ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশা নিধন ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সরকারকে বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ সফররত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের প্রধান কীটতত্ত্ববিদ ডা. ভূপেন্দর নাগপাল। তার পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শের সঙ্গে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের এডিস নিধন ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কর্মকা-ের মধ্যে বেশ ফারাক লক্ষ করা গেছে। বিশেষ করে উড়ন্ত এডিস মশা নিধন (অ্যাডাল্টিসাইড) ও এডিসের লার্ভা ধ্বংসে (লার্ভাসাইড) সিটি করপোরেশনের ব্যবহৃত ওষুধ ও প্রয়োগ পদ্ধতির মধ্যে ব্যাপক অসামঞ্জস্য উঠে এসেছে। এমনকি এডিস মশার প্রজননের জন্য যেসব স্থান এতদিন চিহ্নিত করে এসেছে দুই সিটি করপোরেশন এই আন্তর্জাতিক কীটতত্ত্ববিদ তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন। তিনি এডিস মশার বৈশিষ্ট্য নিয়েও বেশ কিছু নতুন তথ্য দিয়েছেন। এডিস মশার ১৯টি প্রজনন স্থান চিহ্নিত করেছেন। তার মতে, নির্মাণাধীন স্থাপনা ও ভবনের প্রজননস্থল ধ্বংস করে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব কমানো সম্ভব।
এতদিন ধারণা করা হতো এডিস মশা বাসাবাড়ি ও আশপাশে জমে থাকা পানিতে বেশি থাকে। কিন্তু ভি নাগপাল জানান, এডিস মশা সবচেয়ে বেশি থাকে সরকারি পরিবহন পুলে। এসব জায়গায় সারিবদ্ধ গাড়ি, টায়ার ও পরিত্যক্ত টিউব যন্ত্রপাতিতে এডিসের বেশি লার্ভা পাওয়া গেছে। এর পরপরই এডিস থাকে হাসপাতালের নিচে খোলা জায়গায়, ছাদে, পরিত্যক্ত যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্রে। এরপর বেশি থাকে পুলিশের পরিবহন পুলে ও জব্দ করার পর পুলিশ যেখানে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন স্তূপ করে রাখে। এছাড়া বিমানবন্দরের চৌবাচ্চা ও রানওয়ের আশপাশে, পার্ক, নার্সারি, ফোয়ারা, সিভিল ডিপার্টমেন্টের নির্মাণাধীন ভবনে। সরকারি অফিসগুলোতে এডিসের বিস্তার বেশি। এছাড়া বাসাবাড়ির গ্যারেজে, বাড়ির মূল ফটকের লোহার গেটের ফাঁকে, পরিত্যক্ত কমোডে, বিদ্যুতের তার আটকানোর সরঞ্জামাদিতে মশা ডিম পাড়ে। এডিস মশা নির্মূল করার পরামর্শ দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, বাড়ির ভেতর দরজা-জানালা বন্ধ করে মশার ওষুধ স্প্রে করতে হবে। খাট, চেয়ার-টেবিল ও বিছানার নিচে ওষুধ ছিটাতে হবে। যেখানে বেশি মানুষ থাকে, সেখানে এডিস মশা বেশি থাকে, সেখানে বেশি কামড়ায়। ড্রেনের মধ্যে ওষুধ ছিটালে মশা মরবে না। ওখানে এডিস মশা থাকে না।
ফগিং নিয়েও তাদের মত সিটি করপোরেশনের সঙ্গে মেলে না। ঘরের বাইরে দিনের বেলা ফগিং খুব বেশি কাজে আসে না বলেই তাদের মত। সন্ধ্যা ও সকালের নির্দিষ্ট সময়ে ফগিং করতে হবে বলে তারা মত দিয়েছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিদল মশার উৎপত্তিস্থল সার্বিকভাবে চিহ্নিত করে তা ধ্বংসের ওপর জোর দিয়েছে। তারা ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়রের সঙ্গে বৈঠক করার পরে এই আহ্বান জানিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই আহ্বানকে বাস্তবে রূপদান করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর। রাস্তাঘাট ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করার মতো কর্মসূচি পালন না করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ মোতাবেক আমাদের ভুলগুলো দ্রুত সংশোধন করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই হবে সংগত।
ডা. ভূপেন্দর নাগপালের পর্যবেক্ষণগুলোর সঙ্গে আমাদের অনেক ফারাক আছে। কিন্তু, এ পর্যবেক্ষণগুলো ধারণ করে আমাদের কর্মপদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা সম্ভব। এডিস মশার বিস্তার রোধে সম্ভব সব কিছুই করতে হবে। ভুল থাকলে সেগুলো সংশোধন করে এগিয়ে যেতে হবে। আমরা আশা করব, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পর্যবেক্ষণ আমলে নিয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে একটি কার্যকর পদ্ধতি বের করা হবে।