কাশ্মীরের সমস্যা শুধু ধর্ম বা সম্প্রদায়ের নয়

প্রথম কাশ্মীর দেখার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। তখন সবে লেখালেখি শুরু করেছি। ছোট একটা কাগজের হয়ে জম্মু হয়ে শ্রীনগর যাত্রা। জম্মু পার হতে না হতেই এক অন্য জগৎ আচমকাই স্বপ্নের মতো সামনে এলো। ধূসর পাহাড়। যাযাবরের দল চলেছে। ক্রমেই চড়াইয়ে উঠছি। নিচে অজস্র অচেনা নদী বয়ে চলেছে। শিশু আর প্রজাপতি হাত ধরাধরি করে যেন পথ চলছে। আকাশ ঘন নীল। বানিহাল পার হচ্ছি। সারি সারি মিলিটারি ট্রাক শব্দ করে সব নীরবতা ভেঙে এগিয়ে যাচ্ছে। বুঝতে অসুবিধে হয় না শ্রীনগর আর দূরে নেই। মাঝেমধ্যে শুধু চেকপোস্ট। বুকের ভেতরে চিনচিনে ভয়। ভূস্বর্গ নয়, এ যেন এক যুদ্ধক্ষেত্রে ঢুকছি।

প্রথম বারের স্মৃতি কাল থেকে খুব মনে পড়ছে। ঝিলমের বয়ে চলা, ডাল লেক, অপূর্ব চিনার গাছের ছায়া। মুঘল আমলে তৈরি অসংখ্য বাগান। লেকের ধারে গরম গরম মাছ ভাজা, চায়ের দোকানে বুড়ির গুরুম গুরুম শব্দে হুঁকো টানা। আর ভারতীয় মিলিটারি জওয়ানদের নিয়মমাফিক রুট মার্চ। আমার বন্ধু মুদাসসরের বাড়িতে ছিলাম সেবার। রাতে ভাইবোন-মা সবার সঙ্গে মেঝেতে চাদর বিছিয়ে খেতে বসতাম। শীত ছিল বলে সবসময় কাঙরি রাখতাম। ওটা ফুলের সাজির মতো ছোট। নিচে কাঠকয়লা থাকত। ফলে শরীর গরম হয়ে যেত। খাবারের মেনুতে মাংস থাকলেও কোনোদিন গরু ছিল না। কাশ্মীরে মুসলমানের মধ্যেও গরু খাবার চল নেই। আমরা খেতাম আর বন্ধুর দিদি একের পর এক শোনাতেন গালিব, রুমি, হাফিজের কবিতা। চলে আসার সময় কিছুতেই বন্ধুর মা, আমার আম্মি কাছে এলেন না। কিন্তু ততক্ষণে আমি টের পেয়েছি বালিশের নিচে অনেক বাদাম, পেস্তা, আখরোট রাখা আছে। কখন ভোররাতে ওই কাশ্মীরি প্রবীণা লুকিয়ে তার বিজাতীয় অন্য ধর্মের এক ছেলের জন্য সব রেখে গেছেন। শেষ মুহূর্তে একঝলক আম্মিকে দেখেছিলাম। দরজার এক কোণে দাঁড়িয়ে চোখের পানি ফেলছেন।

আর কোনোদিনই ওই পরিবারের সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। অনেক দিন পর কয়েক বছর আগে আবার যখন শ্রীনগর গেলাম। বললাম বন্ধুর বাড়িতে যাব। পন্দন নাওহাট্টি। আমার সঙ্গীরা বাধা দিল। সিআরপি জওয়ানেরাও অনুনয় করলÑ স্যার মাত যাইয়ে। ও সব টেরোরিস্ট লোগো কি গড় হায়। মার দেঙ্গে। প্রথম কাশ্মীর দেখা সম্ভবত ১৯৮০ সালে। দ্বিতীয় এই সেদিন। ২০১৪ বোধহয়। এই ৩৪-৩৫ বছরে এভাবেই সব বদলে গেল। সিআরপি জওয়ানের পাশাপাশি স্থানীয় দু-একজন ফিসফিসিয়ে সরকারের লোকদের কান এড়িয়ে আস্তে বললেনÑ আপনার বন্ধু হয় জেলে না হয় খুন হয়েছেন। ও মহল্লা পুরা কবরখানা হয়ে গেছে। লোকজন আরও কত কিছু বলছেন। কানে কিচ্ছু ঢুকছে না। টাইম মেশিন আমাকে নিয়ে গেছে প্রথমবারের কাশ্মীরে। টুকরো টুকরো কত ইমেজ। কত মুহূর্ত। আবেগ। স্মৃতি। কারা যেন অকারণে মিথ্যে বলেÑ স্মৃতি সততই সুখের। কাশ্মীরের বিশেষ আইন বাতিলের জন্য ভারতের সংসদে যখন আমাদের মহামান্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বক্তৃতা দিচ্ছেন, আমি তখন আমার হারিয়ে যাওয়া ‘সন্ত্রাসবাদী’ আম্মিকে খুঁজছি। গালিব রুমি হাফিজ বলে যাচ্ছি আপনমনে। মুদাসসরের ছোট্ট বোন বোলাওকে মনে করছি। আর পাগলের মতো খুঁজছি হারিয়ে যাওয়া একটা সাদামাটা খাতা। যার শেষ পাতায় আর এক বোন, আমার বন্ধু রাবেয়া লিখে দিয়েছিলÑ তুমি যদি মানুষকে শ্রদ্ধা করো, ভালবাসতে পারো, লোকেও তোমাকে ভালোবাসবে, আপন করে নেবে। এই স্পিরিটটাই কাশ্মীরিয়াত।

কাশ্মীরের সমস্যা নিছক ধর্ম বা সম্প্রদায়ের নয়। হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধদের নয়। এ সমস্যার শেকড় আরও অনেক গভীরে। ৩৭০ বা ৩৫-এ ধারার বিলোপ তো নেহাতই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আইনের মারপ্যাঁচ। পরিষ্কার করে একটা কথা বলা দরকার। কাশ্মীর ছিল অসাম্প্রদায়িক। ভারত-পাকিস্তানের স্বার্থ ও অহমিকা আজ কাশ্মীরের জনজীবনে এক ঘোর অন্ধকার ডেকে এনেছে। কাশ্মীরের ইতিহাসের পাতায় পাতায় লেখা আছে সৌভ্রাতৃত্বের অগণন গাথা। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ পরবর্তী সময়, এমনকি জেলবন্দি হওয়ার পরেও শেখ আবদুল্লা ও তার ন্যাশনাল কনফারেন্সের স্লোগান ছিল ‘শের ই কাশ্মীর কা কেয়া ইরসাদ? হিন্দু মুসলিম শিখ ইত্তাহাদ’। শেখ সাহেব ছিলেন সাধারণ জনগণের নয়নমণি। কাশ্মীরের বাঘ। স্লোগানটির সোজা বাংলা হচ্ছে ‘কাশ্মীরের বাঘের নির্দেশ হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ জনতার ঐক্য।’

কাশ্মীর সমস্যার পেছনে ধর্মীয় বিভাজনের পাশাপাশি যে আর্থসামাজিক পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ তা ইদানীং ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। যাবতীয় হিংসার জন্য কাশ্মীরের অধিকাংশ সাধারণ মানুষকে অপরাধের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে। নিশ্চিতভাবেই কয়েক বছর ধরে কাশ্মীরে অশান্তি বহুগুণ বেড়েছে। একের পর এক ঘটনা উপত্যকায় উত্তেজনা ছড়িয়েছে। আমাদের দেশের সংসদে জঙ্গি হামলা, আফজল গুরুর ফাঁসি, পুলওয়ামা, আর্মস ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্টের অতি মাত্রায় সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া, ভারতের অন্যান্য রাজ্যে সাধারণ কাশ্মীরিদের ওপর হামলায়Ñ মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে কাশ্মীরের জনগণের মানসিক দূরত্ব বেড়ে গেছে। পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ যত বেড়েছে ততই পাল্লা দিয়ে শক্তিশালী হয়েছে কিছু সংখ্যক রাজনীতিবিদ ও প্রচার মাধ্যম নির্মিত অজস্র মিথ।

৩৭০ ধারা বিলোপের পরে ভারতের কোনো কোনো এলাকায়, পশ্চিমবঙ্গেও ইতস্তত বিক্ষিপ্ত বিক্ষোভ হয়েছে কাশ্মীরের মানুষের ‘স্বাধিকার’ কেড়ে নেওয়ার প্রতিবাদে। মূলত মানবাধিকারকর্মী, বামপন্থি বিভিন্ন দল ও ধর্মনিরপেক্ষ কয়েকটি গোষ্ঠীর নেতৃত্বে হয়েছে এসব বিক্ষোভ। কিন্তু প্রতিবাদের স্বর ছিল একান্তই মৃদু। ঝাঁজ তীব্র নয়। তার একটা বড় কারণ সমবেত জনতাও কাশ্মীর প্রশ্নে দ্বিধাবিভক্ত ও প্রবল কনফিউজড। নিশ্চিতভাবেই তাদের অনেকেই সমস্যা কী তা সুস্পষ্ট জানে না। প্রতিবাদীদের যদি এই হাল হয় তাহলে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতের সমর্থন কোন দিকে তা বুঝতে গবেষণার দরকার হয় না। আমার ধারণা অন্তত এই মুহূর্তে দেশের দশজনের মধ্যে আটজনই ৩৭০ ধারা বাতিলের পক্ষে। এই ধারণার পেছনে আছে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা প্রচার। যেসব কিছুটা সত্য, অর্ধসত্য বা পুরোপুরি মিথ্যে। যেমন ৩৭০ ধারা নিয়ে বলা হয় যে, এই ধারা একধরনের সুবিধেভোগী সম্প্রদায়ের জন্ম দিয়েছে। যারা পাকিস্তানের সহমর্মী। এক দেশের মধ্যে ভিন্ন আইন থাকবে কেন তা নিয়েও ভারতের বহু মানুষের ক্ষোভ আছে। কাশ্মীরের পণ্ডিতদের প্রতি আমকাশ্মীরের বৈমাতৃসুলভ আচরণের সত্যি মিথ্যে নিয়ে এত চর্চা হয় যা ভারতের মূল ভূখন্ডের অধিকাংশ লোকের কাছে কাশ্মীরের প্রতি বিদ্বেষের জন্ম দিয়েছে। এখন আমাদের দেশের শাসকদের যা মূল চালিকাশক্তি তা বিষয়টিকে ধর্মীয় মেরুকরণের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যা নিঃসন্দেহে এই উপমহাদেশের জন্য এক ভয়ংকর বিপদ। অথচ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলেই স্পষ্ট হয়ে যাবে যে কাশ্মীর সমস্যার গভীরে আছে অর্থনীতি-রাজনীতি।

ভুলে গেলে চলবে না একদিন কাশ্মীরে তে-ভাগার ধাঁচে কৃষক সংগ্রামের জন্ম হয়েছিল। শেখ আবদুল্লার ন্যাশনাল কনফারেন্সের পতাকার রং লাল সবুজ। যা কৃষক মজদুরের প্রতি নিবেদিত। দেশের স্বাধীনতার পর কাশ্মীরেই প্রথম ভূমি সংস্কার করার ডাক দিয়েছিলেন শেখ সাহেব। ৩৭০ ধারা নিমিত্ত মাত্র। এ এক পপুলিস্ট কৌশল যা ভোট ব্যাংককে মজবুত করে। কাশ্মীরের সমস্যা বুঝতে গেলে ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকাতে হবে। জানতে হবে আজকের কাশ্মীরের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং ৩৭০ ধারার জন্মবৃত্তান্ত ও প্রকৃত তাৎপর্য। অনেক প্রশ্ন উঠেছে এই ধারা বিলোপ নিয়ে। সত্যিই একমাত্র কাশ্মীরই কি সুবিধাভোগী! মনে রাখতে হবে, কাশ্মীরে অন্য কোনো প্রদেশের লোক জমি কিনতে পারবেন না, এই আইন চালু করেছিলেন ডোগরা রাজারা। এবং তা অবশ্যই তৎকালীন অধিকাংশ হিন্দু পণ্ডিত, ভূস্বামী জমিদারদের স্বার্থে। উপত্যকায় পণ্ডিত বিরোধিতার পেছনে দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত এই জমি প্রশ্নটাও সামনে আসতে হবে। একই সঙ্গে অন্য অনেক রাজ্যেও একইরকমভাবে একাধিক আইন আছে, যা জমি কেনাবেচা সংক্রান্ত। তা নিয়েও কথা হোক। পাকিস্তান কীভাবে কাশ্মীরে প্রভাব বিস্তার করছে আবেগের পাশাপাশি বিশ্লেষণ প্রয়োজন তা নিয়েও। কিন্তু সবচেয়ে আগে দরকার ৩৭০ ধারার পটভূমি। আমার দেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে হাজার কুর্নিশ নতুন করে কাশ্মীর প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসার জন্য।

লেখক

ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা