জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন

প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক

চাকরিদাতারা খুঁজছেন দক্ষ ও যোগ্য প্রার্থী। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিলে পদভেদে হাজার হাজার, এমনকি লাখ লাখ আবেদন পড়ে। কিন্তু পছন্দমতো যোগ্য প্রার্থী অনেক সময়ই পান না তারা। অথচ সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবেই দেশে বেকার ও আংশিক বেকারের সংখ্যা প্রায় ৭১ লাখ। মাস্টার্স পাস কোনো কোনো বেকার অষ্টম শ্রেণি পাসের চাকরির জন্য আবেদন করেন, এমন কথাও শোনা যায়। অন্যদিকে দক্ষ শ্রমিকের অভাব দেশের প্রধান প্রধান শিল্প খাতগুলোয়। দেশের মোট আটটি খাতে চাহিদার তুলনায় বর্তমানে শ্রমিক কম রয়েছে ১৭ লাখ ২৭ হাজার। সঙ্গে রয়েছে মধ্যম সারির কর্মকর্তার সংকটও। ফলে অনেক বেশি বেতন দিয়ে বিদেশ থেকে দক্ষ কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়ে আনতে হয়।

এ অবস্থায় কয়েক বছর ধরে দক্ষতা উন্নয়নে বিশ্লেষকরা জোর দেওয়ার পর জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ গঠন করেছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন এ কর্র্তৃপক্ষ সম্প্রতি দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন নীতিমালা জারি করেছে। ফলে নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে নিবন্ধন নেওয়া ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান প্রশিক্ষণ দিতে পারবে না।

২০১৭ সালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা পরিষদের (বিআইডিএস) ১৮ জন গবেষকের করা ‘বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও দক্ষতার ঘাটতি’ সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল নাগাদ দেশে বিভিন্ন খাতে মোট ৮ কোটি ৮৭ লাখ শ্রমিকের দরকার হবে। এই সময় পর্যন্ত দেশের ৯টি শিল্প খাতে নিয়োগ দিতে হবে আরও ১ কোটি ৬৬ লাখ ৮৪ হাজার নতুন শ্রমিক। তাদের মধ্যে দক্ষ শ্রমিক লাগবে ৮০ লাখ, আধাদক্ষ ৫৬ লাখ, অদক্ষ শ্রমিক লাগবে ৩১ লাখ। ৮০ লাখ দক্ষ শ্রমিকের জোগান নিশ্চিত করতে হলে আগামী আট বছরে ৫৬ লাখ শ্রমিককে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষিত বেকাররা প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষতা অর্জন করতে পারলে বেকারত্ব যেমন ঘুচবে, ঘটবে অর্থনৈতিক উন্নয়নও। তা না হলে উভয় সংকটে ভুগবে বাংলাদেশ।

সমীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে এসএসসি ও এইচএসসি পাসের পর উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার ঝোঁক বাড়ছে। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হলেও তাদের মধ্যে কোনো বিষয়ে দক্ষতা গড়ে উঠছে না।

আর উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যেসব বিষয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছে, তার সঙ্গে শিল্প খাতের চাহিদার কোনো সামঞ্জস্য নেই। আর উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে কোনো একটি কারিগরি বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়া বা ডিপ্লোমা সম্পন্ন করার আগ্রহ থাকে না। ফলে শিল্প খাতে এসব উচ্চশিক্ষিত দক্ষ শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রেও অযোগ্য বলে বিবেচিত হচ্ছেন। ফলে শিল্প খাতে শিক্ষিত শ্রমিকের সংকট রয়েছে। তবে এসএসসি ও এইচএসসি পাসের পর যারা বিভিন্ন কারিগরি প্রশিক্ষণ নিচ্ছে, তাদের মধ্যে বেকারত্বের হার খুবই কম।

বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে তাদের বিভিন্ন শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষতা অর্জনের সুপারিশ করে সমীক্ষায় বলা হয়েছে, এজন্য উচ্চশিক্ষা কারিকুলামেও পরিবর্তন আনা জরুরি।  

বেকারত্ব ঘোচাতে অনেকেই বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। এ সুযোগে দেশজুড়ে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে উঠছে। নীতিমালা জারির মাধ্যমে এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রকে যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

গত ৩০ জুলাই জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের জারি করা নীতিমালায় বলা হয়েছে, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ পদ্ধতি উদ্ভাবন, বিদ্যমান পদ্ধতি সংস্কার ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণদানকারীর সক্ষমতা ও প্রশিক্ষণের গুণগত মান বজায় রাখার জন্য এই নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রশিক্ষণদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে ওয়ার্কশপ, কম্পিউটার ল্যাব, লাইব্রেরি, প্রশিক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা, ছেলেমেয়েদের আলাদা টয়লেট থাকতে হবে। নিবন্ধনকালে অন্তত একটি পেশায় প্রশিক্ষণের জন্য প্রতিষ্ঠানের ন্যূনতম আয়তন ১০০ বর্গমিটার হতে হবে। বিদ্যুৎ সংযোগ থাকতে হবে। যে পেশার দক্ষতা অর্জনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, ওই পেশার দক্ষতা অর্জনের জন্য ন্যূনতম কারিগরি উপকরণ ও যন্ত্রপাতি থাকতে হবে। শ্রেণিকক্ষ ও ল্যাবে প্রতিটি পেশার জন্য ন্যূনতম ৩০ জন প্রশিক্ষণার্থী বসার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক চেয়ার, টেবিল ও অন্যান্য আসবাবপত্র থাকতে হবে।

বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ন্যূনতম জনবল কাঠামো নির্ধারণ করে দিয়ে নীতিমালায় বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ বা পরিচালককে কমপক্ষে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে ৫ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

১০ বছরের অভিজ্ঞরা স্বীকৃত পলিটেকনিক থেকে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিংধারী হলেও পরিচালক হতে পারবেন। এছাড়া প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে দুজন ট্রেড ইনস্ট্রাকটর থাকতে হবে। একজন করে অফিস এক্সিকিউটিভ, ল্যাব বা কম্পিউটার অ্যাসিস্ট্যান্ট থাকতে হবে। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের নামে চলতি আমানত হিসেবে দুই লাখ টাকা জমা থাকতে হবে। এছাড়া স্থায়ী আমানত হিসেবে কমপক্ষে তিন লাখ টাকা জমা থাকতে হবে।

বিআইডিএসের সিনিয়র গবেষক ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, সরকার ও বেসরকারি খাত এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিতে পারে। আর চাকরিপ্রার্থীরাও নিজের পছন্দমতো প্রশিক্ষণ নিয়ে সহজেই চাকরি পেতে পারেন।

ব্রিটিশ আমল থেকেই এখানকার শিক্ষিতরা ‘হোয়াইট কলার জব’ বা কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি পেতে চায়। কিন্তু বাস্তবতা পাল্টে গেছে। এখন বাংলাদেশ শুধু নয়, উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশগুলোতেও কর্মকর্তার বদলে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা বাড়ছে। তিনি জানান, একজন দক্ষ শ্রমিক মাঝারি মানের কর্মকর্তার চেয়েও বেশি বেতন পাচ্ছেন। রং তৈরির কারখানায় যিনি সঠিকভাবে রং মেশাতে পারেন, তার বেতন হয়তো আমার চেয়েও বেশি।