বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকল্পের ৮৬ দশমিক ২৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়ে গেলেও এখনো নির্মাণের জায়গা চূড়ান্ত হয়নি। গত ৩০ জুনের মধ্যে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। জায়গা নির্বাচন, মাস্টার প্ল্যানিং প্রণয়ন, ড্রয়িং-ডিজাইন সংশ্লিষ্ট কাজসহ প্রকল্পের অবশিষ্ট অংশ শেষ করতে আরও ১২ মাস সময় চেয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষ।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মুহিবুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রকল্পের কাজ বর্তমানে স্থগিত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বিদেশ থেকে ফিরলে জায়গা নির্বাচনের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে।’
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মানোন্নয়নের পাশাপাশি দেশে আরও একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চালানোর জন্য দুই বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৭ সালেই শেষ হয়ে গেছে। পরে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ১৩৬ কোটি টাকা। এ পর্যন্ত ১১৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের
জন্য প্রথম বাছাই করা হয় ময়মনসিংহের ত্রিশালকে। সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় ঢাকার দোহারের আড়িয়াল বিলে। এরপর যায় শরীয়তপুরের জাজিরা হয়ে মাদারীপুরের শিবচরে। যাচাই-বাছাই শেষে শিবচরকে চূড়ান্ত করা হলেও সেখানেও হচ্ছে না এ বিমানবন্দর। শিবচরে ঘনবসতি ও খাসজমি কম থাকায় গত ফেব্রুয়ারি মাসে বিমানবন্দরের জন্য নতুন জায়গা খোঁজার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষকে।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাজিরা ও শিবচর বাছাই করেছিল জাপানি সম্ভাব্যতা যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান নিপ্পন কোয়েই। নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রকল্পের ড্রয়িং, ডিজাইনসহ স্থান নির্বাচনের কাজ শেষ করে তারা। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি বেশ কয়েকটি স্থানের কারিগরি ও অন্যান্য বিষয় পর্যালোচনা করে জাজিরা ও শিবচরকে উপযুক্ত স্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। এরপর প্রকল্পের ড্রয়িং, ডিজাইন ও স্থান নিয়ে একক ও যৌথভাবে একাধিক বৈঠক করে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষ, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। শিবচরকে চূড়ান্ত ধরে এগিয়ে যায় প্রকল্পের কাজ। কিন্তু প্রায় এক বছর পর মন্ত্রণালয়কে জানানো হয় ঘনবসতি ও সরকারি খাসজমি কম হওয়ায় শিবচরে বিমানবন্দর নির্মাণ করা যাবে না। এর নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয় রাজনীতি। বিমানবন্দর করার কথা শুনে শুরু থেকেই স্থানীয় রাজনীতিকরা সরকারকে জানিয়ে আসছেন, শিবচরে এ প্রকল্প করা হলে আট হাজার পরিবার উচ্ছেদ করতে হবে যা থেকে জনরোষের সৃষ্টি হবে। মূলত স্থানীয় রাজনীতিকদের বিরোধিতার কারণেই প্রকল্পটির স্থান সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
২০০৯ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে একটি নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। ওই সময় বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব শফিক আলম মেহেদীর নেতৃত্বে দেশীয় সম্ভাব্যতা যাচাইকারীরা হেলিকপ্টারের মাধ্যমে এরিয়াল ভিউ সংগ্রহ করে বিভিন্ন বিকল্পের মধ্যে ত্রিশালকে নির্বাচন করেছিলেন। কিন্তু নীতিনির্ধারকরা রাজধানী ঢাকার উত্তরে কোনো বিমানবন্দর চাচ্ছিলেন না। তারা চান, ঢাকার দক্ষিণে অথবা দক্ষিণ-পশ্চিমে নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ করতে। এরপরই বাছাই করা হয় মুন্সীগঞ্জ ও দোহারের আড়িয়াল বিলকে। ২৫ হাজার একর জমি নিয়ে প্রকল্পটি করার কথা। এর মধ্যে ১০ হাজার একর জমিতে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং অবশিষ্ট ১৫ হাজার একর জমিতে বঙ্গবন্ধু সিটি গড়ে তোলা হবে। কিন্তু একটি বিমানবন্দর নির্মাণ করতে গেলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় যে ক্ষতি হবে একই সঙ্গে সামগ্রিক উন্নয়নের যে সুযোগ সৃষ্টি হবে সে সম্পর্কে স্থানীয়দের অবগত করা হয়নি। স্থানীয় প্রশাসন জনমত সৃষ্টি না করেই জমি অধিগ্রহণ শুরু করে। এতে স্থানীয়রা বিমানবন্দর স্থাপনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। প্রবল বিক্ষেভের মুখে সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়। এরপর সম্ভাব্যতা যাচাইকারীরা শিবচর ও জাজিরাকে বাছাই করে। দোহারের চর বিলাশপুর, মুন্সীগঞ্জের সিরাজদীখানের কেয়াইন ও লতব্দি এবং আড়িয়াল বিলসহ তারা আরও কয়েকটি জায়গাকে উপযুক্ত নির্বাচন করে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্র্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঢাকা থেকে ৯৮ কিলোমিটার দূরে ময়মনসিংহের ত্রিশালই ছিল বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য উপযুক্ত জায়গা। এ ছাড়া ১০৬ কিলোমিটার দূরে টাঙ্গাইলের ভূঁঞাপুরেও বিমানবন্দর হতে পারত। ২০১০ সালে প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডি কমিটি এসব স্থান নির্বাচন করেছিল। এসব জায়গার মাটি ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক শক্ত। এরপর ২০১২ সালে পদ্মা সেতু নির্মাণের তোড়জোড় শুরু হয়। পদ্মাপাড়ের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য ও পদ্মাপাড়কে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে সেখানে বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য জায়গা খোঁজা শুরু হয়। ২০১৩ সালে পদ্মা সেতু প্রকল্পের মাওয়া-জাজিরা অ্যাপ্রোচ সড়ক নির্মাণকাজের উদ্বোধনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই এলাকায় একটি আন্তর্জাতিক মানের বিমানবন্দর নির্মাণের ঘোষণা দেন।
২০১৬ সালে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়, বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর শুধু দেশের নয়, এটি হবে এশিয়ার অন্যতম সেরা বিমানবন্দর। পদ্মার পাড়ে বিমানবন্দর নির্মাণের পর ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরের ওপর চাপ কমবে। পদ্মা সেতু ও বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দর ঘিরে ওই অঞ্চলে অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে উঠবে। তাতে পুরো এলাকার চেহারা পাল্টে যাবে। এটি হবে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা মেগা প্রকল্পগুলোর একটি। এ বিমানবন্দর নির্মাণে ৫০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। ব্যয়ের দিক থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের পর এটি হবে দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রকল্প। এই বিমানবন্দর ঘিরে থাকবে অত্যাধুনিক নগর ও জনপদ। বিমানবন্দর লাগোয়া গড়ে তোলা হবে বঙ্গবন্ধু সিটি। ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগে আন্তর্জাতিক মানের সড়ক, রেল ও নৌপথ থাকবে। এসব যোগাযোগ ব্যবস্থা ভবিষ্যতে সম্প্রসারণের সুযোগ থাকবে।
একসময় দেশের একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছিল শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এরপর চট্টগ্রামের শাহ আমানত এবং সিলেটে ওসমানী বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা হয়। কক্সবাজার বিমানবন্দরকেও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করা হচ্ছে বলে জানান বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।