উপেক্ষিত বানভাসি মানুষের পাশে দাঁড়ান

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক। সে অনেক দিন আগের কথা। হরেনবাবু নিজের গ্রাম ছেড়ে দূরে এক শহরে চাকরি করেন। এক দিন হঠাৎ দেখলেন অফিসে বাড়ির কাজের লোক পঞ্চানন তথা পচা এসে হাজির। জিজ্ঞেস করলেন, কী রে তুই হঠাৎ? মাথা চুলকোতে চুলকোতে সে উত্তর দিল, বাড়ির পশ্চিমে দুটি শিরীষগাছ কাটতে হয়েছে। হরেনবাবু অবাকÑ এই খবরটা দিতে তুই এত দূর এসেছিস! তা কাটতে হলো কেন? সে আরও মাথা নিচু করে উত্তর দিল, জি আজ্ঞে, বুড়ো হাড় কি কম কাঠে পোড়ে? হরেনবাবু একটু চমকে গিয়ে বললেন, বুড়ো হাড়, মানে? আজ্ঞে আপনার মাতো বুড়োই ছিলেন, তাই তাকে পোড়াতে অনেক কাঠ লাগল। সে কী! আমার মা মারা গেছেন? তা আজ্ঞে কচি নাতির শোক বুড়ো মানুষ সইতে পারলেন না। সে কী রে! আমার ছেলেও...! কচি ছেলে, মায়ের দুধ না পেলে আর বাঁচবে কী করে?

হরেনবাবু চিৎকার করে ওঠেন, আমার স্ত্রীও মারা গেছে!

এই তিনটি সংবাদ গ্রামের পচা প্রভুর কাছে নিরুত্তাপ কণ্ঠে পৌঁছে দিল! গ্রামের মানুষ, বিশেষ করে দরিদ্র মানুষ দেশের কাছে, দলের কাছে অনেক সুসংবাদ বা দুঃসংবাদ এমনই নির্বিকার ভঙ্গিতে পৌঁছে দেয়! আমাদের দেশের শাসকরাও বর্তমানে নির্লিপ্ত ও নির্বিকার ভঙ্গিতে বিভিন্ন দুঃসংবাদের নিদান দিচ্ছেন। যেন দেশে কিছুই হয়নি বা কিছুই হচ্ছে না! অথচ দেশে বর্তমানে ভয়াবহ দুর্যোগ নেমে এসেছে। একদিকে মহামারী আকারে সারা দেশে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে, অন্যদিকে সীমান্তের ওপার থেকে নেমে আসা জল এবং ব্যাপক বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের অনেক অঞ্চলে বন্যা দেখা দিয়েছে। বন্যার কারণে লাখ লাখ মানুষ নিদারুণ কষ্ট ভোগ করছে। তাদের কষ্ট মোচনের কোনো উদ্যোগ নেই। নারী নির্যাতন, ছেলেধরা গুজবে পিটিয়ে হত্যা, ডেঙ্গু, সিলেটের কারা-উপমহাপরিদর্শকের বাসার ছাদ থেকে ঘুষের ৮০ লাখ টাকা উদ্ধার ইত্যাদি ঘটনার ডামাডোলে এবার দেশের বন্যার খবর খুব একটা পাত্তা পায়নি। অথচ বন্যায় এবার লাখ লাখ মানুষ কয়েক সপ্তাহ ধরে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। জান-মালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হেলথ ইমারজেন্সি অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের হিসাব মতে, এ পর্যন্ত বন্যায় ১১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের বেশির ভাগই হচ্ছে শিশু-কিশোর। যাদের বড় অংশ পানিতে ডুবে মারা গেছে। এ ছাড়া বন্যায় হাজার হাজার মানুষ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছে।

 

প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে দেশের ২৮টি জেলায় বন্যা চলছে। এর মধ্যে অন্তত ১১টি জেলার বন্যা পরিস্থিতি এখনো ভয়াবহ। এসব জেলার নদীতে পানি এখনো বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলো হচ্ছেÑ কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, জামালপুর, সিলেট, রাজবাড়ী, টাঙ্গাইল, নাটোর, বগুড়া ও মৌলভীবাজার। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, কুড়িগ্রাম সদর, গাইবান্ধা সদর, সিরাজগঞ্জের কাজিপুর ও শাহজাদপুর, সুনামগঞ্জ সদর, জামালপুরের ইসলামপুর, সিলেটের কানাইঘাট, জকিগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ, নাটোরের সিংড়া, বগুড়ার সারিয়াকান্দি এবং মৌলভীবাজার জেলার সদর উপজেলার কয়েক লাখ মানুষ এখনো পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। বন্যার প্রভাবে এসব জেলা-উপজেলার আশপাশের উপজেলা এবং এর আওতাধীন বহু ইউনিয়ন বন্যায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় এসব জেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ অবকাঠামোর। রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট ভেঙে গেছে। ভেসে গেছে ফসলি জমি, মাছের খামার। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঘরবাড়ি, স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার অবকাঠামো। বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় বানভাসি মানুষজন বাড়িতে ফিরতে শুরু করলেও ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি নিয়ে পড়েছে বিপাকে। বিশেষ করে চরাঞ্চলের মানুষগুলো অর্থের অভাবে ঘরবাড়ি মেরামত করতে পারছে না। অন্যদিকে, খাবার ও পর্যাপ্ত ত্রাণ-সহায়তা না পাওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ পৌঁছেছে চরমে। বন্যাকবলিত এলাকাগুলোয় শিশু ও বৃদ্ধরা আক্রান্ত হচ্ছে নানা পানিবাহিত রোগে। চরাঞ্চলগুলোতে গো-খাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে দেখা দিয়েছে নদীভাঙন। নদী বিশেষজ্ঞ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, বন্যার পানি নামতে শুরু করায় আগামী দু-তিন দিনের মধ্যে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর ও মাদারীপুরে ভাঙন বেশি হতে পারে। সরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (সিইজিআইএস) পূর্বাভাসেও এই জেলাগুলোতে নদীভাঙন বেশি হওয়ার পূর্বাভাস ছিল। এবার বন্যার পানি বেশি দিন ওই এলাকায় অবস্থান করায় ভাঙন পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি হতে পারে বলে সংস্থাটির বিজ্ঞানীরা মনে করেছেন।

 

এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস বলছে, চলতি সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন স্থানে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা আছে। চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে। বন্যার পানি এখন নামতে শুরু করেছে। কিন্তু এতে কি সমস্যার সমাধান হবে? বাস্তবে মানুষের সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করবে। কারণ, বন্যায় আক্রান্ত পরিবারগুলো সর্বস্বান্ত হয়েছে। বাড়িঘর হারানো কৃষকরা এখন ঘরবাড়ি ঠিক করবে কীভাবে, পরবর্তী চাষের প্রস্তুতি কীভাবে নেবে আবার এরই মধ্যে যে ঋণ তাদের আছে, এনজিওগুলোর কাছে তার শোধই-বা কী করে দেবেÑ এই ভয়ংকর সংকটে তারা পড়েছে। এই সংকটের সমাধান না করতে পেরে একটা বড় সংখ্যার কৃষক গ্রামে যতটুকু জমি ছিল তা বিক্রি করে কাজের আশায় শহরে পাড়ি জমাবে। এরা সংখ্যায় এক-দুজন নয়, হাজার হাজার। গ্রামে বেকার হয়ে শহরে আসবে আরও লাখো লোক। দলে দলে শহরে আসা এই লোকদের জন্য শহরে কোনো কাজ নেই। ফলে একদিকে শ্রম সস্তা হবে, অন্যদিকে সামাজিক জীবনে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে ভীষণভাবে। এর সামাজিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী। একটা বিরাটসংখ্যক কর্মক্ষম লোক বেকার হয়ে যাওয়া, ছেলেমেয়ে স্কুল থেকে ঝরে পড়া, এক একটা জনপদ ধরে ধরে লোকরা ঘর ছেড়ে রাস্তায় নামাÑ এটা শুধু ওই মানুষগুলোর বিষয় আর থাকে না শেষ পর্যন্ত। ওই এলাকার অর্থনীতির ওপরও তার প্রভাব পড়ে। ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের একটা অংশ উচ্ছেদ হবে। কাজ হারাবে ওইসব ব্যবসায়ের সঙ্গে যুক্ত থাকা কর্মচারী, দিনমজুররা। সবমিলিয়ে এক জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকবে না।

 

আবার বন্যার পানি নামার সময় নানা রকম পানিবাহিত রোগ মহামারী আকারে দেখা দেবে অথচ এই অবস্থা মোকাবিলা করার জন্য কোনো উদ্যোগ-আয়োজন সরকারের পক্ষ থেকে নেই। ভেঙে পড়া স্কুলঘর, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণে কোনো ত্বরিত পদক্ষেপ সরকারের পক্ষ থেকে লক্ষ করা যাচ্ছে না। একেবারেই মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছে বন্যায় আক্রান্ত মানুষরা। কবি সুকান্ত বলেছিলেন, ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।’ ক্ষুধা লাগলে সবকিছুকে খাবার মনে হয়। অন্যদিকে কবি নজরুল লিখেছিলেন, ‘ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত, একটু নুন, বেলা বয়ে যায়, খায়নি ক’ বাছা, কচি পেটে তার জ্বলে আগুন।’ অর্থাৎ ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হচ্ছে খাদ্য। খাদ্য হচ্ছে মানুষের প্রাথমিক প্রয়োজন। বিশেষ করে আর্ত-দুর্গত মানুষের। তাদের খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের হাতে ত্রাণ পৌঁছাতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারকে অবশ্যই বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ‘সব ঠিক আছে, সবকিছু ঠিকঠাকমতো চলছে’ এই আপ্তবাক্য না আউড়িয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-এমপিদের দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। বন্যাকবলিত এলাকার কৃষকদের সব ধরনের কৃষিঋণ, এনজিওর ঋণ মওকুফ অথবা তারা পরে সুবিধাজনক সময়ে শোধ দিতে পারেÑ তেমন উদ্যোগ নিতে হবে। তারা যাতে সর্বস্বান্ত হওয়া এই

কৃষকদের ওপর কোনো চাপ প্রয়োগ না করতে পারে, সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে হবে। কৃষকদের বিনামূল্যে বীজ সরবরাহ করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করতে হবে। ছাত্রদের বেতন ও অন্যান্য ফি আগামী এক বছরের জন্য মওকুফ করে দিতে হবে। বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করতে হবে। বন্যাকবলিত এলাকায় উপযুক্ত চিকিৎসাব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। একেবারে ভেতরের এলাকাগুলোতেও মেডিকেল টিম পাঠাতে হবে। বন্যা-পরবর্তী মহামারী প্রতিরোধ করতে হবে।

নির্লিপ্ত-নির্বিকার ভূমিকার পরিবর্তে সরকার সক্রিয়ভাবে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াক, লোক-দেখানো উদ্যোগের পরিবর্তে বাস্তবমুখী কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করুকÑ এ মুহূর্তে বানভাসি মানুষের এটাই প্রত্যাশা।