কাশ্মীরকে বলা হয় ভূস্বর্গ। এই স্বর্গ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিবাদ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে। এই বিবাদে প্রায়ই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীর অঞ্চল। সোমবার এই অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসনের দলিল ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা রদ করা হয়েছে। এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তপ্ত পরিস্থিতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে এর বিবাদ ইতিহাস নিয়ে লিখেছেন আন্দালিব আয়ান
কাশ্মীরের ইতিহাস
কাশ্মীরের সৌন্দর্য নিয়ে বহু গান-কবিতা রচিত হয়েছে। ঝিলম নদীর তীরে অবস্থিত তুষারশুভ্র পর্বতে ঘেরা শ্রীনগর জম্মু ও কাশ্মীরের রাজধানী। মোহনীয় সৌন্দর্যের কারণে ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে তীর্থস্থানের মতো কাশ্মীর। শ্রীনগরের প্রধান আকর্ষণ অপূর্ব সুন্দর ডাল লেক। লেকের জলে ভেসে বেড়ায় কাশ্মীরি ঐতিহ্যের অনন্য নিদর্শন শিকারা। কাঠের তৈরি, বিচিত্র আকৃতির ও দারুণভাবে সজ্জিত বিশেষ এই নৌকা কাশ্মীরের প্রতীক হয়ে উঠেছে। সূর্যাস্তের সময় ডাল লেক শ্বাসরুদ্ধকর সৌন্দর্যের অবতারণা করে। ডাল লেক ও নাগিন লেকে দেখা মেলে ভাসমান সবজি বাজারের।
বরফে মোড়ানো পাহাড়, অপরূপ গাছগাছালি ও ফুলের সমারোহ, অনিন্দ্যসুন্দর স্থাপনা সব মিলিয়ে কাশ্মীর গেলে মনে হবে আপনি সত্যিই পৃথিবীতে স্বর্গের দেখা পেয়েছেন।
হিমালয় উপত্যকা এবং পির পাঞ্জাল রেঞ্জের মধ্যে অবস্থিত এই অঞ্চলটি একসময় শুধুমাত্র কাশ্মীর উপত্যকা নামেই পরিচিত ছিল। ভারতে দু’শো বছরের ইংরেজ শাসনের সময়ও এখানে রাজার স্বায়ত্তশাসন চলত। অর্থাৎ রাজা এখানে নিজের নিয়মকানুন টিকিয়ে রাখতেন ব্রিটিশদের খাজনা দিয়ে।
বলা হয়, ভূস্বর্গ হিসেবে খ্যাত এই অঞ্চলটি একসময় হিন্দু ও বৌদ্ধদের অন্যতম মিলনস্থল হিসেবে পরিচিত ছিল। ১৩৩৯ সালে শাহ মির প্রথম মুসলিম সাম্রাজ্য স্থাপন করেন কাশ্মীরে। ১৫৮৬ থেকে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত এখানে মুঘল শাসন চলে। পরে ১৮২০ সাল পর্যন্ত এখানে আফগান বংশোদ্ভূত দুরানি সাম্রাজ্যের আধিপত্য ছিল। ১৮২০ সালে রঞ্জিৎ সিংয়ের নেতৃত্বে শিখ বাহিনী কাশ্মীর দখল করে ১৮৪০ সাল পর্যন্ত নিজেদের জিম্মায় রাখে। ব্রিটিশ যুগে ভারতের প্রথম অ্যাংলো-শিখ যুদ্ধে শিখদের পরাজয়ের পর তা ব্রিটিশ অধীনে যাওয়ার পরপরই অমৃতসর সন্ধির দৌলতে জম্মুর রাজা গুলাব সিং ইংরেজদের কাছ থেকে কাশ্মীর কিনে নেন আর তারপর থেকেই জম্মু-কাশ্মীর এক অঙ্গ হয়ে ওঠে। সে সময় এটি প্রিন্সলি স্টেট হিসেবে পরিচিত ছিল ব্রিটিশদের কাছে।
মানুষ, জলবায়ু ও সংস্কৃতি
জম্মু, কাশ্মীর উপত্যকা ও লাদাখ এই তিন অঞ্চল নিয়ে ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যটি গঠিত। ২ লাখ ২২ হাজার ২৩৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই রাজ্যে ১ কোটি ২০ লাখ মানুষের বসবাস, যার মধ্যে ৬৮ শতাংশই মুসলিম। আর হিন্দু রয়েছে প্রায় ২৮ শতাংশ। অন্যদের মধ্যে শিখ (২ শতাংশ), বৌদ্ধ (১ শতাংশ) এবং খ্রিস্টান (০.৩ শতাংশ) ধর্মের অনুসারীও রয়েছে। এছাড়াও কাশ্মিরে বেশ কয়েকটি ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী রয়েছে। এর মধ্যে গুজার ও বাকেরওয়াল-এর মতো নৃ-গোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন পর্বতশৃঙ্গে বাস করে।
রাজ্যের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগর এবং শীতকালীন রাজধানী জম্মু। জম্মুতে অনেক হিন্দু মন্দির থাকায় এটি হিন্দুদের কাছে একটি পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। এই অঞ্চলটিতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ।
লাদাখ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির জন্য বিখ্যাত। এই অঞ্চলটি ‘ছোট তিব্বত’ নামেও পরিচিত।
রাজ্যের প্রধান কথ্য ভাষা কাশ্মীরি ও উর্দু। শ্রীনগর ছাড়াও অন্য শহরগুলোর মধ্যে বারামুল্লা, হন্ডওয়ারা, সোপুর, অনন্তনাগ ও গান্দারবাল উল্লেখযোগ্য।
কাশ্মীরের গ্রীষ্ম সাধারণত হালকা এবং শুষ্ক হয়। তবে আপেক্ষিক আর্দ্রতা সাধারণত উচ্চ হয় এবং রাত শীতল হয়। পরিচলন বৃষ্টি সারা বছর জুড়েই ঘটে। জুলাই মাসে এই অঞ্চলে সর্বনি¤œ ১৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড ও সর্ব্বোচ্চ ৩২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা বিরাজ করে। এই অঞ্চলের সবচেয়ে শীতলতম সময় ডিসেম্বর-জানুয়ারি। এসময় তাপমাত্রা মাইনাস ১৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডে নেমে যায়। আর এসময় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা হয় সাধারণত শূন্য ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড।
কাশ্মীর উপত্যকা দেশি এবং বিদেশি পর্যটকদের জন্য একটি জনপ্রিয় গন্তব্য। পর্যটন স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে গুলমার্গের একটি স্কি রিসোর্ট, ডাল হ্রদের জনপ্রিয় হাউসবোট, পাহলগম, সোনামার্গ, কোকারনাগ, ভেরিনগ, আহ্রাবল এবং সেমথান এবং প্রধান হিন্দু তীর্থ অমরনাথ মন্দির।
গুলমার্গ ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় স্কি রিসোর্টগুলোর মধ্যে একটি। বিশ্বের সর্বোচ্চ সবুজ গল্ফ কোর্সও এখানে অবস্থিত।
কাশ্মীরি রান্নায় আলু একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ওই অঞ্চলের আলুর দম প্রচুর পরিমাণে মসলার সঙ্গে পরিবেশন করা হয়। অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী খাবারের মধ্যে রয়েছে জামান (পনির), রোজান জোশ (প্রচুর মসলায় মেষশাবক রান্না), ইয়াকিন (হালকা মসলা ও দইয়ের মধ্যে মেষশাবক রান্না), হাক (পালংজাতীয় একধরনের শাকের পাতা), রিসতা-গুসতাবা (টমাটো ও দই দিয়ে মাংসের কিমা) ইত্যাদি। কাশ্মীরে চা তৈরির দুটি বিশেষ শৈলী আছে। এর একটি নুন বা লবণ চা, যার রং গোলাপি এবং জাফরান ও মসলা দিয়ে তৈরি করা হয় আরও এক প্রকারের অভিজাত চা।
কাশ্মীর উপত্যকা সড়ক ও আকাশপথ দ্বারা জম্মু এবং লাদাখ অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত। শ্রীনগর কাশ্মীর উপত্যকার প্রধান বিমানবন্দর। ২০০৯ সাল থেকে ১১৯ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি আধুনিক রেললাইন চালু আছে যা পশ্চিমাংশে বারামুল্লাকে শ্রীনগর ও কাজিগুন্দের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে।
পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরের আয়তন প্রায় ১৩ হাজার ২৯৭ বর্গকিলোমিটার। ২০১৭ সালের হিসাব অনুযায়ী এই অংশে প্রায় ৪৪ লাখ মানুষের বসবাস। এই অংশে প্রায় শতভাগই মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাস এবং তারা সবাই উর্দু ভাষায় কথা বলে। আজাদ কাশ্মীরের অন্যতম পুরনো শহরগুলো হলো মিরপুর, কোটলি এবং ভিম্বার। এছাড়া চীন নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের আকসাই চীন অংশে বাকারওয়াল নামে একটি মুসলিম নৃ-গোষ্ঠী বসবাস করে, যাদের সংখ্যা খুবই কম।
সমস্যার শুরু যেখান থেকে
ব্রিটিশরা ভারতকে স্বাধীনতা দানের পর থেকেই যাবতীয় সমস্যা শুরু হয়ে যায়। ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা এবং ম্যাকমোহন লাইন টানার সময় জম্মু ও কাশ্মীর শাসন করছিলেন হিন্দু রাজা হরি সিং। যদিও তার প্রজাদের অধিকাংশই ছিলেন মুসলিম। মুঘল আমল থেকেই এই অঞ্চলটি মুসলিম জনসংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে ওঠে। ফলে রাজা হরি সিং কাশ্মীরকে ভারতের সঙ্গে রাখার পক্ষে থাকলেও জনগণের একাংশ পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দেওয়ার পক্ষে ছিল। তবে, বেশিরভাগ জনগণের চাওয়া ছিল- কাশ্মীরের স্বাধীনতা।
রাজা হরি সিং শুরুতে স্বাধীন থাকতে চেয়েছিলেন। এজন্য তিনি জওহরলাল নেহরু ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সঙ্গে দেনদরবারও করছিলেন। দুটি নতুন দেশ জন্ম হওয়ার ফলে ১৯৪৭ সালে বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিম-শিখ-হিন্দুদের মধ্যে দাঙ্গার সৃষ্টি হয়। কাশ্মীরেও একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে মুসলিম জনগোষ্ঠী পাকিস্তানে পালিয়ে যেতে শুরু করে। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য ২২ অক্টোবর পাহাড়ি দস্যুদের পাঠায় পাকিস্তান। তাদের আক্রমণে কাশ্মীরের অধিকাংশ অঞ্চল রাজা হরি সিংয়ের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। কাশ্মীরের রাজা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন এবং গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেনের কাছে সহায়তা চান। রাজা ভারতভুক্তির পক্ষে স্বাক্ষর করবেন, এই শর্তে মাউন্টব্যাটেন কাশ্মীরকে সাহায্য করতে রাজি হন। ফলে ১৯৪৭ সালের ২৫ অক্টোবর হরি সিং কাশ্মীরের ভারতভুক্তির চুক্তিতে সই করেন। চুক্তি সই হওয়ার পর, ভারতীয় সেনারা কাশ্মীরে প্রবেশ করে অনুপ্রবেশকারীদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। ভারতীয় সেনারা পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীর ছাড়া বাকি অঞ্চল পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়।
জাতিসংঘে দেনদরবার
পুরো কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণের জন্য ১৯৪৮ ভারত বিষয়টি জাতিসংঘে উত্থাপন করে। এদিকে পাকিস্তানও কাশ্মীরকে নিজেদের দাবি করে জাতিসংঘে ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। সমস্যা সমাধানের জন্য একটি কমিশন গঠন করে জাতিসংঘ। সমাধান হিসেবে প্রাথমিকভাবে ভারত ও পাকিস্তানকে কাশ্মীর থেকে তাদের নিজ নিজ সৈন্য সরানোর নির্দেশ দেওয়া হয় এবং গণভোটের আয়োজন করতে বলা হয়। প্রথম দিকে এই প্রস্তাবে ভারতের সম্মতি থাকলেও ১৯৫২ সালে দেশটি গণভোটের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। অন্যদিকে পাকিস্তান তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহারে অসম্মত হয়।
ভারতের মতে, ১৯৫২ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের নির্বাচিত গণপরিষদ ভারতভুক্তির পক্ষে ভোট দিয়েছিল এবং পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ অংশ নিয়েছিল। তাই আলাদা করে গণভোটের প্রয়োজন নেই।
ভারত আরও যুক্তি দেয়, ১৯৪৮-৪৯ সালে জাতিসংঘের দেওয়া প্রস্তাব খাটবে না। কারণ পাকিস্তান তাদের অধিকৃত কাশ্মীরের কিছু অংশ চীনকে দিয়ে দেওয়ায় এবং নিজেদের অংশে অন্যান্য অঞ্চলের অধিবাসীদের বাস করার অনুমতি দেওয়ায় ভূখন্ডের চরিত্র বদলে গেছে। তাছাড়া ভারতের মতে, পাকিস্তান-সমর্থিত অনুপ্রবেশকারীরা কাশ্মীর উপত্যকা থেকে আড়াই লাখ কাশ্মীরি পণ্ডিতকে বিতাড়িত করায় ওই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর চরিত্র পরিবর্তিত হয়ে গেছে। এছাড়াও ভারতের অভিযোগ, পাকিস্তান ১৯৪৮ সালের ১৩ আগস্টে জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুসারে কাশ্মীর অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহার করেনি। এই বিবাদের জের ধরে জাতিসংঘ ও অন্যান্য কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যটি ‘ভারত-অধিকৃত কাশ্মীর’ নামে পরিচিত। অন্যদিকে, পাকিস্তানের শাসনাধীনে থাকা অংশটি ‘পাক-অধিকৃত কাশ্মীর’ বা ‘আজাদ কাশ্মীর’ নামে পরিচিত।
চলমান গোলযোগ
ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি প্রভাব রাখে কাশ্মীর সমস্যা। বর্তমানে কাশ্মীর অঞ্চলের মালিকানা নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের নামটিও যুক্ত হয়েছে।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীর নিয়ে ১৯৪৭, ১৯৬৫ এবং ১৯৯৯ সালে অন্তত তিনটি যুদ্ধ হয়েছে। ভারত সমগ্র জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যটি তাদের বলে দাবি করে। ২০১০ সালের হিসাবে জম্মুর বেশিরভাগ অংশ, কাশ্মীর উপত্যকা, লাদাখ এবং সিয়াচেন হিমবাহ নিয়ে প্রায় ৪৩ শতাংশ অঞ্চল ভারতের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পাকিস্তান এই দাবির বিরোধিতা করে, যারা প্রায় কাশ্মীরের ৩৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। এর মধ্যে আছে আজাদ কাশ্মীর এবং গিলগিট বাল্টিস্থানের উত্তরাঞ্চল।
কাশ্মীরি বিদ্রোহীরা এবং ভারত সরকারের মধ্যে বিরোধের মূল বিষয়টি হলো স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন। কাশ্মীরের গণতান্ত্রিক উন্নয়ন ১৯৭০-এর শেষভাগ পর্যন্ত ছিল সীমিত এবং ১৯৮৮ সালের মধ্যে ভারত সরকার কর্র্তৃক প্রদত্ত বহু গণতান্ত্রিক সংস্কার বাতিল হয়ে গিয়েছিল। অহিংস পথে অসন্তোষ জ্ঞাপন করার আর কোনো রাস্তাই খোলা ছিল না। ফলে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার জন্য বিদ্রোহীদের হিংসাত্মক আন্দোলনের সমর্থন নাটকীয়ভাবে বাড়তে থাকে। ১৯৮৭ সালে বিতর্কিত বিধানসভা নির্বাচন রাজ্যের বিধানসভার কিছু সদস্যদের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী গঠনে অনুঘটকের কাজ করেছিল। ১৯৮৮ সালের জুলাই মাসে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল, ধর্মঘট এবং আক্রমণের মাধ্যমে শুরু হয় কাশ্মীরের অস্থিরতা। যদিও জম্মু ও কাশ্মীরের অশান্তির ফলে হাজারো মানুষ মারা গেছে। প্রতিবাদী আন্দোলন ভারত সরকারের কাছে কাশ্মিরের সমস্যা ও ক্ষোভ জানানোর শক্তি জুগিয়েছে, বিশেষ করে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে, যারা ১৯৮৯ সালে থেকে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সক্রিয় রয়েছে।
এই অঞ্চলের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো হচ্ছে ন্যাশনাল কনফারেন্স, জম্মু ও কাশ্মীর পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং কংগ্রেস। বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচন বয়কটের ডাক দিলেও বহু সংখ্যক ভোটার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার এই নির্বাচনকে সাধারণভাবে নিরপেক্ষ হিসেবে গণ্য করে। এই নির্বাচনে জয়লাভ করে ভারতপন্থি জম্মু ও কাশ্মীর ন্যাশানাল কনফারেন্স রাজ্যে সরকার গঠন করে। ভয়েস অফ আমেরিকা অনুযায়ী, বহু বিশ্লেষকের মতে এই নির্বাচনে উচ্চ সংখ্যক ভোটারের উপস্থিতি কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের ভারতের শাসনকে সমর্থন করার ইঙ্গিত দেয়। তবে, কাশ্মীরের একজন বিশিষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা সাজ্জাদ লোন দাবি করেন, ‘উচ্চ সংখ্যক ভোটদানের হারকে কখনোই কাশ্মীরিরা যে আর স্বাধীনতা চান না তার একটি ইঙ্গিত হিসেবে যেন গ্রহণ করা না হয়। পরে ২০০৯ ও ২০১০ সালে আবার অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। এমন অসন্তোষ এখন কাশ্মীরের নিত্যদিনের ঘটনা।