শতকোটি টাকার ড্রেনেও দূর হচ্ছে না জলাবদ্ধতা

রাজধানীর শান্তিনগর, মালিবাগ, রাজারবাগ ও এর আশপাশের এলাকার জলাবদ্ধতা দূর করতে একটি মেগা প্রকল্পের আওতায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য ১০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ড্রেন নির্মাণ করা হয়। কিন্তু ওই ড্রেনের সুফল পাচ্ছেন না এলাকাবাসী। অতিবর্ষণে আগের মতোই এলাকার সড়কগুলো তলিয়ে যাচ্ছে।

ডিএসসিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকা ওয়াসার তত্ত্বাবধানে থাকা সেগুনবাগিচা বক্স কালভার্টটি পরিষ্কার না থাকায় তা দিয়ে স্বাভাবিক গতিতে পানি প্রবাহিত হচ্ছে না। এ ছাড়া সেগুনবাগিচা খালের মাধ্যমে ধীরে ধীরে প্রবাহিত হয়ে পানি মতিঝিল এলাকায় গেলেও সেখানে

টিটিপাড়ায় ওয়াসার তিনটি পাম্পের প্রয়োজন অনুযায়ী নিষ্কাশন সক্ষমতা নেই। ফলে অতিবর্ষণে সংশ্লিষ্ট এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে।

ডিএসসিসির কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শান্তিনগর ও এর আশপাশের এলাকায় কয়েক বছর আগে সামান্য বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতো। এ সমস্যা দূর করতে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দুই বছরমেয়াদি একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। এর অধীনে মালিবাগ রেল ক্রসিং থেকে মৌচাক, মৌচাক-মালিবাগ মোড়-চানমারী মোড় হয়ে পীরজঙ্গি মাজার, মালিবাগ মোড়-কাকরাইল মোড়, কাকরাইল মোড়-ফকিরাপুল মোড়, ফকিরাপুল মোড়-ওয়াসা বক্স কালভার্ট, নাইটিঙ্গেল মোড়-বিজয়নগর ওয়াসা, শান্তিনগর মোড়-রাজারবাগ মোড় এবং চানমারী মোড়-ফকিরাপুল মোড় পর্যন্ত এলাকায় মোট ১২ কিলোমিটার স্টর্ম ড্রেনেজ লাইন (বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন নালা) নির্মাণ করা হয়। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য তিনটি প্যাকেজে এই ড্রেন নির্মাণ করা হলেও এর সুফল মিলছে না। কারণ হিসেবে ডিএসসিসি কর্র্তৃপক্ষ বলছে, ঢাকা ওয়াসার পাম্প মেশিনের প্রয়োজন অনুযায়ী নিষ্কাশন ক্ষমতা না থাকায় সড়ক থেকে পানি ড্রেনে গেলেও তা খাল দিয়ে নির্ধারিত স্থানে প্রবাহিত হতে পারছে না।

সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, ওয়াসার টিটিপাড়ার পাম্প ঘণ্টায় ৪০ মিমি পর্যন্ত বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে সক্ষম। কিন্তু মাঝেমধ্যে অতিবর্ষণে ঘণ্টায় ৭০ থেকে ৮০ মিমি পর্যন্ত বৃষ্টি হয়ে থাকে। তখন ওই পানি নিষ্কাশন করতে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। আর এ সময়টুকু রাস্তায় পানি জমে থাকে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিএসসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও স্টর্ম ড্রেনেজ লাইন নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক মো. আসাদুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনগতভাবেই বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার। আমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব হিসেবে ড্রেন নির্মাণ করেছি। এখন বৃষ্টি হলে আর পানি রাস্তায় জমে থাকে না। বৃষ্টির পানি ড্রেনের মাধ্যমে প্রথমে খালে এবং পরে খাল থেকে পাম্পের মাধ্যমে সেচে তা অপসারণ করা হয়। কিন্তু বিশাল এলাকার পানি নিষ্কাশনের জন্য ওয়াসার যে তিনটি পাম্প রয়েছে তা যথেষ্ট না। পাম্পের নিষ্কাশন ক্ষমতা না বাড়ানোয় ড্রেন নির্মাণের সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা আমাদের কাজটুকু করেছি, এখন ওয়াসার দায়িত্ব পানি পাম্পিং করে বাইরে নিয়ে যাওয়া।’

প্রকল্প পরিচালক আরও বলেন, ‘ঢাকা ওয়াসা যদি মনে করে আমাদের ড্রেনের মাধ্যমে পানির গতিপথ যেভাবে দেওয়া হয়েছে তা সঠিক হয়নি। তাহলে কোথায় ড্রেনের সংযোগ দিলে তাদের নিষ্কাশন সুবিধা হবে তা জানালে সেখানেই দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।’

অন্যদিকে ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. বোরহান উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুরো এলাকার পানি নিষ্কাশনের জন্য ওয়াসার বৃষ্টির পানি প্রবাহের একটি গতি পথ রয়েছে। সেই অনুযায়ী তারা পানি নিষ্কাশন করে থাকে। আমাদের নতুন ড্রেনের সংযোগ সেগুনবাগিচা বক্স কালভার্টের সঙ্গে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই খাল পরিষ্কার না করায় পানি প্রবাহ হচ্ছে না। ওয়াসা যে মেশিন দিয়ে বক্স কালভার্ট পরিষ্কার করে থাকে তা দিয়ে শুধু দুটি প্রবেশমুখেই পরিষ্কার করা সম্ভব। আর মাঝখানে দীর্ঘ সময় পরিষ্কার না করার ফলে ময়লা-আবর্জনা শক্ত হয়ে পুরো খাল বক্ল হয়ে পড়েছে। ফলে এই বক্স কালভার্টটি পুরোপুরি পরিষ্কার না করলে ড্রেনের পানি সেখান দিয়ে প্রবাহিত হতে পারছে না। তাই একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ বৃষ্টির পর তা উপচে আবার রাস্তায় চলে আসে।’

ওয়াসার পাম্পের পানি নিষ্কাশন ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং সেগুনবাগিচা বক্স কালভার্ট পরিষ্কার না থাকা সম্পর্কে ডিএসসিসির প্রকৌশলীদের দাবি সম্পর্কে জানতে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি তা ধরেননি। তবে ঢাকা ওয়াসার সংশ্লিষ্ট এক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সেগুনবাগিচা বক্স কালভার্ট সম্পূর্ণ পরিষ্কার আছে। আমাদের পানি নিষ্কাশনের পাম্পেরও সক্ষমতা রয়েছে। ডিএসসিসি না বুঝে অন্য এলাকার পানির সংযোগ এদিক দিয়ে দেওয়ায় এখন জটিলতা তৈরি হয়েছে। আসলে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য ড্রেন নির্মাণ করার মতো কারিগরি জ্ঞান তাদের (ডিএসসিসির) নেই। ফলে অনভিজ্ঞ লোক দিয়ে কাজ করালে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে।’

এদিকে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ও নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খানও স্টর্ম ড্রেনেজ লাইন প্রকল্পের সুফল না পাওয়ার জন্য কার্যত দায়ী করেছেন ডিএসসিসিকে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটি প্রকল্প হাতে নেওয়ার সময় কারিগরি মূল্যায়ন থাকা প্রয়োজন। যে প্রকল্পটি ডিএসসিসি বাস্তবায়ন করেছে, তার শেষ ফলাফল কী হবে তা জানা উচিত ছিল। তাহলে পানি নিষ্কাশনে ওয়াসার পাম্পের যে সক্ষমতা নেই তা মূল্যায়ন করে এ প্রকল্পের মাধ্যমেই সমস্যা দূর করা সম্ভব ছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু বড় ধরনের অর্থ ইতিমধ্যে খরচ হয়ে গেছে, তাই বিকল্প চিন্তাও করা যেতে পারে। সেগুনবাগিচা বক্স কালভার্ট দিয়ে যদি পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় বা পাম্পিং করে নিষ্কাশন করা না যায় তাহলে হাতিরঝিলের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে দেখতে হবে, হাতিরঝিলের পানি ধারণ ক্ষমতা কেমন আছে। আর সেখানে থাকা পাম্পিং মেশিনের সক্ষমতাও মূল্যায়ন করতে হবে। যদি সক্ষমতা না থাকে তাহলে রামপুরা এলাকায় কারিগরি মূল্যায়ন করে নতুন করে একটি পাম্প বসানো যেতে পারে।’

অন্যদিকে নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব স্টর্ম ড্রেনেজ লাইন প্রকল্পের সুফল পেতে ওয়াসার পাম্পগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৯৮৮ সালের হিসাব অনুযায়ী পানি প্রবাহের ওপর ওয়াসা বেশ কিছু পরিকল্পনা করেছে। তখন বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে গড়িয়ে যাওয়ার পরিমাণ ছিল ৫৫ শতাংশ। আর বাদবাকি পানি মাটির নিচে চলে যেত। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এখন পানি গাড়িয়ে যায় ৮৫ শতাংশ। সেই পানি পাম্পিং করার সক্ষমতা তো বাড়াতে হবে ওয়াসাকেই। ওয়াসার বসানো পাম্পগুলোও পুরনো হয়ে পড়েছে। এখন নতুন করে এগুলো কারিগরি মূল্যায়নের মাধ্যমে পুনঃস্থাপন করা প্রয়োজন।’