শুক্রবার, ৩১ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

চলচ্চিত্রের ঐতিহ্য ফেরাতে চাই

আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৩, ১১:৪১ এএম

অসম্ভব ব্যস্ত মানুষ তিনি। কথা দিয়েছেন আসবেন। রিপোর্টিং, সম্পাদকীয় ও ফিচার বিভাগের অনেকেই উৎকণ্ঠায়। এলেন রাত সাড়ে ৯টায়। বললেন হায় হায়, অনেক রাত হয়ে গেছে। চলো চলো, আড্ডা শুরু করি। মধ্যমণি চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। বহুমাত্রিক পরিচয় তার। একদিকে জনপ্রিয় চিত্রনায়ক, অন্যদিকে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি এবং নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) চেয়ারম্যান। আড্ডাবাজ হিসেবে ছিলেন সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান, সিনিয়র সহ-সম্পাদক সালাহ উদ্দিন শুভ্র, স্টাফ রিপোর্টার সানমুন আহমেদ, সহ-সম্পাদক মাসিদ রণ

এবং ডিজিটাল প্রযোজক লিটু হাসান

তাপস রায়হান : আপনি ১৯৭৭ সালে আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ উপন্যাস অবলম্বনে সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘বসুন্ধরা’ চলচ্চিত্র দিয়ে সেলুলয়েডে যাত্রা শুরু করেন। বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা ববিতা। এরপর তো অনেক ছবি। আবার ‘বেদের মেয়ে জোস্না’ ছবিতে অঞ্জু ঘোষের বিপরীতে অভিনয় করে দুই বাংলায় হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে চলচ্চিত্র প্রযোজক এবং পরিচালক। সেই ‘বসুন্ধরা’ ছবির কথা মনে আছে?

ইলিয়াস কাঞ্চন : (ইলিয়াস কাঞ্চন হাসলেন)। বললেন  মনে নাই মানে? এটা তো প্রথম ছবি। সেই কথা ভোলা যায়? এটা হলো, প্রথম প্রেম! সেই প্রেমের কথা কেউ ভোলে? হাহাহাহাহাহা ...। শুধু প্রেম না, যে কোনো জিনিসই যা প্রথম, সেটা ভোলা যায় না। আমি পরিচালক সুভাষ দত্তের কাছে অসম্ভব কৃতজ্ঞ। তিনিই সুযোগ করে দিয়েছিলেন, চলচ্চিত্রে অভিনয় করার। না হলে আমি যে কী করতাম, জানি না।

সালাহ উদ্দিন শুভ্র : আপনি আগে থেকেই অভিনয় করতেন?

ইলিয়াস কাঞ্চন : আগে খুব যে একটা অভিনয় করতাম, তা না। এখানে অনেক কাহিনি আছে। আমার বাড়ি কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ। সেই জায়গাটা কিন্তু শিল্প-সংস্কৃতিসমৃদ্ধ। সেখানে অসংখ্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের জন্ম হয়েছে। যারা দুই বাংলাতেই অসম্ভব জনপ্রিয় এবং গুণী ব্যক্তিত্ব। আমাদের এলাকার একটা নিজস্ব সংস্কৃতি আছে।

বর্ষাকালে সাধারণত আমাদের ওখানে সাধারণ মানুষের কোনো কাজ থাকত না। সেই অবসর সময়ে তারা বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক রঙতামাশায় মেতে উঠতেন। ছোটবেলায় দেখতাম, সেই সময় অনেকেই পায়ে ঘুঙুরের মতো, আমাদের এলাকায় বলে ‘মেকুর’, সেটা পরে দলবেঁধে গানের তালে তালে নাচতেন। নাচলে দারুণ ছান্দিক শব্দ হতো। আমি মুগ্ধ হয়ে তাদের নাচ দেখতাম। সেই ধরনের নাচ আর কোথাও দেখি নাই। আমাদের ওখানে যে পালাগান, যাত্রাপালা হতো সেটা দেখার জন্য বহু দূরের মানুষ নৌকা দিয়ে আসতেন। একবার হলো কী, তখন আমি ক্লাস সিক্স কি সেভেনে পড়ি। একটি যাত্রাপালার রিহার্সেল দেখতে গেছি, আমাদের বাড়ির সামনে। আমাকে ওরা দেখেই বলল তুমি একটা রিহার্সেল করো তো? দেখি কেমন হয়! আমি রিহার্সেল করলাম। ওদের মধ্যে অনেকেই অবাক হলো। আমি কিন্তু কিছুই বুঝতে পারিনি। তবে এটা বুঝতে পেরেছিলাম, অভিনয় করার একটা গুণ আমার মধ্যে রয়েছে। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে অভিনয় করি, তার কিছুদিন পরই। আমি স্কাউট ছিলাম। ক্যাম্প ছিল মৌচাকে। সেখানে একটা নিয়ম ছিল, সন্ধ্যা বেলাতেই হতো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেখানেই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে অভিনয় করি, একটি নাটিকায়। কী যে হাততালি...! তারপর তো মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর স্বাধীন হলো দেশ।

আমি তো তখন ক্লাস নাইনে। কিন্তু আমাদের সময় ছিল অটো প্রমোশন। দেশ স্বাধীনের পর অটো প্রমোশনে উঠলাম নিউ টেনে। তখন স্কুল থেকে মুক্তিযুদ্ধের ওপর একটা নাটকের আয়োজন করা হলো। সেখানে অভিনয় করলাম। নায়িকার বাবার রোলো! (ইলিয়াস কাঞ্চনসহ সব আড্ডাবাজ হো হো করে হেসে উঠেলেন)। নায়িকা ছিল, ‘ঝর্ণা’ নামের একটি মেয়ে। সে সময় নাটকের পরিচিত মুখ। আবার নায়ক ছিল, আমার ক্লাসমেট হাহাহাহাহা। ও এখন আমেরিকাতে থাকে। জানি না, বেঁচে আছে কিনা? ওই নাটকে ‘বাবা’র চরিত্রে অভিনয় করে খুবই প্রশংসিত হয়েছিলাম। একই সঙ্গে এলাকায় পরিচিত হয়ে গেলাম।

এরপর তো ম্যাট্রিক পাস করলাম। স্কুলের একজন শিক্ষক, আমাদের গ্রুপটাকে খুব পছন্দ করতেন। কারণ, দুষ্টুমি বা যাই করি না কেন, আমরা পড়াশোনাটা ভালোমতো করতাম। অন্যায় কিছু করতাম না। তখন সেই স্যার বললেন তোমরা একটা সাংস্কৃতিক সংগঠন করো। ম্যাট্রিক পাসের পর তো সবাই আলাদা হয়ে যাবে। কিন্তু সংগঠন থাকলে, যোগাযোগ থাকবে। তখন ‘সৃজন সংঘ’ নামে একটা সাংস্কৃতিক সংগঠন করলাম। এটা সম্ভবত ১৯৭৫ সালের কথা। এরপর একদিন রাস্তায় হাঁটছিলাম, আমাদের ক্লাসের ফার্স্টবয়ের সঙ্গে দেখা। আমার উদ্দেশে বলল এই ইলিয়াস, জানিছ আমরা একটা নাটকের আয়োজন করেছি। ও আবার ছিল কলকাতার। শার্টের কলার নাচিয়ে বলল ‘ছোন, ঐ যে প্রাইমারি স্কুলটা আচে, ওকানে আমরা রিহার্সেল করি। তুই আসবি। জানিস তো, ঐ যে কায়েস আছে না, নায়ক কায়েস?’ তাকে আমরা ডিরেক্টর নিয়েছি। আবার কলার নাচিয়ে বলল ছোন, নায়িকা জুলিয়া হচ্ছেন আমাদের নাটকের নায়িকা। আছিছ রিহার্সেলে, কেমন? তো, একদিন গেলাম। তখন কায়েস ভাই অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। সেইদিন একটা চরিত্রে অভিনেতা আসেনি। তখন আমাকে কায়েস ভাই বললেন যদি কিছু মনে না করেন, একটু প্রক্সি দেবেন? আমার অভিনয় দেখে তো তিনি ভীষণ খুশি। তিনি সবার উদ্দেশে বললেন দেখেন, যাকে কাস্ট করেছেন তিনি কী অভিনয় করেন আর তিনি প্রক্সিতে কী অভিনয় করছেন? ওনাকে অভিনয়ে নিন। তখন আমার বন্ধু বলল, তুই থাকিস। এরপর আমাকে সেই নাটকে একটি চাকরের চরিত্রে অভিনয়ের অফার করা হলো। একটা গামছা কাঁধে থাকবে। তারপর কিছু ডায়ালগ। আমি অপমান বোধ করলাম। স্বয়ং ডিরেক্টর যেখানে আমার প্রশংসা করেছে সেখানে আমাকে এই চরিত্রে অভিনয় করতে হবে? আমি অভিনয়ে অসম্মত হলাম। কারণ হচ্ছে, ছোটবেলা থেকেই আমার একটা প্রেস্টিজ জ্ঞান ছিল।

এরপর ঢাকা এলাম। সেই যে ‘সৃজন সংঘ’ ছিল, তখন অনেকেই একত্রিত হলাম। একুশে ফেব্রুয়ারিতে একটা স্মরণিকা বের হলো। তখন সেই স্মরণিকায় আমার একটা কবিতা ছাপা হয়। আমার কবিতার নাম ও স্মরণিকার নাম ছিল উৎসর্গ। তখন আমি বললাম আচ্ছা, আমরা কি একটা নাটক করতে পারি না? সবাই বলল হ্যাঁ, এটা তো খুবই ভালো প্রস্তাব। নাটকের প্রস্তুতি শুরু হলো। ‘সুবচন নির্বাসনে’ নাটকটি আমরা বেছে নিলাম। এখন এটা মঞ্চায়ন কোথায় হবে? সিদ্ধান্ত হলো, ওয়াপদা অডিটোরিয়ামে হবে। সেখানে আমরা গেলাম। আমরা ভাবলাম, এখানে নাটক করতে হলো তো কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগবে। কী করি? তখন সেই প্রতিষ্ঠানের যে প্রধান আছেন, তাকে যদি আমরা প্রধান অতিথি করি (হাসতে হাসতে) তাহলে তো একটা বেনিফিট পেতে পারি। (ইলিয়াস কাঞ্চন বললেন স্যার, আমারে মাফ কইরা দিয়েন। ঐ বয়সে আমাদের তো পয়সাকড়ি ছিল না। যে কারণে একটা উদ্দেশ্য নিয়ে করেছিলাম)। যাই হোক, তখন তিনি পানি উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। সেই সময় ফারাক্কা নিয়ে একটা সমস্যা তৈরি হলো। একটি লোকের মাধ্যমে তিনি আমাদের একটি চিঠি পাঠালেন। সেখানে লেখা ছিল বাবারা, আমি তো তোমাদের কথা দিয়েছিলাম। কিন্তু আমি থাকতে পারছি না। নদী কমিশনের জরুরি মিটিং। তোমরা আমাকে এবারের মতো ক্ষমা করে দাও। বললে চিনবেন  মানুষটি হলেন আসাফ-উদ-দৌলা। (তিনি হাসতে হাসতে বললেন ক্ষমা তো করতেই হবে। কিন্তু এখন টাকা পাব কই?) সবারই দুশ্চিন্তা। আমার মন তো আরও খারাপ। কারণ প্রস্তাব তো আমারই ছিল। এরপর সবাই ভাবল, ঠিক আছে টাকা না পাই। এমন একজন লোক আমাদের বের করতে হবে, টাকা না পেলাম, কিন্তু আমাদের নাটকের প্রশংসা করবেন।

সুভাষ দত্ত তখন ওয়ারি থাকতেন। আমাদের ক্লাবও ওয়ারি। সবাই তার কাছে গেল। আমি আর রাগে-গোস্বায় গেলাম না। তিনিও রাজি হয়ে গেলেন। নাটকের দিন এলেন। প্রথম দৃশ্যেই আমি ছিলাম। সিনড্রপের সময়, আমি ভেতরে চলে গেলাম। গ্রিনরুমে এসে তিনি আমার মাথায় হাত বুলালেন। আমি তো অবাক। বললেন আরও ভালো করো। উনার মতো একজন চলচ্চিত্র পরিচালক আমার প্রশংসা করছেন, আমি বিস্মিত হলাম। নাটক শেষে সবাই তো আমাকে বলতে শুরু করল, তোর তো কপাল খুইলা গ্যাছে।

তখন আমার মাথার চুল ছিল বড় বড়। নাটকের জন্য চুল কাটতে হবে। একদিন আমাকে সেলুনে পেলেন সুভাষ দত্ত। এরপর তো...

সানমুন আহমেদ : আপনি তো সড়কেরও হিরো। নিরাপদ সড়ক নিয়ে কাজ করছেন। সম্প্রতি বিআরটিএ বলেছে- ঢাকা শহরে ফিটনেসবিহীন গাড়ি রয়েছে ৫ লাখেরও বেশি। এই সমস্ত গাড়ির জন্যই দুর্ঘটনা বেশি হচ্ছে। এসব গাড়ি অপসারণের দায়িত্ব কার?

ইলিয়াস কাঞ্চন : ৫ লাখ তো বললেন, গাড়ি। হাসতে হাসতে বললেন আর অবৈধ কত? প্রথমেই বলি ফিটনেসবিহীন গাড়ি রয়েছে আরও অনেক বেশি। ব্যাটারি চালিতসহ অবৈধ গাড়ি আমাদের দেশে আছে প্রায় ৭০ লাখের মতো।  এই ৭০ লাখ গাড়ি আর আপনার ৫ লাখ গাড়ি। জাতিসংঘের একটা নির্দেশনা রয়েছে- সড়কে গাড়ি চলাচল করতে হলে ৫টি জিনিস মাথায় রেখে কাজ করতে হবে। এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনা কমানো যাবে না। এর মধ্যে হচ্ছে-

সড়কের জন্য একটা ম্যানেজমেন্ট কমিটি করতে হবে। ম্যানেজমেন্ট টিম লাগবে। তাদের প্রত্যেককে অভিজ্ঞ হতে হবে। তাদের জানতে হবে, কীভাবে সবকিছু ম্যানেজ করতে হয়?

ম্যানেজমেন্ট কমিটির মাধ্যমে তারা দেখবে, যে সড়কটি নির্মাণ হলো তা চলাচলের জন্য নিরাপদ হলো কি না? একটা সড়ক নির্মাণের জন্য কিছু জিনিস থাকতে হয়। সেগুলো না থাকলে সড়ক নিরাপদ হবে না। যেমন আমি আপনাকে বলি- আপনি একটা সড়ক নির্মাণ করলেন। পাশের ফুটপাতে যদি দোকানপাট বসান, তাহলে তো হবে না।  এখন কোনো পথচারী ফুটপাত না পেলে, সড়ক দিয়ে যদি হেঁটে যায়, স্বাভাবিকভাবেই দুর্ঘটনা হবে। এই কারণেই বলা হচ্ছে- সড়ক এমনভাবে তৈরি হবে, যাতে কোনো মানুষ ভুল করলেও, সড়কের কোনো ভুল থাকবে না। এই সড়কের মধ্যে যে যানবাহন চলবে, সেটা অবশ্যই ফিট এবং সেফটি হতে হবে। সেফটির মধ্যে রয়েছে- গাড়ির ফিটনেস থাকতে হবে। শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট আসন থাকতে হবে। সেই গাড়ি সড়কে চলার মতোন উপযুক্ততা থাকতে হবে। এই সড়ক এবং গাড়ি যারা ব্যবহার করবেন, তাদের নিরাপদ হতে হবে। তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। এতকিছুর পরও যদি কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যায়, তাহলে এক ঘণ্টার মধ্যে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

জাতিসংঘ এই নির্দেশনা দিয়েছে ২০১০ সালে। বলেছিল, ২০২০ সালের মধ্যে তাহলে দুর্ঘটনা ৫০ শতাংশ কমে যাবে। কোনো কোনো দেশ প্রায় ৯০ শতাংশ এই নির্দেশনা মেনে চলেছে। ফলে দুর্ঘটনাও কমে গেছে। কিন্তু আমাদের মতো কয়েকটি দেশ সেই টার্গেট পূরণ করতে পারেনি। এরপর জাতিসংঘ ২০৩০ সাল পর্যন্ত আরেকটি টার্গেট দিয়েছে। সেই টার্গেটে বলেছে- সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট যদি অর্জন করতে চাও, তাহলে অবশ্যই ৫০ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে হবে। না হলে সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব না।

সালাহ উদ্দিন শুভ্র : ‘বেদের মেয়ে  জোস্না’ ছবিতে কীভাবে যুক্ত হলেন?

ইলিয়াস কাঞ্চন : এই ছবিতে আমি যখন যুক্ত হই, তখন কিন্তু অসম্ভব ব্যস্ত নায়ক। এই ছবির পরিচালক ছিলেন তোজাম্মেল হক বকুল। কখনো মনে হয়নি, তার মধ্যে এমন মেধা লুকিয়ে আছে। (এমন সময় অফিস সহকারী এলেন স্যান্ডউইচ নিয়ে। ডিজিটাল প্রযোজক লিটু হাসান বললেন- কাট। আমরা বললাম, অনুষ্ঠান চলুক। আবার লিটু বললেন, তাইলে এডিটিংয়ের সময় মনে থাকবে না। আমাদের কষ্ট করতে হবে। অবশেষে ক্যামেরা বন্ধ হলো। ইলিয়াস কাঞ্চন খেতে খেতে বললেন- এইটা সব জায়গায়। কোথাও শুটিং করতে গেলেও, রাস্তাঘাট বন্ধ করে দেয়। আরে, রাস্তাঘাটে কি মানুষ চলবে না? তখন লিটু হেসে বললেন, আইচ্ছা যান যান।)

এই ছবিতে অভিনয় করার ঘটনা অনেক বড়। আসলে তখন আমি ভীষণ ব্যস্ত নায়ক। কোনোভাবেই সময় মেলাতে পারছিলাম না। আবার আমি হচ্ছি, আধুনিক নায়ক। কী যে করি! কিন্তু তোজাম্মেল হক বকুল আমাকে ছাড়া ছবি বানাবেন না। যাই হোক, দারাশিকো ভাই একদিন বললেন- আপনি কি চান না, ছেলেটি পরিচালক হোক? আমি বললাম- শিডিউল কোথায়? কীভাবে সময় দেব? আপনি তো জানেন, দুই বছরের মধ্যে কোনো শিডিউল নেই। ‘মনের মতো বউ’ ছবির শুটিংয়ের জন্য ১০ দিনের একটা শিডিউল ছিল। দারা ভাই বললেন- এইটা আপনি বকুলকে দিয়া দেন। আমি বললাম, এইটা তো আপনের শিডিউল। তিনি বললেন- এইটা আমি ম্যানেজ করব। এরপর শিডিউল দেওয়া হলো। একদিন আমি শুটিং করতেছি, রাজা-বাদশার ড্রেস পরা। চম্পা ম্যাডাম আমাকে দেখে বলে- (ইলিয়াস কাঞ্চন হাসছেন) আরে, এতো রাজকুমার? তিনি আরও কয়েকজনকে ডাকলেন। বললেন- তাড়াতাড়ি আসেন। দেখেন আপনের হিরোর কী অবস্থা! এরপর আমি খুব সতর্ক থাকতাম।

মাসিদ রণ : সত্যজিৎ রায় এই ছবি সম্পর্কে একটা মন্তব্য করেছিলেন?

ইলিয়াস কাঞ্চন : আসলে তিনি তার সহকারীকে বলেছিলেন- শুনলাম, এইরকম একটি ছবি খুবই ব্যবসা করছে। তুমি কি এ সম্পর্কে কিছু জানো? তখন সহকারী তাচ্ছিল্য নিয়ে বললেন- না না, এটা তেমন কোনো ছবি না। ফোক ধরনের কাহিনি। তখন সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন- দেখো, তুমি, যেভাবে অবহেলার সঙ্গে কথা বলছ, বিষয়টা কিন্তু তা না। শুনেছি, লাখ লাখ মানুষ এই ছবি দেখছে। এত মানুষের মধ্যে জায়গা করে নেওয়া কিন্তু সহজ বিষয় না। ছবিতে এমন কিছু রয়েছে, যে কারণে মানুষ দেখছে। তুমি বরং ছবিটি দেখো।

সালাহ উদ্দিন শুভ্র : আপনার কী মনে হয়? ছবিতে এমন কী ছিল? 

ইলিয়াস কাঞ্চন : আসলে একটি চলচ্চিত্র তখনই সুপারহিট হয়ে ওঠে, যখন একজন দর্শককে বাস্তবতা থেকে সরিয়ে ছবির মধ্যে  প্রবেশ করাতে পারবেন। আপনি যখন ছবির মধ্যে হারিয়ে যাবেন, তখন সেই ছবি জনপ্রিয় ওয়ে ওঠে। 

মাসিদ রণ : এখন পর্যন্ত এই ছবিটি ব্যবসাসফল। ছবিটি যখন জনপ্রিয় হয়ে উঠল, তখন কি আপনার মধ্যে এক ধরনের অহংকার বা দম্ভ কাজ করেছে?

ইলিয়াস কাঞ্চন : আসলে সেই সময় আমি, অনেক ব্যস্ত নায়ক। অহংকার করার মতো সুযোগ পাইনি।

তাপস রায়হান : আপনাকে কয়েকটি প্রশ্ন করব। এক কথায় উত্তর দিতে হবে। (হেসে বললেন, আচ্ছা)। আমাদের ছবিতে একসময় অশ্লীলতা শুরু হয়েছিল। এখন বন্ধ হয়েছে?

ইলিয়াস কাঞ্চন :  অনেক কমেছে।

তাপস রায়হান : আপনার অভিনীত ছবির সংখ্যা ৩০০-এরও বেশি। অভিনেত্রীদের কোন বিষয়ে অসম্ভব সচেতন থাকতে হয়?

ইলিয়াস কাঞ্চন : এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায় হবে না।

তাপস রায়হান : আপনি একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। বর্তমানে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি। আমাদের চলচ্চিত্র বিকাশে কোন পক্ষের কেমন ভূমিকা প্রয়োজন?

ইলিয়াস কাঞ্চন : আমাদের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। একটা সুষ্ঠু পলিসি, একটা ফান্ড তৈরি করা দরকার।

তাপস রায়হান : আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাণ করা সম্ভব?

ইলিয়াস কাঞ্চন: একটা ভালো পৃষ্ঠপোষকতা পেলে, আমাদের এখানে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাণ করা সম্ভব। শিল্পীদের কোনো অভাব রয়েছে বলে আমি মনে করি না।

তাপস রায়হান :  এই মুহূর্তে কোন বিষয়টি প্রধান্য দেবেন?

ইলিয়াস কাঞ্চন : আসলে আমি যখন শিল্পী সমিতির সভাপতি পদে নির্বাচন করি, তখন কিছু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়, সব্ইাকে নিয়ে আমরা কাজ করতে চাই। হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনতে চাই।

তাপস রায়হান : নতুন মুখের সন্ধানের মাধ্যমে মান্না ছাড়াও আমরা অনেক শিল্পী পেয়েছি। কিন্তু দীর্ঘদিন তা বন্ধ। কেন? 

ইলিয়াস কাঞ্চন : এখন একটা চেষ্টা চলছে। এখানে শিল্পী, এফডিসি, সরকারসহ অনেকের সহযোগিতা লাগবে।

সানমুন আহমেদ : সড়কে দুর্ঘটনা কমানো যাচ্ছে না। এখন নিসচা এবং সরকার যৌথভাবে কোনো কর্মসূচিতে কি যাবে?

ইলিয়াস কাঞ্চন : আমরা চেষ্টা করছি। আজও একটা জরুরি মিটিং ছিল। আমরা তো অনবরত বলছি। বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে।

তাপস রায়হান : আপনি জননন্দিত চলচ্চিত্র মুখ। নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর চেয়ারম্যান। বাংলাদেশে চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি। যদি একটি পরিচয়কে বেছে নিতে বলা হয়, কোনটি নেবেন?

ইলিয়াস কাঞ্চন : পারব না। আমাকে মাফ করে দেন। দেশের মানুষের জন্য যা কিছু মঙ্গলজনক, আমি তাই করব।

গ্রন্থনা : অনিন্দিতা আচার্য

ছবি : আবুল কালাম আজাদ

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত