বরিস জনসনরা কেন দুনিয়ার নেতৃত্বে আসছেন

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে অতি দক্ষিণপন্থার জয়জয়কার দেখা যাচ্ছে। দেশে দেশে জনতুষ্টিমূলক, সাম্প্রদায়িক এবং বর্ণবাদী শাসকদের আবির্ভাব ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প, ভারতের নরেন্দ্র মোদি, অস্ট্রেলিয়ার স্কট মরিসন, ব্রাজিলের জায়ের বোলসোনারো, ফিলিপাইনের রদ্রিগো দুতার্তে, ইতালির মাত্তেও সালভিনি, তুরস্কের রিসেপ তাইপ এরদোয়ানÑ এরকম বেশ কয়েকটি নাম আমাদের সামনে চলে আসে। এ ধরনের শাসকদের ক্ষমতা গ্রহণের নেপথ্যে যে প্রধান কারণটি কাজ করছে, সেটা হলো বিশ্ব পুঁজিবাদের চরিত্রগত পরিবর্তন। ১৯৯০-এর দশক এবং সহস্রাব্দের প্রথম দিকে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণকারী করপোরেট শক্তির চাহিদা ছিল দেশগুলোর রাষ্ট্রক্ষমতায় টেকনোক্র্যাট সরকার আসীন হওয়া। এ শাসকরা একটি কর্মদক্ষ, নিরাপদ রাষ্ট্র পরিচালনা করবে এবং মুনাফাকে যেকোনো গণতান্ত্রিক পরিবর্তন থেকে রক্ষা করবে। কিন্তু নতুন সহস্রাব্দের প্রথম দশকের শেষদিকে এ বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হয়ে এখন এমন শাসকদের বেছে নেওয়া হচ্ছে, যারা ধনীদের বড় ধরনের কর ছাড় দিতে পারবে, জনগণের সুরক্ষাগুলোকে চূর্ণ করে দিতে পারবে এবং যেকোনো ধরনের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারকে ধ্বংস করতে পারবে। তাদের উদ্যোক্তাসুলভ মেধা উৎকর্ষতা থাকার দরকার নেই, কিন্তু গণবিরোধী চরিত্রের উত্তরাধিকার রক্ষা করতে হবে, মনোপলি বা একচেটিয়া পুঁজির পাহারাদার হিসেবে কাজ করতে হবে এবং বৃহৎ করপোরেশনের ভাড়াটেরূপে সেবা প্রদান করতে হবে। এ ধরনের পুঁজিবাদকে তাত্ত্বিকরা নামকরণ করেছে রুশ একটি শব্দের সঙ্গে সাযুজ্য রেখেÑ অলিগোর্কি ক্যাপিটালিজম বা গোষ্ঠী পুঁজিবাদ। এ ব্যবস্থার শাসকরা প্রধানত অভিবাসী, নারী, ইহুদি, মুসলিম, আধিপত্যহীন বিভিন্ন বর্ণের মানুষকে কল্পিত শত্রু হিসেবে জাহির করে। ১৯৩০-এর দশকের মতোই এই ব্যবস্থা পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে পুঁজিবাদীদের দ্বারা পরিচালিত এক ধরনের বিদ্রোহ।

 

যুক্তরাজ্যে সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন হওয়া কনজারভেটিভ পার্টির নেতা বরিস জনসন ওই শাসকদের গোত্রেরই প্রতিনিধিত্ব করে। টেরিজা মে পদত্যাগ করার পর গত ২২ জুলাই ব্রিটেনের ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের লক্ষ্যে ভোটগ্রহণ হয়। তাতে ওই দলের ১ লাখ ৬০ হাজার নিবন্ধিত সমর্থকের মধ্যে ৯২ হাজার ১৫৩ জন ভোট দেয় বরিস জনসনকে। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জেরেমি হান্ট পেয়েছিলেন ৪৬ হাজার ৬৫৬ ভোট। সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা জনসন সেই সময় থেকেই নানা বিতর্কের জন্ম দিয়ে আসছেন। ১৯৮৭ সালে টাইমসের প্রতিবেদক হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় তিনি একজনের উদ্ধৃতি হুবহু নকল করার অপরাধে চাকরি হারান। রাজনীতিতে এসে তিনি একের পর বিতর্কিত মন্তব্য করে তার নারীবিদ্বেষী ও বর্ণবাদী চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটান। তিনি বোরকা পরিহিত মুসলিম নারীদের কটাক্ষ করে বলেছিলেন, ‘বোরকা ও নেকাব পরিহিত নারীদের দেখতে চিঠির বাক্সের মতো লাগে।’ তিনি তাদের ‘ব্যাংক ডাকাতদের’ সঙ্গেও তুলনা করেন। ১৯৯৬ সালে ডেইলি টেলিগ্রাফে লেখা কলামে তিনি লেবার পার্টির নারী সদস্যদের ‘যৌন আবেদনময়ী’ বলে মন্তব্য করেন। তার বর্ণবাদী চরিত্র মূর্ত হয়ে উঠেছিল কৃষ্ণাঙ্গদের ‘পিক্কান্নিস’ (যুক্তরাজ্যে কৃষ্ণাঙ্গ শিশুদের তুচ্ছার্থে ব্যবহৃত শব্দ) বলে অভিহিত করার মাধ্যমে। এরকম একজন বর্ণবাদী ও গণবিরোধী চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তিকেই এখন এক সময়কার সূর্যাস্ত না হওয়া সাম্রাজ্য ব্রিটেনের শাসনভার পরিচালনার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। এর মূল কারণ তিনি ব্রিটিশ ধনিক শ্রেণি এবং করপোরেশনের স্বার্থ জুগিয়ে চলতে পারবেন।

 

১৯৮০-এর দশকে যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে মার্গারেট থেচার এবং রোনাল্ড রিগ্যানের প্রতিক্রিয়ার সময় সৃষ্টি হয়েছিল তার পুনরাবৃত্তি আবার দেখা যাচ্ছে। ১৯২০ ও ’৩০-এর দশকও আবার যেন ফিরে আসছে। সেই সময়কার জনতুষ্টিমূলক জাতীয়তাবাদী নেতাদের মতো একই চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তিরা এখন দেশ দুটির শাসন ক্ষমতায়। এই আলামতের প্রত্যাবর্তন ঘটেছে ২০১৬ সালে ব্রিটিশ ভোটাররা ব্রেক্সিটের সপক্ষে ভোট দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেছে নেওয়ার মাধ্যমে। এখন ব্রিটেনের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনকে ট্রাম্পের যোগ্য প্রতিমূর্তি রূপে অভিহিত করা হচ্ছে। জনসন নির্বাচিত হওয়ার পর সবচেয়ে উষ্ণ অভিনন্দন কিন্তু ট্রাম্পের কাছ থেকেই পেয়েছেন। ট্রাম্পের মতো তিনিও বর্ণবাদী, শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যের ধ্বজাধারী। তিনিও ট্রাম্পের মতো ধনীদের কর ছাড়ের পক্ষে, কর স্বর্গ তৈরি করার কারিগর। অর্থাৎ দুজনই অলিগোর্কির সার্থক রূপকার। ট্রাম্প যেমন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিভেদপন্থা তৈরি করছেন, তেমনি জনসনও ব্রেক্সিটের মাধ্যমে আরেক ধরনের বিভেদ তৈরি করতে চাইছেন। অবশ্য গোষ্ঠীতান্ত্রিক পুঁজিবাদের রক্ষাকর্তাদের সবার মধ্যেই এ বিভেদকামী প্রবণতা বিদ্যমান। মতাদর্শের দিক দিয়ে ট্রাম্প-জনসন যেমন অতি দক্ষিণপন্থি ও উগ্র জাতীয়তাবাদী জনতুষ্টির ধারণার ধাঁচে নিজেদের গড়ে নিয়েছেন তেমনি চারিত্রিকভাবে উভয়ই ক্ষ্যাপাটে ও বিতর্কিত। তাদেরকে কেউ কেউ ‘খুনি ভাঁড়ের’ উপাধি দিতে চাচ্ছেন। তাই তো বরিস জনসনকে ‘ব্রিটেনের ট্রাম্প’ বলে ডাকা হচ্ছে। আইরিশ মনোচিকিৎসক ও মনোবিজ্ঞানী ইয়ান হুগস দুজনকে ‘অপ্রকৃতিস্থ মানসিকতার’ অধিকারী বলে অভিমত দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের শাসন ব্যবস্থাতেও এক ধরনের সাদৃশ্য বিরাজ করছে। উভয় দেশেই প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের বাইরে অন্য দলগুলোর অবস্থান খুবই ক্ষীণ এবং নতুন কোনো বিকল্প শক্তির উত্থানও ঘটছে না। যদিও যুক্তরাষ্ট্রে বার্নি স্যান্ডার্স ও আলেকজান্দ্রিয়া কর্টেজ এবং যুক্তরাজ্যে জেরোমি করবিনের মতো নেতৃত্ব ভিন্নস্বর উপস্থাপন করছেন, কিন্তু বড় ধরনের প্রাধান্য এখনো তৈরি করতে পারেননি। আর ট্রাম্প-জনসনের বিরোধিতাকারী ডেমোক্রেট পার্টি এবং লেবার পার্টি এখনো পর্যন্ত বিশ্বায়নের ফলে কর্মচ্যুত বিশাল শ্রমবাহিনীর ব্যাপারে কার্যকরী ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ জেফরি ডি. সাচের মতে, ট্রাম্প ও জনসনের উত্থান প্রকৃত অর্থে গভীর রাজনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত প্রদান করে।

 

বরিস জনসনের অতীতই প্রমাণ করে তিনি কীভাবে করপোরেট পুঁজির স্বার্থ রক্ষা করেছেন। তিনি যখন ২০০৮ থেকে ’১৬ পর্যন্ত লন্ডন শহরের মেয়র ছিলেন, তখন তার বিরুদ্ধে নগরের কোষাগারের ১০০ কোটি পাউন্ডের অনর্থক অপচয়ের অভিযোগ আনা হয়েছিল। ওই সময়ে লন্ডনের পুলিশ বড় ধরনের নিরাপত্তা হুমকিতে ছিল এবং উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পুলিশ কর্মকর্তা বরখাস্ত হয়েছিলেন। শহরের অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষা সরঞ্জামের বড় ঘাটতি ছিল এবং এগুলোর ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়েছিল। সামাজিক সেবা খাতগুলোতে নানা সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল এবং মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসার অবনমন হয়েছিল। পরিবহন ব্যবস্থায় নানা ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় জনদুর্ভোগ তৈরি হয়েছিল। তিনি উক্সব্রিজ ও দক্ষিণ রুইসিøপের সাংসদ হিসেবে হিথ্রো বিমানবন্দরের জন্য জনগুরুত্বপূর্ণ তৃতীয় রানওয়ে নির্মাণের ব্যাপারে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছিলেন। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি আয়ারল্যান্ডের সীমান্ত ব্যাপারে অজ্ঞতাপ্রসূত পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।

 

তবে ব্রিটেনের পার্লামেন্টে বরিস জনসনের অবস্থানকে শক্তপোক্ত বলা যাবে না, বরং তার ভাগ্য কিছুটা সুতোর ওপর ঝুলছে। সব বিরোধীরা টেরিজা মে’কে যতটা বিরোধিতা করেছে, তার চেয়ে বেশি সংহত অবস্থায় তারা জনসনের বিরুদ্ধে রয়েছে। অবস্থা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, মাত্র দুজন রক্ষণশীল টোরি দলের পার্লামেন্ট সদস্য জনসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তাকে সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দিতে হবে। বিশ্লেষকদের ধারণা, যদি নির্বাচন হয় আর যদি তিনি তার দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে ব্যর্থ হন তাহলে তার ভরাডুবি ঘটবে এবং তিনি ব্রিটেনের সবচেয়ে স্বল্পমেয়াদের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগ করতে বাধ্য হবেন। তার হাতে চুক্তি ছাড়াই ব্রেক্সিট সম্পন্ন করার জন্য সময়ও খুব কম। মাত্র তিন মাসের মধ্যে এটাকে বাস্তবে রূপদান করতে গিয়ে জনসনকে পদে পদে তীব্র বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হবে। আর এই সময়সীমাকে নির্বিঘেœ পার করাতে চাইলে তাকে করছাড়, জনগণের ব্যয় সংকোচন এবং ‘কেইনসিয়ান’ রাজস্ব উদ্দীপনার মতো অর্থনৈতিক নীতি প্রয়োগ করতে হবে। অর্থাৎ কঠোর কৃচ্ছ্রসাধনের পথে হাঁটতে হবে তাকে।

 

গোটা বিশ্ব আজ এক সন্ধিক্ষণে অবস্থান করছে। চলমান বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা থেকে পরিত্রাণের পথ হাতড়ে বেড়াচ্ছে পুঁজিবাদ। আর জনগণ বিভ্রান্ত হয়ে বেছে নিচ্ছে ট্রাম্প বা জনসনের মতো উগ্র জাতীয়তাবাদী জনতুষ্টির ধারকদের। কিন্তু পরিত্রাণ না মিলে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে। তবে এই সংকটেও পথ দেখাচ্ছে বার্নি স্যান্ডার্স, আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও কর্টেজ কিংবা জেরোমি করবিনদের মতো নেতাদের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকা, পাশাপাশি এককেন্দ্রিক বিশ্ব থেকে বহুকেন্দ্রিক বিশ্বে রূপান্তরিত হওয়ার আকাক্সক্ষার প্রতি দেশে দেশে দিন দিন মানুষের আগ্রহ ও আস্থায়।

লেখক

সাংবাদিক