অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে প্রথম স্থান অধিকার করে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৮৪ সালে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। দেশে ও বিদেশের নানা জার্নালে তার গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পর ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত কাজী শহীদুল্লাহ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সম্প্রতি দেশের প্রায় ১৫০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দিয়েছেন এই অধ্যাপক। উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়মনিষ্ঠ করা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর গবেষণার সংখ্যা ও মান বৃদ্ধি, শিক্ষক নিয়োগে অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ণসহ উচ্চশিক্ষার নানা দিক নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন অধ্যাপক কাজী শহীদুল্লাহ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক রশিদ আল রুহানী
দেশ রূপান্তর : দেশে এখন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক। কিন্তু উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে আপনি কী মনে করেন?
কাজী শহীদুল্লাহ : দেশে প্রায় ১৫০টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। ফলে এখন আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব নেই। তবে প্রশ্নের বিষয় হচ্ছে, এই ছেলেমেয়েরা এইসব প্রতিষ্ঠান থেকে লেখাপড়া শেষ করে বের হওয়ার সময় কি মানসম্মত শিক্ষা নিয়ে বের হতে পারছে? সার্টিফিকেট পাচ্ছে, রেজাল্টও ভালো করছে। তারপরও আমি মনে করি, এইসব শিক্ষার্থী মানসম্মত শিক্ষা নিয়ে বের হচ্ছে না। এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। শিক্ষকদের মানই ঠিক নেই শিক্ষার্থীদের মান কী হবে। তাই এখন আমরা মানসম্মত শিক্ষার দিকে বেশি করে নজর দিচ্ছি। উচ্চশিক্ষাকে কীভাবে সঠিক মানে ফিরিয়ে আনা যায় তা নিয়ে কাজ করছি।
দেশ রূপান্তর : শিক্ষকদের মান ও শিক্ষার্থীদের মান কীভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব?
কাজী শহীদুল্লাহ : শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে প্রধান ভূমিকা রাখেন শিক্ষকরা। আমরা বিভিন্ন রিসার্চের জন্য টুলস ব্যবহার করি। কিন্তু যে শিক্ষক টুলসের ব্যবহার না জানে তিনি ভালো রিসার্চ করবেন কীভাবে। মানসম্মত শিক্ষার জন্য প্রধান ভূমিকাই রাখেন শিক্ষকরা। আর এটা ঠিক করতে হলে আমি মনে করি শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা আনতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ যদি শুধুমাত্র মেরিটে হয় তাহলে আমাদের শিক্ষার মান তরতর করে বেড়ে যাবে। মেধাবীরা সবসময় পড়াশোনা ও তার পেশার প্রতি মনোযোগী থাকেন। গবেষণার প্রতি মনোযোগী থাকেন। গবেষণা করা তার নেশায় পরিণত হয়। অন্যদিকে যার শিক্ষকতায় আসা উচিত ছিল না, তবুও সে চলে এসেছে এমন শিক্ষকদের নিয়ে অনেক ভোগান্তিতে পড়তে হয়। যদি কোনো ভুল বা অমেধাবী ব্যক্তিকে শিক্ষকতায় আনা হয়, যার শিক্ষকতায় আসার যোগ্যতা নেই, তাকে যদি নেওয়া হয় তাহলে তিনি যে ৪০ বছর চাকরি করবেন, সেই ৪০ বছর ধরেই শিক্ষার্থীরা ভোগান্তিতে থাকবে। এরা ক্লাসের প্রতি মনোযোগী থাকেন না, মূল জায়গায় ফোকাস না দিয়ে ভিন্ন দিকে ফোকাস দেন, গবেষণা করতে চান না। আমরা জানি, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধাবীদের স্থান হচ্ছে না। বিভিন্ন প্রভাবের জেরে পড়ে ভুল ব্যক্তিকে রিক্রুট করা হচ্ছে। আমরা চাই, কোনো ভুল ব্যক্তির যেন শিক্ষকতায় আসার সুযোগ না থাকে। ফলে আমরা চেষ্টা করছি অভিন্ন শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতির মাধ্যমে মেধাবীদেরই শিক্ষকতায় আনার। এটা চালু হলে মেধাবী ছাড়া ভিন্ন কারোর এই পেশায় আসার সুযোগ থাকবে না। তখন শিক্ষার মান এগিয়ে যাবে।
দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্ব র্যাংকিংয়ে স্থান করে নিতে পারছে না কেন? এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?
কাজী শহীদুল্লাহ : দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে কোয়ালিটি এডুকেশন নেই তা বিশ্ব ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেই প্রমাণ হয়েছে। দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটসহ অন্যান্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয় মানসম্মত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের র্যাংকিংয়ে নেই। আর এর মূল কারণই হলো মানসম্মত শিক্ষার অভাব। ফলে বর্তমানে আমাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো কোয়ালিটি এডুকেশন নিশ্চিত করা। কোয়ালিটি এডুকেশন নিয়ে বেশ কিছু বিষয়ে ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। সরকার অ্যাক্রেডিটেশন কমিশন গঠন করেছে। এই কাউন্সিল কাজ শুরু করলে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের কী অবস্থা, কোনটির কোন জায়গায় দুর্বলতা রয়েছে, কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান কোন স্থানে সেগুলো পানির মতো পরিষ্কারভাবে দেখা যাবে। তখন কাউন্সিল ও ইউজিসি ওই সব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়নে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। যার যেখানে দুর্বলতা সেখানে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে।
দেশ রূপান্তর : সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা এবারও শুরু করা গেল না। শুধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এবার গুচ্ছভিত্তিক পরীক্ষা নেবে। কীভাবে সবাইকে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষায় আনা যায়?
কাজী শহীদুল্লাহ : আসলে এটা জাতীয় স্বার্থেই সকল শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য খুবই প্রয়োজন ছিল। গত কয়েক বছর ধরেই তো চেষ্টা করা হচ্ছে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা বাস্তবায়নের। কিন্তু কেউ কেউ এটা চাচ্ছে না। যদিও এবার কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গুচ্ছভিত্তিক পরীক্ষা শুরু করছে। আশা করি আগামী বছর দেশের সকল সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এই নিয়মে আসবে। আমরাও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আহ্বান করছি তারা যেন সমন্বিত ভর্তি পদ্ধতিতে আসে। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কষ্ট কমবে এবং ভর্তি পরীক্ষার পদ্ধতিটা আরও উন্নত হবে।
দেশ রূপান্তর : বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সেগুলোকে নিয়মে আনার জন্য ইউজিসি কী কী কাজ করছে?
কাজী শহীদুল্লাহ : আসলে বিদেশে পাবলিকের চেয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতি ছাত্রছাত্রীদের আকর্ষণ থাকে বেশি। কারণ সেখানে ব্যবসায়িক মানসিকতা নেই। আমাদের দেশের পরিস্থিতিটা কিন্তু ভিন্ন। আইনে লেখা আছে সেবা কিন্তু তারা কি আদৌ সেবা দেয়? করে ব্যবসা। তবে এর মধ্যে কেউ কেউ ব্যবসা করলেও শিক্ষার মানটাও ভালো দিতে পারছে, এমন কিছু ভালো প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিও রয়েছে দেশে। তবে বেশিরভাগেরই উদ্দেশ্য ভালো না। এক্ষেত্রে আরও একটি সমস্যা রয়েছে। একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যই কিন্তু ‘অল ইন অল’। অথচ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের যত ক্ষমতা তা নিয়ন্ত্রিত হয় ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে। ট্রাস্টি বোর্ড যেমন বলে তেমনই করতে হয়। ফলে একটা বোর্ডের যদি বিজনেস করার মানসিকতা থাকে এবং শিক্ষার মূল্যটা তারা ঠিকভাবে না বোঝে তাহলে একজন উপাচার্যের জন্য আসলেই অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মান ঠিক রাখা। তবে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ফোর্স করছি তারা যেন নিয়মে আসে। আমাদের যে আইনকানুন, বিধিবিধান ও নীতিমালা আছে, তা যেন তারা মানে তার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। আইন ও নিয়ম মানতেই হবে। সিস্টেমের মধ্যে সবাইকে আসতেই হবে। অনেক সময় পার হওয়ার পরও বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় স্থায়ী ক্যাম্পাসে যায়নি। যারা স্থায়ী ক্যাম্পাসে গেছেন, তাদের আমরা ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু যারা যাননি, তাদের যেতেই হবে। তারপরও আমরা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নিতে পারি না। সেই ক্ষমতা আমাদের ইউজিসির আইনে দেওয়া হয়নি। ফলে আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বড়জোর সুপারিশ করতে পারি।
দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস খোলার বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।
কাজী শহীদুল্লাহ : ভালো বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় হলে অনুমতি পেতে পারে। আমাদের দেশে এর চাহিদা হয়তো আছে। কেননা, অনেকে বিদেশে পড়তে যায়। তারা যদি দেশে বসেই পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারে, তাহলে বৈদেশিক মুদ্রা রক্ষা পাবে। কিন্তু বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার অনুমতির ক্ষেত্রে আমাদের সিলেকটিভ (নির্বাচনশীল) হতে হবে। লন্ডন ইউনিভার্সিটি অব ইকোনমিক্স বা এ ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় যদি আসে তাহলে আমরা ভেবে দেখব। আমরা বিদেশের কোনো নামহীন বা ব্রিফকেস ইউনিভার্সিটির অনুমোদন দিতে পারি না। অনুমোদনের আগে অবশ্যই সেটা জেনুইন (ভুয়া নয়) কি না, দেখতে হবে। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় বা এর সেন্টার বা আঞ্চলিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার আবেদন যাচাইয়ের কাজ সতর্কতার সঙ্গে, পক্ষপাতহীনভাবে করতে হবে। দেখতে হবে সেটা কতটুকু আমাদের জন্য ভালো হবে। যে কেউ চাইলেই যে দেওয়া হবে তা নয়। আর দেখার ক্ষেত্রে কাজটি অবশ্যই সৎ কর্মকর্তাদের দিয়ে করাতে হবে।
দেশ রূপান্তর : ইউজিসির ক্ষমতা বাড়িয়ে উচ্চশিক্ষা কমিশন করার দাবি বাস্তবায়নের কতদূর?
কাজী শহীদুল্লাহ : আসলে এই দাবিটা অনেক দিনের। সাধারণ মানুষ যারা এই বিষয়ে জানেন না তারা নানান কথা বলেন ইউজিসির বিরুদ্ধে। তারা বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনিয়ম করে, আপনারা বন্ধ করে দেন না কেন? সবাই মনে করে আমরাই মনে হয় এসবের ক্ষমতা রাখি। আসলে তা নয়। তবে ইউজিসির ক্ষমতা বাড়িয়ে উচ্চশিক্ষা কমিশন করার দাবি শুধু আমাদেরই না, সরকারও বিষয়টা উপলব্ধি করেছে। ইউজিসিকে উচ্চশিক্ষা কমিশন করা হলে শিক্ষার মান নিশ্চিতে আরও কয়েকগুণ বেশি কাজ করা সম্ভব হবে। কারণ, আমাদের যদি শুধু সুপারিশ করার ক্ষমতা থাকে কিন্তু তা বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা না থাকে তাহলে তো আসলে কোনো কিছুই ইফেক্টিভ হবে না। ফলে এ বিষয়ে সরকারেরও সুদৃষ্টি রয়েছে।