা বলছেন, নাগরিকত্ব ছাড়া তারা ফিরবেন না। তবে হিন্দুরা ফিরতে রাজি বলে প্রতিনিধিদলকে জানিয়েছেন।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘রবি ও শনিবার আমি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছি। মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন মোতাবেক তিন ধরনের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। সেই মোতাবেক আইনের তিন নম্বর ধারা অনুযায়ী যারা তিন প্রজন্ম ধরে মিয়ানমারে বসবাস করে আসছে তাদের ন্যাচারালাইজড সিটিজেনশিপ দেওয়ার বৈধতা আছে। সরাসরি নাগরিক না হলেও তাদের এ ধারার আওতায় মিয়ানমারে বিদেশি নাগরিক হিসেবে থাকার বৈধতা দেওয়া হবে। এই মোতাবেক আমরা তাদের (রোহিঙ্গা) জাতীয় আইডি (ইআইডি) কার্ড দেব। যার মাধ্যমে তাদের মধ্যে জাতীয়তা কিংবা গোত্র নিয়ে কোনো ধরনের সমস্যা থাকবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘দুদিন ধরে একাধিক বৈঠকে প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের প্রস্তুতি সম্পর্কে তাদের অবহিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তিন দফা বৈঠকে তাদের দাবিগুলো জানা গেছে। প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার তিন ক্ষেত্রে আলোচনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের সঙ্গে আলোচনা আবারও হবে। একই সঙ্গে আসিয়ান প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনা হবে। আসিয়ানের রোহিঙ্গা সংক্রান্ত মার্চ মাসে দেওয়া প্রস্তাবনা বিবেচনা করা হবে।’
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মিন্ট থোয়ে বলেন, ‘প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে উভয় পক্ষের আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এ সংক্রান্ত বৈঠক হবে ঢাকায় ফিরে।’
সকালে মিয়ানমারের ১০ সদস্যের প্রতিনিধিদলটি কুতুপালং-৪ নম্বর ক্যাম্পে যায়। সেখানে গত শনিবার দু’দফা বৈঠক করা রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ফের বৈঠকে বসেন তারা। রোহিঙ্গাদের পক্ষে মাস্টার মুহিব উল্লাহর নেতৃত্বে ৩০ সদস্যের দলটিতে পাঁচ নারীও ছিলেন। এ সময় আসিয়ানের পাঁচ প্রতিনিধিও উপস্থিত ছিলেন। দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা ওই বৈঠকে রোহিঙ্গারা নিজেদের দাবিগুলো তুলে ধরে।
বৈঠকে রোহিঙ্গাদের পক্ষে নেতৃত্ব দেওয়া ‘আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের’ চেয়ারম্যান মো. মুহিব উল্লাহ বলেন, ‘শনিবারের আলোচনা ফলপ্রসূ হয়নি। রবিবার আবার তারা বৈঠক করেছেন। আমরা আমাদের দাবিগুলো তুলে ধরেছি। তারা সেই পুরনো প্রস্তাবগুলোই আমাদের দিয়েছে। মিয়ানমারে গিয়ে আগে এডিপি ক্যাম্পে থাকতে হবে। আমরা তাদের এসব প্রস্তাবে রাজি নই।’ তিনি আরও বলেন, ‘নাগরিকত্ব না দিলে কোনো রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফিরতে রাজি নয়। মিয়ানমার প্রতিনিধিদলকে দুই মাস পর সংলাপের জন্য আবারও আসতে বলেছি।’
এরপর দুপুরে মিয়ানমারের প্রতিনিধিদলটি রাখাইন থেকে আসা হিন্দুদের ক্যাম্প পরিদর্শনে যায়। সেখানে ১০ হিন্দু ও ৪ খ্রিস্টান প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠকে বসেন তারা। এ সময় হিন্দুরা কোনো দাবি বা শর্ত ছাড়াই ফিরতে রাজি হন। তবে খ্রিস্টানরাও ফেরার জন্য প্রতিনিধিদলকে নানা শর্ত জুড়ে দেন। এরপর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব।
এর আগে গত শুক্রবার রাতে মিয়ানমার প্রতিনিধিদলটি বাংলাদেশে পৌঁছায়। পরদিন সকালে বিমানযোগে কক্সবাজারে পৌঁছান তারা। সেখানে ইনানীর হোটেল রয়েল টিউলিপে কিছুক্ষণ অবস্থানের পর উখিয়ায় পৌঁছান প্রতিনিধিদলের সদস্যরা। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দমনপীড়নের মুখে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে আসতে শুরু করে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গারা। নতুন-পুরনো মিলিয়ে বর্তমানে সাড়ে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা উখিয়া ও টেকনাফের ক্যাম্পে রয়েছে।