রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ক্রমেই বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। অতিরিক্ত রোগী, তুলনামূলক স্বল্প সরঞ্জামাদি, কাজের বাড়তি চাপÑ সব মিলিয়ে প্রায় দিশেহারা হাসপাতালটির চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীরা। নিজেরা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, ডেঙ্গুতেও আক্রান্ত হয়েছেন অনেকে। তারপরও ডেঙ্গু আক্রান্তদের সেবা দিতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তারা। হাসপাতালটিতে শুরু হয়েছে বিনামূল্যে চিকিৎসা। পাশাপাশি আগামী সপ্তাহেই হাসপাতালটিতে চালু হচ্ছে ২০০
বেডের দুটি নতুন ওয়ার্ড।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী চলতি মাসের প্রথম চার দিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ৩৩৩ জন। বিপরীতে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ২৫৮ জন, অর্থাৎ এই ৪ দিনে হাসপাতালে বাড়তি রোগী যোগ হয়েছেন ৭৫ জন। এ ছাড়া গত ৫ দিনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে দুজন। গত রবিবার সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ৯৮ জন। বর্তমানে হাসপাতালে মোট ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন ৩৯৫ জন।
গতকাল হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, আন্তঃবিভাগের করিডরে রোগীদের রাখা হয়েছে। অনেকে হাসপাতাল থেকে দেওয়া ফোম পেয়েছেন আবার অনেকে কেবল মাদুর বিছিয়ে শুয়ে আছেন। মেঝেতে শুয়ে থাকা রোগীদের পাশ ঘেঁষেই জুতা নিয়ে চলাচল করছে সবাই। পর্যাপ্ত বাতাসের অভাবে ভ্যাপসা গরমে অতিষ্ঠ অবস্থা। এরপরও রোগীরা বলছেন, হাসপাতালের কর্তব্যরতরা তাদের সাধ্যমতো সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।
হাসপাতালে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা শিশু ওয়ার্ডে। মাত্র ৬০ শয্যার এই ওয়ার্ডে বর্তমানে রোগী রয়েছে প্রায় আড়াই শ। এর মধ্যে ১৫৩ জনই ডেঙ্গু রোগী।
হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ একটি বিছানার সঙ্গে আরেকটি বিছানা পাশাপাশি বসিয়েও সবাইকে বিছানা দিতে পারেনি। ফলে অনেক শিশুর ঠাঁই হয়েছে মেঝেতে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাড়তি চিকিৎসক ও নার্সের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
উত্তরা থেকে আসা শিশু আহনাফের মা জানান, কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে ঘুরে ছেলেকে ভর্তি করাতে না পেরে শনিবার বিকেলে এই হাসপাতালে এসেছেন। অবশেষে ছেলেকে ভর্তি করাতে সক্ষম হলেও বিছানা না পাওয়ায় মেঝেতে অবস্থান নিতে হয়েছে। এতে তার কোনো আক্ষেপ নেই জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারের উচিত হাসপাতালগুলোতে শিশুদের বিছানা বাড়ানো।
আন্তঃবিভাগের করিডরে অবস্থান নেওয়া এক রোগী জানান, তিনি রবিবার এই হাসপাতালে এসেছেন। তবে তার কাছ থেকে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ ডেঙ্গু পরীক্ষা বা ওষুধের জন্য কোনো টাকা নেয়নি। এ ছাড়া চিকিৎসক ও নার্সরাও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছেন। যদিও তা প্রয়োজনের তুলনায় কম। কিন্তু তাদের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি আমাদের বোঝা উচিত।
চাপে এলোমেলো প্যাথলজি বিভাগ
এত দিন হাসপাতালের অন্যতম সমস্যা ছিল ডেঙ্গু পরীক্ষার প্রধান কিট এনএস-১ না পাওয়া। তবে বর্তমানে সেই সমস্যার সমাধান হয়েছে। কিন্তু বাড়তি রোগীর চাপ ও অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে ওই বিভাগে বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছে। এতে পরীক্ষার প্রতিবেদন দিতে বাড়তি সময় লাগছে। সমস্যা সমাধানে আরও একটি নতুন মেশিন কিনেছে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। এ ছাড়া রেড ক্রিসেন্ট থেকে কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক যোগ দিয়েছেন ওই বিভাগে। এতে সমস্যা কিছুটা লাঘব হবে বলে জানান পরিচালক ডা. উত্তম কুমার বড়–য়া। আগামী সপ্তাহে যুক্ত হচ্ছে আরও দুটি নতুন ওয়ার্ড
হাসপাতালের অতিরিক্ত পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. কামরুল আকরাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগামী সপ্তাহে আমাদের আরও দুটি নতুন ওয়ার্ড যুক্ত হচ্ছে। সেখানে আরও ২০০ রোগীকে স্থান দেওয়া যাবে। ওই ওয়ার্ডের কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন না হলেও রোগী রাখার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে। এখন কেবল টয়লেটের কাজ বাকি। এই ওয়ার্ড দুটি চালু হলে রোগীদের কষ্ট অনেকটাই লাঘব হবে।’
যোগ দেবেন কলেজের শিক্ষকরাও
হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের ধারণা, আগামী কোরবানির ঈদে হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর চাপ আরও বাড়তে পারে। এমনটা হলে অনেক চিকিৎসকের অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সে সময় যাতে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত না হয় সে জন্য কলেজের সহযোগী অধ্যাপকদের হাসপাতালে সংযুক্ত করার জন্য মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ বরাবর চিঠি দিয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক। তবে কলেজে এখনো ক্লাস চলার কারণে এখনই তাদের পাওয়া যাচ্ছে না। কলেজ বন্ধ হলে এবং সংকট আরও ঘনীভূত হলেই তাদের মেডিকেল বিভাগে সংযুক্ত করা হবে।
প্যাথলজির বারান্দায় এক বেডে তিন শিশু
হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগের সামনে এক বেডে একই পরিবারের ডেঙ্গু আক্রান্ত তিন শিশুকে চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে। এদের মধ্যে প্রথমে আলিফ রহমান (১২) শনিবার বিকেলে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। রবিবার তার সঙ্গে যোগ দেয় ছোট ভাই সাফিন রহমান (১০)। ওই দিন রাতেই তার খালাতো বোন মারিয়া আক্তারও (১১) ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আসে। কিন্তু শিশু ওয়ার্ডে স্থান সংকুলান না হওয়ায় তাদের একসঙ্গে সেখানে রাখা হয়েছে। ফলে স্থান সংকুলান না হওয়ায় তাদের থাকতে কষ্ট হচ্ছে বলে জানায় আলিফ। তাদের বেড নম্বর ভি-৫৩।
আক্রান্তদের নানি আলেয়া বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সমস্যার বিষয়ে নার্সদের জানালে তারা আরেকটি সিটের ব্যবস্থা করে দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে নার্সরা জানিয়েছেন, সিট পেতে একটু সময় লাগতে পারে।
হাসপাতালের সার্বিক বিষয় নিয়ে পরিচালক ডা. উত্তম কুমার বড়–য়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি। বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা ও ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। নিজেদের অর্থায়নে কিট ও স্যালাইন কেনা হচ্ছে। নতুন মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। এত কিছুর পরও রোগীদের পর্যাপ্ত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ইতিমধ্যে আমাদের কয়েকজন চিকিৎসক ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। এ ছাড়া অনেকেই অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে যারা জুনিয়র চিকিৎসক তাদের কষ্ট অনেক বেশি হচ্ছে। আমি নিজেও ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। সমস্যা সমাধানে জরুরি বিভাগ থেকেও কয়েকজন ডাক্তারকে ফেভার ক্লিনিকে স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে স্থান সংকুলন না হওয়ার পরও আমার হাসপাতাল থেকে কাউকে ফিরে যেতে হচ্ছে না। সবাইকে পরীক্ষা করার পাশাপাশি আক্রান্তদের ভর্তি করানো হচ্ছে।