চোখের জল আর ঘামে ভেজা শিক্ষকদের ৪৮ দিন

প্রেস ক্লাব থেকে যে রাস্তাটা সিরডাপ মিলনায়তনের দিকে গেছে তার ফুটপাত খুবই সরু। ড্রেন, ফুটপাতের রেলিং আর সেখানে রাখা ভ্রাম্যমাণ টয়লেটের কারণে পায়ে চলার পথটি সংকীর্ণ। কারোর অসুবিধা না করে সে পথের ওপরই গুটিসুটি মেরে বসে আছেন কয়েকশ মানুষ। মধ্যবয়সী নারী-পুরুষ। হাতের প্ল্যাকার্ড দেখে বোঝা যায় তারা শিক্ষক। প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক। জাতির মেরুদণ্ড নির্মাণের দায়িত্ব যাদের হাতে তাদের একটা অংশ মেরুদণ্ড বাঁকিয়ে, মাথা নিচু করে বসে আছে। দেশের ৪ হাজার ১৫৯টি বেসরকারি প্রাথমিক স্কুলের ১৬ হাজার ৫০০ শিক্ষকের পক্ষ থেকে তাদের স্কুলগুলো সরকারি করার আবেদন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের উদ্দেশে প্রখর রোদ আর অঝোর বৃষ্টির মধ্যে বসে আছেন তারা। পাশ দিয়ে দিনরাত চলে যাচ্ছে কত গাড়ি, বাস, ট্রাক, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, রিকশা আর পায়ে হেঁটে চলা মানুষের মিছিল। প্রেস ক্লাবের এই পথ দিয়ে নাকি প্রতি ঘণ্টায় কমপক্ষে ৫০ হাজার মানুষ যাতায়াত করে। এইসব পথচলতি মানুষের অনেকের নির্বিকার উদাসীনতা, অনেকের কৌতূহল গায়ে না মেখে শিক্ষকরা বসে আছেন বেদনাভরা আকুতি নিয়ে। কেউ কেউ হাতে ধরে আছেন আবেদন লেখা প্ল্যাকার্ড। একটা প্ল্যাকার্ডে লেখা আছে ‘পৃথিবীতে এমন দেশ কি কোথাও আছে, যেখানে বছরের পর বছর শিক্ষকরা বেতন ছাড়াই শিক্ষকতা করছেন?’

 

৪৮ দিন মানে ১ হাজার ১৫২ ঘণ্টা। শিক্ষকরা দিনরাত ঠায় বসে আছেন। একপাশে সচিবালয়, আরেক পাশে শিক্ষা ভবন। শিক্ষকরা মাঝের রাস্তায়। তাদের পক্ষ থেকে কেউ এলো না! কী তাদের দাবি, তা যৌক্তিক না অহেতুক তা শোনার জন্যও কেউ এলো না! রাতে মশার কামড়, দিনে ব্যস্ততম সড়কের তীব্র শব্দ, যানবাহনের ধোঁয়ায় অমানবিক এক পরিবেশ। এদিকে, পুরো ঢাকা শহর কাঁপছে ডেঙ্গুর আতঙ্কে, এর মাঝেও শিক্ষকরা বসেই আছেন। নেতারা জানালেন, ইতিমধ্যে একজন মৃত্যুবরণ করেছেন ডেঙ্গুতে, আরও ১৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত। তাহলে কেন বসে আছেন এখানে? প্রশ্ন শুনে কয়েকজন একসঙ্গে তাকালেন। কী ছিল সে চোখের ভাষায় তা বোঝানো দুঃসাধ্য। কিন্তু মুখে যা বললেন তা উত্তর নাকি প্রশ্ন, ধিক্কার না স্বগতোক্তি তা বোঝা গেল না।

 

একজন শিক্ষক বললেনÑ ‘অপমানের আঘাত সয়েছেন কখনো? অভাব, অবজ্ঞা, অপমান একসঙ্গে হলে কেমন লাগে তা কি বুঝেছেন কখনো? বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েদের কাছে একজন শিক্ষক মানে বিরাট মানুষ। যাদের কাছে তারা শোনে বড় হওয়ার গল্প, শেখে বর্ণ পরিচয়, শৃঙ্খলা, আদব-কায়দা, সেই মানুষেরা বছরের পর বছর বেতন না পেয়ে কত দুঃখে দিন কাটাচ্ছে। তাদের কেউ কেউ নাকি আবার রাতে রিকশা ভ্যান চালায়, দোকান কর্মচারী হিসেবে কাজ করে। একদিন স্কুল সরকারি হবে এই আশায় দিন গুনতে গুনতে বয়স যখন ৪০-এর কোঠায়, যখন জীবনের বাকি দিনগুলোকে অনিশ্চয়তার অন্ধকার গ্রাস করে ফেলছে, তখন সেই মানুষ গড়ার কারিগরদের কেমন লাগতে পারে তা ভেবে দেখেছেন? কতদিন ধরে আমরা অপেক্ষায় আছি তা কি জানেন?’

 

৯ জানুয়ারি ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক ঘোষণায় বাংলাদেশের সকল উপজেলায় অবস্থিত মোট ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করেন। এর আগে ২৭ মে ২০১২ তিনি মন্ত্রী, সরকারি কর্মকর্তা ও শিক্ষক প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে সিদ্ধান্ত দেন যে, তিন ধাপে বিদ্যালয়গুলো জাতীয়করণ করা হবে। প্রথমতÑ স্থায়ী নিবন্ধনপ্রাপ্ত বিদ্যালয়। দ্বিতীয়তÑ অস্থায়ী নিবন্ধনপ্রাপ্ত বিদ্যালয়, পাঠদানের অনুমতিপ্রাপ্ত বিদ্যালয়, চালু কমিউনিটি বিদ্যালয় ও সরকারি অর্থানুকূল্যে এনজিও কর্র্তৃক নির্মিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। তৃতীয়তÑ২৪ মে ২০১২ তারিখের পূর্বে স্থাপিত ও পাঠদানের অনুমতির জন্য আবেদনকৃত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার আলোকে মন্ত্রণালয় ১৭ জানুয়ারি ২০১৩ তারিখে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে জাতীয়করণের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে শুরু করে। কিন্তু গত পাঁচ বছরের মধ্যেও আশানুরূপ অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশ শিক্ষকরা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের শেষ চেষ্টা হিসেবে রাস্তায় নেমে এসেছেন। বঞ্চনা থেকে বিক্ষোভের জন্ম হয়। কিন্তু বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বিক্ষোভের পথে নয়, আবেদন নিবেদনের পথেই তাদের দাবি আদায় করতে চাইছেন। অত্যন্ত নিরীহ ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করেছেন তারা। হয়তো সে কারণেই কেউ কোনো ভ্রƒক্ষেপ করছেন না।

 

প্রাথমিক স্কুলে পাঠদানের অনুমতি পেতে হলে কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। এর মধ্যে বিদ্যালয় সংক্রান্ত শর্ত রয়েছে ১১টি। শর্তসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: (ক) বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নিবন্ধন নীতিমালা অনুসারে কমপক্ষে ৩৩ শতাংশ জমি বিদ্যালয়ের নামে থাকতে হবে, (খ) নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ বিদ্যালয়ের সংরক্ষিত তহবিলে থাকতে হবে, (গ) এতে ১ম থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান চালু থাকতে হবে, (ঘ) বিদ্যালয়ে ১ম হতে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত কমপক্ষে ১৫০ জন ছাত্রছাত্রী থাকতে হবে, (ঙ) বিদ্যালয়ের পাঠদান সম্পূর্ণ অবৈতনিক হতে হবে, (চ) বিদ্যালয়ে ১ম শ্রেণি থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের ক্ষেত্রে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড নির্ধারিত পাঠক্রম ও পাঠ্যপুস্তক ব্যবহৃত হতে হবে ইত্যাদি। শিক্ষকদের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে ১ জন প্রধান শিক্ষকসহ ৪ জন শিক্ষকের পদ থাকতে হবে, শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকতে হবে। শিক্ষক নেতারা বলছেন, এসব শর্ত তারা যথাযথভাবেই পূরণ করেছেন।

 

২০১৩ সালের ১৭ জানুয়ারি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এসব শর্ত বিবেচনা করে সুপারিশ প্রণয়নের উদ্দেশে উপজেলা, জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে কমিটি গঠন করে দেয়। এর পর ৩০ জানুয়ারি ২০১৩ সালে আর একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। সেখানে জাতীয়করণের জন্য কর্মরত শিক্ষকসহ যে সব বিদ্যালয় বিবেচিত হবে তার জন্য ৮ ধরনের শর্তের উল্লেখ করা হয়। এদের মধ্যে অন্যতম শর্ত ছিল বিদ্যালয়টিকে অবশ্যই ২৭ মে ২০১২ সালের পূর্বে যথাযথভাবে স্থাপন ও চালুর অনুমতির জন্য আবেদনকৃত হতে হবে। নির্ধারিত ছকে তথ্য সংগ্রহ করে তা ২৪ মার্চ ২০১৩ তারিখের মধ্যে টাস্কফোর্স বরাবরে প্রেরণ করার নির্দেশ ছিল। কিন্তু ৬ বছরেও সেই তথ্য ও সুপারিশ প্রেরিত হলো কি না জানা যায়নি। বহু চিঠি চালাচালি, আবেদন নিবেদন নিষ্ফল হওয়ায় অবশেষে শিক্ষকরা আজ রাস্তায়।

 

বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কমপক্ষে ৬ লাখ। কারণ নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি স্কুলে ১৫০ জন ছাত্রছাত্রী থাকতে হবে। তাদের পড়াশুনার মান খারাপ নয় বরং ভালো। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর কর্র্তৃক প্রকাশিত ২০১৮ সালের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার ফল থেকেও এটা বোঝা যায়। ৩৭ হাজার ২৩৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাসের হার ৮০ দশমিক ২৭ শতাংশ। নতুন জাতীয়করণকৃত ২৬ হাজার ১১৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পানের হার ৭৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ আর বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাসের হার ৭৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ। যে সমস্ত বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতনভাতা নেই, আইন অনুযায়ী যারা ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে ছাত্র বেতন নিতে পারবেন না তাদের ছাত্রছাত্রীদের পড়াশুনার মান কিন্তু সরকারি স্কুলের সমান সমান। শিক্ষকরা বলছেন আমাদের দুঃখ এটাই যে আমাদের শিক্ষার ক্ষেত্রে মান সমান কিন্তু বেতন পাওয়ার ক্ষেত্রে মান শূন্য।

 

সম্ভাব্য কত টাকা লাগতে পারে জাতীয়করণ করে এই সব বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন সরকারি কোষাগার থেকে দিতে? প্রধান শিক্ষকসহ প্রতি শিক্ষকের গড়ে মাসে ৩০ হাজার টাকা বেতন দিলে ১৬ হাজার শিক্ষকের জন্য মাসে ৪৮ কোটি টাকা আর বছরে লাগবে ৫৭৬ কোটি টাকা। যে দেশের জাতীয় বাজেট ৫ লক্ষ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা সে দেশে শিক্ষকদের জন্য বাড়তি ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা কি এতই অসম্ভব? শিক্ষার বিনিয়োগ যে বহুগুণে সমাজের কাছেই ফিরে আসে তা তো নতুন করে বোঝার বা বোঝানোর প্রয়োজন নেই। জনগণের ট্যাক্সের টাকা জনগণের সন্তানের শিক্ষার জন্য ব্যয় করার ক্ষেত্রে বাধা কোথায়? খেয়াল করে দেখুন, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়তে আসে সমাজের কোন অঞ্চলের আর কোন অংশের মানুষের সন্তানরা। প্রান্তিক আয়ের, প্রত্যন্ত অঞ্চলের, প্রধানত কৃষিজীবীদের সন্তানরাই তো এখানে পড়ে। দরিদ্র কৃষক ফসলের দাম পায় না, খেতমজুর সারা বছর কাজ পায় না, তারা তাদের সন্তানদের শিক্ষার জন্য কোথায় পাঠাবে? এই সব বেসরকারি প্রাথমিক স্কুলগুলোই সেই দায়িত্ব পালন করে আসছে।

 

এখন সরকার কী করবে তাদের জন্য? দেশের জিডিপি বাড়ছে, মাথাপিছু আয় বাড়ছে, বাজেট বড় হচ্ছে প্রতি বছর। মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে পা ফেলতে যাওয়া এই দেশ শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়াবে না কেন? এত জনঘনত্বের দেশে জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে শিক্ষার তো কোনো বিকল্প নেই। আর শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষাই তো সকল শিক্ষার ভিত্তি রচনা করে। সেই শিক্ষা দেওয়ার কাজে যারা নিজেদের জীবন-যৌবনকে নিয়োজিত করেছেন রাষ্ট্র কি তাদের দায়িত্ব নেবে না? আজ শিক্ষকরা বসে আছেন আশা নিয়ে। তাদের বঞ্চনার কথা, বেদনার কথা তুলে ধরেছেন রাষ্ট্রের কাছে। রাষ্ট্রযন্ত্র কি বধির হয়ে থাকবে? আষাঢ়-শ্রাবণের চড়া রোদে পুড়ে রাজপথের ফুটপাতে বসে থাকা এই শিক্ষকদের ঘাম আর চোখের জল আজ সমান নোনতা। কখনো কখনো প্রবল বৃষ্টি ধুয়ে দিচ্ছে তাদের চোখের জল আর মুখের ঘাম। ঘাম, চোখের জল আর বৃষ্টিতে ৪৮ দিন ধরে ভিজতে থাকা শিক্ষকদের পাশে দাঁড়াবার কেউ কি নেই? লেখক

রাজনীতিক ও শ্রমিক আন্দোলনের নেতা