শুক্রবার, ৩১ মে ২০২৪, ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

‘গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হলে আ.লীগ আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না’

আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০২৩, ১১:২৩ এএম

মাহমুদুর রহমান মান্না, একজন রাজনীতিবিদ এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব। নাগরিক ঐক্যের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। আওয়ামী লীগের সাবেক এই সাংগঠনিক সম্পাদকের রাজনীতি শুরু হয়েছিল ছাত্রলীগ দিয়ে। এরপর জাসদ-বাসদ হয়ে আওয়ামী লীগে যোগদান। ১/১১-এ বিতর্কিত ভূমিকার কারণে আওয়ামী লীগ ছাড়তে হয়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসুর) সাবেক সহসভাপতি (ভিপি)। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদর (চাকসু) সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন।

ছাত্রলীগের রাজনীতি করে ছাত্র নেতা হিসেবে যারা মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছিলেন মান্না তাদের একজন। দেশ রূপান্তরের সঙ্গে আলাপকালে উঠে আসা তার রাজনীতির নানা বাকবদলের গল্প থাকছে পাঠকের জন্য। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আব্দুল্লাহ আল তোফায়েল

দেশ রূপান্তর: আপনার রাজনীতিতে যাত্রা শুরু কীভাবে?

মাহমুদুর রহমান মান্না: সত্যি বলতে কোনো প্ল্যান-পরিকল্পনা ছাড়া রাজনীতিতে আমার যাত্রা। এমনকি আমি যখন রাজনীতি শুরু করি তখন রাজনীতি কী সেটাই বুঝতাম না। বলতে পারেন, একটা জায়গা থেকে হাঁটতে শুরু করি, তারপর হাঁটতেই আছি, এই যাত্রা শেষ হয়নি কখনো। আমার মেজ ভাই তখন রাজনীতি করতো, ওর সঙ্গে মিছিল-মিটিং করতাম। তখন আমি স্কুলে পড়ি। একদিন ছাত্র ইউনিয়নের মিছিল চলছে, আমিও ছিলাম। হঠাৎ পাকিস্তানি পুলিশ আমাদের মিছিলে হামলা চালাতে আসে। ছাত্র ইউনিয়নের সবাই মিছিল ছেড়ে দৌঁড়ে পালিয়ে যায়। তখন আমার ছোট মনে একটা ভাবনা আসে, যারা অল্প কয়জন পুলিশ দেখে পালিয়ে যায়, তাদের সাথে রাজনীতি করব না। এভাবেই আমার রাজনীতিতে প্রবেশ।

দেশ রূপান্তর: ছাত্রলীগের রাজনীতি দিয়ে আপনার যাত্রা শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে আপনি হয়ে ওঠেন বড় নেতা। ছাত্রলীগে যোগদানের গল্প শুনতে চাই।

মাহমুদুর রহমান মান্না: ছাত্র ইউনিয়নের মিছিল থেকে পলায়নের পর থেকে বলতে পারেন আমি ছাত্রলীগের রাজনীতি করি। তবে এর পূর্ণ যাত্রা শুরু হয়, আমি যখন ঢাকা কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে পড়াশোনা করি। তখন তো উত্তাল রাজনীতি। পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলন চলছে সারা দেশে। এরপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। আমি ছাত্রলীগ থেকে চাকসু নির্বাচনে অংশ নিই এবং জিএস পদে জয়লাভ করি।

দেশ রূপান্তর: আপনার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা কেমন ছিল? চবিতে তো সাংবাদিকতায়ও যুক্ত ছিলেন?

মাহমুদুর রহমান মান্না: এখানে বলে নেওয়া ভালো, আমরা ছিলাম চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম অনার্স ব্যাচ। তখন চারটা ডিপার্টমেন্টে আমরা অল্প কজন শিক্ষার্থী ছিলাম। হল নেই, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়। জঙ্গলের মধ্যে একটা বিশ্ববিদ্যালয়। যেখানে সাপ থাকতো। কেউ কেউ বাঘ দেখেছেন এমন গল্পও করেন। ক্যাম্পাসে আমি কিন্তু সাংবাদিকতাও করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিক সমিতি প্রতিষ্ঠা করি এবং আমি এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলাম। তখন পূর্বদেশ এবং অবজারভারে কাজ করেছি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার জার্নি ছিল চমৎকার।

দেশ রূপান্তর: অনেকেই বলেন, ১৯৭২ সালে আপনি জাসদ ছাত্রলীগ থেকে নির্বাচন করে জিএস হন, আবার কেউ কেউ বলেন ছাত্রলীগ থেকে জিএস হয়েছিলেন, সত্যতা জানতে চাই?

মাহমুদুর রহমান মান্না: না, তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে দল ভাঙেনি, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ছাত্রলীগ দুই ভাগে বিভক্ত। তারপরও আমরা যৌথভাবে ইলেকশন করি। সেই নির্বাচনে আমাদের বিভক্তির সুযোগ নেয় ছাত্র ইউনিয়ন। নির্বাচনে ছাত্রলীগ থেকে আমি জিএস এবং সম্পাদকীয় পদে ১ জন ও সদস্যপদে দুজনসহ মোট চারজন জয়লাভ করি। বাকি পদে জয়লাভ করে ছাত্র ইউনিয়ন। তবে দ্বিতীয়বার আমি জাসদ ছাত্রলীগ থেকে জয়লাভ করি। তখন সরকারের নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে জাসদ সোচ্চার ছিল, ফলে তরুণদের জাসদ মন জয় করে নেয়।

দেশ রূপান্তর: আপনি পরপর দু’বার ডাকসুর ভিপি হন এটা নিশ্চয় খুব কঠিন ছিল? শিক্ষার্থীরা আপনাকে কেন ভোট দিত?

মাহমুদুর রহমান মান্না: খুব কঠিন ছিল এমনটা বলবো না, কেননা আমি তখন সাধারণ ছাত্রদের কাছে তুমুল জনপ্রিয়। ফলে অনেকেই ধরে নিয়েছিল আমি টানা তৃতীয়বার জয়লাভ করব। কিন্তু আমি পরে আর নির্বাচন করিনি। কেনোনা এটা খারাপ উদাহরণ তৈরি করতে পারত।

শিক্ষার্থীরা আমাকে অনেক পছন্দ করত, এর একটা কারণ হতে পারে আমি খুব ভালো বক্তৃতা দিতে পারতাম। ভালো বক্তব্য তখন অনেকেই দিতেন, কিন্তু আমার বক্তব্যে যেমন উত্তাপ ছিল তেমনি লজিক ছিল। সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকারের দাবিতে আমি কোনো দিন আপোস করিনি। আমার চেহারা ভালো ছিল এবং এখনও যথেষ্ট ভালো বলতে পারেন। ফলে ছাত্রীদের মধ্যে আমার আলাদা একটা জনপ্রিয়তা ছিল। আমি খেলাধুলায় ভালো ছিলাম। লক্ষ্য করবেন, যারা ভালো খেলতে পারে তাদের একটা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন দিন কারও সাথে ঝগড়া করেছি, প্রভাব দেখিয়েছি এমনটা কেউ বলতে পারবে না। সব মিলিয়ে হয়তোবা শিক্ষার্থীরা যেমন প্রতিনিধি চাইতো আমি তেমনি ছিলাম।

দেশ রূপান্তর: দীর্ঘদিন ধরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ। এ নিয়ে কাকে দায়ী করবেন?

মাহমুদুর রহমান মান্না: ছাত্র সংসদ নির্বাচন আওয়ামী লীগ বা বিএনপি কোন দলই দেয়নি। সুতরাং, এখানে এককভাবে কাউকে দায়ী করা যাবে না। আবার আরেকটা বিষয় চিন্তা করে দেখুন, এই দুই দলের বাইরে যারা আছেন তারা কি ছাত্র সংসদের জন্য যে আওয়াজ তোলার প্রয়োজন তা তুলতে পেরেছেন? আওয়ামী লীগ চারবার ক্ষমতায় ছিল, আমার অবাক লাগে যে দলটি মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে, যেখানে ডাকসুর নেতাদের একটা বড় অবদান ছিল সেই তারাই ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেয় না। ডাকসু থেকে যারা জয়লাভ করেছিলেন তারা তো এখনও আওয়ামী লীগে আছেন। তারাও এই নির্বাচন নিয়ে কিছু বলে না। আর এখন তো আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ ক্যাম্পাস থেকে রাজনীতি তুলে দিয়েছে। দেশের কোনো ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি আছে?

দেশ রূপান্তর: ৯০ পর্যন্ত ছাত্র নেতারা গরীব ছিলেন। কিন্ত এরপর থেকে ছাত্র নেতারা বড়লোক হতে শুরু করলেন। এই কালচারটা কীভাবে এল?

মাহমুদুর রহমান মান্না: রাজনৈতিক দল তাদের সহযোগী সংগঠনের মধ্যে একটা আদর্শ ছড়িয়ে দেয়। এরপর তারা সেই আদর্শের প্রচার করে। কিন্ত ৯০-এর পর আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি কি সঠিক রাজনীতি করেছে? তাহলে তাদের সহযোগী ছাত্র সংগঠন কী করবে। আমরা যখন জাসদ করি, তখন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কথা বলি; যা ছিল পুঁজিবাদের বিকল্প। এই যে প্রশ্ন করলেন না টাকা কীভাবে ছাত্র রাজনীতিতে প্রবেশ করলো, একটা গল্প বলি; আমি তখন দ্বিতীয় মেয়াদে ডাকসুর ভিপি। একদিন কয়েকজন ব্যবসায়ী নেতা আমার সাথে সাক্ষাৎ করলেন। তারা নিউ মার্কেটের পর গাউসিয়াতে মার্কেট করবেন। এ বিষয়ে আমার সাহায্য চাইলেন। এরমধ্যে একজন বললেন, আপনি আমাদের সাহায্য করবেন, আর আমরা আপনাকে কয়েকটা দোকান দেব। সত্যি বলতে তখন আমার খুব রাগ হল। আমি ভেবে পাচ্ছিলাম না যে আমি ছাত্র মানুষ দোকান দিয়ে কী করব।

দেশ রূপান্তর: ডাকসুর ভিপি হিসেবে নুরুল হক নুরকে আপনি কীভাবে দেখেন। রাজনীতিতে তার ভবিষ্যৎ কী?

মাহমুদুর রহমান মান্না: এ দুটো বিষয়ে আমি কথা বলতে চাই না।

দেশ রূপান্তর: ছাত্রলীগ-জাসদ-বাসদ-আওয়ামী লীগ-নাগরিক ঐক্য; মান্নাকে কেন এতগুলো দলে যোগদান করতে হল?

মাহমুদুর রহমান মান্না: দেখেন আওয়ামী লীগ ভাঙার গল্প সবাই জানেন। এরপর আমি জাসদে যোগ দিই। কিন্তু একটা সময় পর জাসদ যেই সমাজতন্ত্রের কথা মুখে বলতো বাস্তবে তা তারা করছিল না। এ নিয়ে আমি দলীয় ফোরামে প্রশ্ন তুলি। এই অপরাধে আমাকে বহিষ্কার করা হয়। আমাকে যখন বের করে দেওয়া হয়, তখন আমার ছাত্র রাজনীতি তুঙ্গে। আমার আজও মনে আছে, আমাকে যেদিন জাসদ বহিষ্কার করে পত্রিকায় বিবৃতি দেয়, সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার ছাত্র মিছিল করে। তারা বলে, ‘আমরা ভোট দিয়ে ভিপি বানিয়েছি তারা বহিষ্কার করার কে’। তারা সেদিন এটাও বুঝে নাই যে, জাসদ আর ভিপি আলাদা বিষয়। তারপর আমি ঘোষণা দিই সাতদিন পর আমি আমার সিদ্ধান্ত জানাবো। সেদিন ১০ হাজার ছাত্রদের জমায়েতে বাসদ করার ঘোষণা দিই। সোভিয়েত পতনের পর সমাজতন্ত্র মুখ তুবড়ে পড়ল এবং আমি বিভিন্ন বই পুস্তক পড়ে বুঝতে পারলাম সমাজতন্ত্র যে এতদিন টিকে আছে এটাই মিরাকল। এরপর আমি নতুন ধারার একটা রাজনৈতিক দল গঠনের চিন্তা করি।

দেশ রূপান্তর: আপনি ৯২-এ আওয়ামী লীগে যোগ দেন। সেই গল্প শুনতে চাই।

মাহমুদুর রহমান মান্না: তখন সমাজতন্ত্র ভেঙে গেছে। আমার এখনও মনে পড়ে সে সময় আমি অনেক কেঁদেছি, কিন্তু কী করবো তা ভেবে পাচ্ছিলাম না। এমন সময় সে সময়ের বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে ফোন করলেন। আমি দেখা করলাম। তিনি আমাকে আওয়ামী লীগে যোগদানের আমন্ত্রণ জানান। সেদিন আমি শেখ হাসিনাকে বলেছিলাম, আমি আওয়ামী লীগে যোগদান করব না। তিনি আমাকে বললেন, দলে যোগদান করেন, এখন দায়িত্বে আছি, দল পরিচালনা করছি আপনি ভালো পরামর্শ দিলেও আমি হয়তো সব রাখতে পারবো না, কিন্তু ১০ টি পরামর্শের দুইটাও যদি রাখতে পারি খারাপ কী। এই একটা কথায় আমি আওয়ামী লীগে যোগদান করি।

দেশ রূপান্তর: আওয়ামী লীগ ছাড়তে হল কেন?

মাহমুদুর রহমান মান্না: এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন, আমু-তোফায়েল-রাজ্জাক-সুরঞ্জিতরা যে সংস্কার চেয়েছিলেন আমি কিন্তু সেই সংস্কারের পক্ষে ছিলাম না। কিন্তু সমস্যা হল, আমাকে যখন সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হয়, আমি বলেছিলাম আমি সংস্কারের পক্ষে। উনারা চেয়েছিলেন শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে সংস্কার করতে। এই জায়গায় আমি আপত্তি জানিয়েছিলাম। এখানে বলে নেওয়া প্রয়োজন যে শেখ হাসিনার প্রতি যে আমার বিশেষ আনুগত্য ছিল তা নয়। কিন্তু আমি চেয়েছিলাম, উনাকে রেখেই দলে একটা পরিবর্তন নিয়ে আসা প্রয়োজন। যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে দল একই ধারায় চলছিল। তারপর শেখ হাসিনা বের হলেন, আমাকে ভুল বুঝলেন কিংবা বুঝেশুনেই দল থেকে বাদ দিলেন।

দেশ রূপান্তর: এরপর কী করলেন...?

মাহমুদুর রহমান মান্না: আওয়ামী লীগ ছাড়ার পর তখন আমি টকশো করে বেড়াই টেলিভিশনে। মানুষের কথা বলি, মানুষ আমার কথা শোনে। এরপর আমি নাগরিক আন্দোলন নামে একটা সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তুলি। যার আহ্বায়ক ছিলেন ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম। এর মধ্যে মেয়র নির্বাচন আসে। হাজার হাজার মানুষ আমাকে সমর্থন জানায়। মনে হল আমি জিতে যাব। যদিও সরকার সেই নির্বাচন করতে দেয়নি। মানুষের এই সমর্থন দেখে নাগরিক আন্দোলনকে নাগরিক ঐক্য করে রাজনৈতিক দল করলাম।

দেশ রূপান্তর: আওয়ামী লীগ টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায়। মাহমুদুর রহমান মান্নার আফসোস হয় না, ক্ষমতার অংশীদার হতে না পেরে?

মাহমুদুর রহমান মান্না: আমি খুব সুখী এটা চিন্তা করে যে আমি আওয়ামী লীগ ছেড়ে দিয়েছি। আমার বন্ধু ওবায়দুল কাদেরকে নিয়ে মানুষ খারাপ কথা বলে। অথচ, ওবায়দুল কাদের কিন্তু খুব মেধাবী শিক্ষার্থী ও ছাত্র নেতা। এমনকি জাতীয় রাজনীতিতেও বন্ধু জনপ্রিয় ছিল। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি আর যাই হোক সে দলে কোনো ক্লিকবাজি করে না। কিন্তু আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর ওবায়দুল কাদেরকে নিয়ে মানুষ কত খারাপ ধারণা রাখে। এটা দেখে আমার আফসোস হয়। আবার এটা ভেবে শান্তি পাই আমি দলটিতে নেই, না হলে মানুষ আমাকে নিয়েও এমন কথা বলতো।

দেশ রূপান্তর: আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকতে যে জনপ্রিয়তা পেয়েছিল তা ধরে রাখতে পারেনি কেন?

মাহমুদুর রহমান মান্না: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদে বলেছিলেন, কারা ব্যাংক লুট করেছে তিনি তা জানেন। এই যে জেনেও ব্যবস্থা নিচ্ছেন না এটা একটা কারণ। আবার তার সময়ে এস আলম তৈরি হয়েছে, সামিট তৈরি হয়েছে, বাচ্চু কিংবা বদীর কথা নাই বললাম। কতগুলো ব্যাংক লুট হয়েছে। এত অভিযোগের পরও দরবেশকে উপদেষ্টা হিসেবে রেখেছেন শেখ হাসিনা। যা মানুষের মধ্যে খারাপ ধারণা তৈরি করেছে। পুরো নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস করে দিয়েছে। পুলিশ থেকে শুরু করে সবগুলো বাহিনীর চেইন অব কমান্ড নষ্ট করে দিয়েছে। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে।

দেশ রূপান্তর: মান্না আওয়ামী লীগে থাকলে এখন কী পরামর্শ দিতেন?

মাহমুদুর রহমান মান্না: আমি আওয়ামী লীগে থাকলে বলতাম বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাব মেনে নিতে। এতে আওয়ামী লীগের লস নেই। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে সরকার যে চাপে আছে, তাতে করে যেনতেন উপায়ে একটা নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতায় আসলেও সরকার টিকে থাকতে পারবে না। এখন আওয়ামী লীগ যদি ক্ষমতা ছেড়ে দেয় তাহলে তারা হয়তো ৫ বছর পর আবার ক্ষমতায় আসবে। কিন্তু গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে একবার ক্ষমতাচ্যুত হলে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। তাদের দল হিসেবে, সরকার হিসেবে এতদিনের অর্জন সবকিছু বিসর্জনে যাবে। পরিণতি আরও ভয়াবহ হবে।

দেশ রূপান্তর: আপনাকে আওয়ামী লীগে যোগদান করতে বললে কী করবেন?

মাহমুদুর রহমান মান্না: যদি আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা আমাকে যোগদান করতে বলেন তাহলে আমি আওয়ামী লীগে যোগদান করব। একই সাথে আমি আমার দল এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের বলে যাব হয়তো কাল আমি আবার পদত্যাগ করব। কেননা আওয়ামী লীগ আমার পরামর্শ কিংবা আমাকে দেওয়া কথা কোনোটাই রাখতে পারবে না।

দেশ রূপান্তর: আওয়ামী লীগে যারা আছেন তারা কথা বলতে পারেন না কেন? সঠিক পরামর্শ দিতে পারেন না কেন?

মাহমুদুর রহমান মান্না: কথা বলতে গেলে নৈতিক শক্তি থাকতে হয়। ১৪ ও ১৮-এর ইলেকশনের পর তাদের কথা বলার আর কোনো মুখ নেই। এরপরও আওয়ামী লীগে তোফায়েল আহমেদ, মতিয়া চৌধুরী আছেন। তারা যদি কথা বলতেন কী হত? সর্বোচ্চ পদত্যাগ করতে হত, জেল খাটতে হত। কিন্তু মানুষ মাথায় তুলে রাখত।

দেশ রূপান্তর: আওয়ামী লীগ-বিএনপির বাইরে কেন তৃতীয় শক্তি গড়ে উঠতে পারছে না?

মাহমুদুর রহমান মান্না: আমার মনে হয় এ নিয়ে একটা নির্মোহ গবেষণা হওয়া প্রয়োজন।

দেশ রূপান্তর: বিএনপি দ্রব্যমূল্যের দাম বাড়ার সমাবেশে গিয়ে এক দফার কথা বলে, অর্থাৎ রাজনৈতিক দাবি; এর কারণ কী?

মাহমুদুর রহমান মান্না: এটা ঠিক, এটা বিএনপিকে দুর্বল করে তুলছে। তারা যখন দ্রব্যমূল্যের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদ করে তখন সেই জায়গায় থাকা উচিৎ। পাশাপাশি গত ১৫ বছরে যে সরকার টিকে আছে এর পেছনে বিএনপির দায় আছে। তারা শক্ত আন্দোলন গড়ে তুলতে পারছে না। পাশাপাশি বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে হরতাল না করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সেটাও ভুল ছিল। বড় আন্দোলন ছাড়া এই সরকারের পতন সম্ভব নয়।

দেশ রূপান্তর: দেশের চলমান পরিস্থিতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

মাহমুদুর রহমান মান্না: সরকারের পতন নিশ্চিত। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক যে চাপ, তাতে শেখ হাসিনার ক্ষমতায় থাকবার কোনো যৌক্তিকতা, কোনো পরিস্থিতি, পরিবেশ নেই। তাকে যেতে হবে। এখন আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তিনি কি শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিদায় নেবেন নাকি সংঘাতের মধ্যদিয়ে। সংঘাতের মধ্যদিয়ে গেলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কি হবে তা বলা মুশকিল। বিরোধী দলের ওপর দমনপীড়ন করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে এটা বলাই যায়।

দেশ রূপান্তর:  সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। 

মাহমুদুর রহমান মান্না: দেশ রূপান্তর এবং তার পাঠকদের জন্য শুভকামনা। 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত