রাজধানীর বুড়িগঙ্গা নদীকে বাঁচাতে হাজারীবাগের ট্যানারি নিয়ে যাওয়া হয় সাভারের হেমায়েতপুরে। এজন্য স্থাপন করা হয় চামড়া শিল্পনগরী। কিন্তু ১৬ বছরে স্থাপন করা যায়নি একটি কার্যকর আধুনিক কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি)। ফলে ট্যানারির বিষাক্ত পানিতে নষ্ট হচ্ছে ওখানকার ধলেশ্বরী নদী। এছাড়া ট্যানারির বর্জ্য রাখায় হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। জায়গা স্বল্পতায় ছোট পাহাড়সম উঁচু করে ট্যানারির বর্জ্য রাখার পরও দখল হয়ে গেছে চলাচলের রাস্তা। দুর্গন্ধে আশপাশের বাসিন্দাদের টেকাও দায় হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় সিইটিপি সংলগ্ন নিচু জমিতে ডাম্পিং ইয়ার্ড স্থাপন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সিইটিপিকে কার্যকর করতে নতুন করে আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনের প্রক্রিয়া চলেছ।
শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, গত ৩০ জুন নাগাদ চামড়া শিল্পনগরীতে ১২৩টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন শুরু করেছে। তবে সবাই পুরোপুরি কাজ শুরু করেনি। অনেকে আংশিকভাবে কাজ শুরু করেছে। এ অবস্থাতেই প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্জ্য নিয়ে বেকায়দায় পড়েছেন সংশ্লিষ্টরা। গত মঙ্গলবার সকালে হেমায়েতপুরের চামড়া শিল্পনগরীতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সিইটিপির কাছেই রয়েছে একটি অস্থায়ী বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশন। বর্জ্য ফেলতে ফেলতে ছোট একটি জায়গায় ছোট পাহাড়ের টিলার মতো করা হয়েছে। জায়গা স্বল্পতায় আশপাশের যাতায়াতের রাস্তাও বন্ধ করে ফেলা হয়েছে। তাতেও জায়গা হচ্ছে না। ছোট ট্রাকে করে বর্জ্য এনে তা ফেলছেন কয়েকজন শ্রমিক। দেলোয়ার নামে একজন শ্রমিক দেশ রূপান্তরকে জানান, পরিত্যক্ত ময়লার পরিমাণ প্রতিদিনই বাড়ছে। এখনই এই ময়লা রাখার জায়গা নেই। এজন্য ট্যানারির ময়লার ট্রাক স্তূপের ওপর উঠিয়ে সেখান থেকে খালাস করা হচ্ছে। তিনি বলেন, কোরবানির ঈদে এর চাপ আরও বাড়বে। তখন কী হবে বলা মুশকিল।
অপরদিকে দেখা যায়, একটি ভেকু গাড়ি দিয়ে চলাচলের রাস্তা পরিষ্কারের চেষ্টা করা হচ্ছে। যদিও এই বর্জ্য পাশেই রাখা হচ্ছে। এর কারণ জানতে চাইলে আরিফ নামে আরেক শ্রমিক জানান, চামড়া শিল্পনগরীতে মন্ত্রণালয়ের বড় অফিসার এসেছেন। তিনি এই জায়গা পরিদর্শন করতে পারেন। যেতে যেন সমস্যা না হয়, তাই সাময়িক এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সমস্যার কথা স্বীকার করে শিল্পসচিব আবদুল হালিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ট্যানারির বর্জ্য ডাম্পিং নিয়ে কিছুটা সমস্যা আছে। এজন্য একটি প্রকল্পও হাতে নেওয়া হয়েছে। আমরা সিইটিপির পাশে নিচু জায়গায় ৬ একর জমিতে ডাম্পিং ইয়ার্ড নির্মাণ করব। এছাড়া এই বর্জ্য কাজে লাগানোর কথা চিন্তা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ২-৩টি প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হয়েছে, যারা এসব বর্জ্য দিয়ে বাই-প্রোডাক্ট তৈরি করবে।
সরেজমিনে সিইটিপিতে গিয়ে দেখা যায়, তরল বর্জ্য পরিশোধনে চলমান রয়েছে সিইটিপি। কিন্তু এসব তরল বর্জ্য সঠিকভাবে পরিশোধন হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এজন্য পাশের ধলেশ^রী নদীর পানি নষ্ট হচ্ছে। বুড়িগঙ্গার মতো নষ্ট হচ্ছে ধলেশ^রী নদীর পানি।
এ বিষয়ে চামড়া শিল্পনগরী প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) জিতেন্দ্রনাথ পাল বলেন, লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের মানদ-ে ১৬০০ প্যারামিটার রয়েছে। এর মধ্যে ১০০ প্যারামিটার কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার প্ল্যান্ট সংক্রান্ত। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে অবশিষ্ট ১৫০০ প্যারামিটার অনুযায়ী চামড়া শিল্পনগরীতে স্থাপিত ট্যানারিগুলোর উৎপাদন প্রক্রিয়ার মান উন্নয়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার প্ল্যান্টে ক্রোম সেপারেশন ও সেডিমেন্টেশনের মান উন্নতকরণের প্রক্রিয়া চলছে। তিনি বলেন, এজন্য বেশ কিছু প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানি করা হয়েছে, যা চট্টগ্রাম বন্দরে আছে। শিগগিরই সেগুলো সাভারে নিয়ে আসা হবে। তখন বর্জ্য ডাম্পিং নিয়েও প্রশ্ন উঠবে না।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চামড়া শিল্পে সাধারণত দুই ধরনের বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে একটি কঠিন, আরেকটি তরল। এই বর্জ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা না হলে বিভিন্নভাবে পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। উৎপন্ন তরল বর্জ্যরে মধ্যে ক্রোমযুক্ত লিকার থেকে ক্রোম আলাদা করে অবশিষ্ট পানিকে সিইটিপির মাধ্যমে পরিশোধন করে নদীতে ফেলার কথা রয়েছে। অন্য কঠিন বর্জ্য ডাম্পিং ইয়ার্ডে রাখার কথা। কিন্তু ব্যবস্থাপনার অভাবে সেটা হচ্ছে না। এ বিষয়ে প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বুয়েটের বিআরটিসির টিম লিডার প্রফেসর ড. মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কিছু সমস্যা রয়েছে এটা ঠিক। কিন্তু এতে এখনো নদীর পানিকে সেভাবে দূষিত করছে না। আমরা নিয়মিত সেটা পরীক্ষা করে দেখছি। তবে পরিশোধন আরও উন্নত করতে হবে। এর বিকল্প নেই।
শিল্প মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০০৩ সালে এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৭৫ কোটি টাকা। তবে বর্তমানে এর মোট প্রাক্কলিত ব্যয় এসে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এর মধ্যে ট্যানারি স্থানান্তরের অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়েছে ২৬০ কোটি টাকা, যার ২৩০ কোটি টাকা ইতিমধ্যে ট্যানারি মালিকদের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯৪ দশমিক ৪০ একর জায়গার ওপর নির্মিত সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে ১৫৫টি শিল্প ইউনিট আছে। এর মধ্যে ১৫৪টি প্লট বরাদ্দ করা হয়েছে। মামলাজনিত কারণে ১টি প্লট বরাদ্দপত্র জারি করা হয়নি। লে-আউট প্ল্যান অনুমোদন করা হয়েছে ১৫৪টির। কারখানার মূল ভবনের কাজ বাস্তবায়ন শুরু করেছে ১৫১টি প্লটে।