বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। ইসলামি ধারার এ ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা প্রতি বছরই বাড়ছে। তবে একই সঙ্গে মন্দঋণের পরিমাণ বাড়ায় পরিচালন মুনাফা বৃদ্ধির সুফল পাচ্ছে না ব্যাংকটি। এতে মুনাফার বড় অংশই চলে যাচ্ছে সঞ্চিতিতে। চলতি প্রথমার্ধেও (জানুয়ারি-জুন) নিট মুনাফার চেয়ে বেশি অর্থ রাখতে হয়েছে মন্দঋণের সঞ্চিতি বাবদ।
জানা যায়, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা। আর মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ২০১৯ সালের মার্চে ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দ্বিগুণ বেড়ে ৬ হাজার ৯১৬ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। চলতি বছরের জুন শেষে খেলাপি ও অবলোপনকৃত ঋণের বিপরীতে ব্যাংকটির মোট সঞ্চিতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২১ কোটি টাকা। চলতি প্রথমার্ধেও ইসলামী ব্যাংক খেলাপি ঋণের বিপরীতে ৪০২ কোটি টাকা সঞ্চিতি হিসেবে সংরক্ষণ করেছে।
চলতি প্রথমার্ধের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, এ সময় ইসলামী ব্যাংকের বিনিয়োগ আয় হয়েছে ৩ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। চলতি প্রথমার্ধে ব্যাংকটি আমানতের বিপরীতে মুনাফা দিয়েছে ২ হাজার ৩৫ কোটি টাকা। এতে চলতি প্রথমার্ধে নিট বিনিয়োগ আয় হয়েছে ১ হাজার ৫২২ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি। এ সময় শেয়ারে বিনিয়োগ থেকে আয় হয়েছে ৭২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। এর বাইরে কমিশন, এক্সচেঞ্জ ও ব্রোকারেজ আয় হয়েছে ৩২০ কোটি টাকা। অন্যান্য আয় হয়েছে ২৫০ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে চলতি প্রথমার্ধে মোট পরিচালন আয় হয়েছে ২ হাজার ১৬৫ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি।
তবে পরিচালন আয় যে হারে বেড়েছে একইভাবে নিট মুনাফা বাড়েনি ইসলামী ব্যাংকের। মূলত ব্যবস্থাপনা ব্যয় এবং মন্দ ও অবলোপন করা ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতির পরিমাণ বাড়ায় নিট মুনাফা তুলনামূলক বাড়েনি ব্যাংকটির। চলতি প্রথমার্ধে বেতন-ভাতাসহ ব্যবস্থাপনা ব্যয় হয়েছে ৯৯১ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। চলতি প্রথমার্ধে মন্দ ও অবলোপন করা ঋণের বিপরীতে ইসলামী ব্যাংককে ৪০২ কোটি ৯১ লাখ টাকা সঞ্চিতি হিসেবে রাখতে হয়েছে। তবে এ সময় বিনিয়োগ করা শেয়ারের মূল্য বাড়ায় ১১ কোটি টাকা ফেরত পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ফলে চলতি প্রথমার্ধে মোট সঞ্চিতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৯২ কোটি ২৩ লাখ টাকা। ২০১৮ সালের প্রথমার্ধে ব্যাংকটির সঞ্চিতি সংরক্ষণের পরিমাণ ছিল ৩২২ কোটি ২৪ লাখ টাকা।
সঞ্চিতি সংরক্ষণের পর চলতি প্রথমার্ধে ইসলামী ব্যাংকের কর-পূর্ববর্তী মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৭৮১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। আর কর পরিশোধের পর নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৩২৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩০২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রতি বছর ব্যাংকটির মন্দঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি বাড়ছে। ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংকের সঞ্চিতি সংরক্ষণের পরিমাণ ছিল ৪৭০ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, যা ২০১৮ সালে ৬৭০ কোটি ২৩ লাখ টাকায় উন্নীত হয়। এতে দেখা যাচ্ছে, ব্যাংকটির নিট মুনাফা যা হয়, তার চেয়ে বেশি সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের ঋণ ও অবলোপনের বিপরীতে ব্যাংকটি মোট ৪ হাজার ২১ কোটি টাকা সঞ্চিতি হিসেবে রেখেছে। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের বিপরীতে সঞ্চিতি সংরক্ষণের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২০২ কোটি টাকা।