স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আমরা কেন সবচেয়ে পিছিয়ে

সুস্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। ছোটবেলায় পাঠ্যসূচিতে উপদেশমূলক এই বাক্য পড়েননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া সত্যিই কঠিন। স্বাস্থ্য ভালো থাকলে মানুষ আনন্দচিত্তে তার নিত্যদিনের সব কাজ করতে পারেন। কেননা শরীরের সঙ্গে মনের সম্পর্ক ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ফলে স্বাস্থ্য ভালো থাকা মানে মন ভালো থাকা। স্বাস্থ্য নিয়ে এসব বলার পেছনে কারণটা অবশ্য সহজেই অনুমেয়। কারণ গত দুই মাস ধরে মানুষ ডেঙ্গু রোগ নিয়ে চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ইতোমধ্যে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে বেশ কয়েকজনের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এতে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার চিত্রটাও ফুটে উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিষয়ে। কারণ ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে একজন জেলা সিভিল সার্জনসহ কয়েকজন ডাক্তার ও নার্সের মৃত্যুও হয়েছে। চিকিৎস করা যখন নিরাপদ নন, তখন সাধারণ মানুষের জন্য বিষয়টি সত্যিই ভাবনার।

 

ভাবনার কারণটা অন্য জায়গায়ও। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। বেড়েছে মানুষের গড় আয়ু এবং মাথাপিছু আয়ও। উন্নয়নমূলক বিভিন্ন খাতে ব্যয় বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতি বছর বাড়ছে বাজেটের আকারও। এত কিছুর বাড়ার পরও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারি ব্যয় তেমন বাড়ছে না। এ বিষয়ে একটু পরিসংখ্যানের দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক। স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের মাথাপিছু ব্যয় মাত্র ৩২ ডলার। এই ব্যয় শুধু দক্ষিণ এশিয়াই নয়, উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যেও সবচেয়ে কম। এমন তথ্য আমাদের জন্য সত্যিই অস্বস্তির। বাস্তবতা হলো আমরা এখনো নানা কারণে স্বাস্থ্যসেবায় আমাদের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারিনি। কারণ যখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলো তাদের চিকিৎসাসেবায় ব্যয় বাড়াচ্ছে, সেখানে আমাদের ব্যয় কমছে। এর ফলে আমাদের সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের বেশিরভাগই নিজেদের বহন করতে হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র থেকে শুরু করে ওষুধের খরচ পর্যন্ত। ফলে অন্যান্য খাতে ব্যয়ের সঙ্গে স্বাস্থ্য সুরক্ষার খরচ জোগাতে সাধারণ মানুষকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। এর প্রভাবে দরিদ্র মানুষ আরও দরিদ্র হয়ে পড়ছে। মূলত স্বাস্থ্য সুরক্ষা খাতে সরকারের এই উদাসীনতা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা সুরক্ষার বিষয়টির সঙ্গে চিকিৎসকদের ভূমিকা বিশেষভাবে জড়িত। কিন্তু তারা কতটা রোগীবান্ধব তা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ থেকেই যায়। সময় নিয়ে রোগী না দেখা, অকারণে গুচ্ছের পরীক্ষা করানো এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে একগাদা ওষুধ দেওয়া নিয়ে নিয়ত সমালোচিত হলেও তারা ভ্রƒক্ষেপহীন। পাশাপাশি রোগ নির্ণয়ে তাদের ব্যর্থতা, ভুল চিকিৎসা দিনকে দিন দেশের চিকিৎসকদের প্রতি মানুষকে বীতশ্রদ্ধ করে তুলছে। ফলে মানুষ বাধ্য হচ্ছে পরনির্ভরতায়। ছুটছে ভিন দেশে। অথচ এর ফলে আমরা কেবল আমাদের চিকিৎসক, চিকিৎসাব্যবস্থা এবং দেশের ভাবমূর্তিকে অনুজ্জ্বল আর কলঙ্কিত করছি না, বরং প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণ মুদ্রা হারাচ্ছি। যা চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। নিজ দেশ রেখে ভিন দেশে চিকিৎসা করানোর বিষয়টি স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতাকেই চিহ্নিত করে। এ কারণে অপ্রতুল স্বাস্থ্যসেবার প্রশ্নটি সামনে চলে আসছে বারবার।

 

গত ৭ এপ্রিল সারা বিশ্বে পালিত হয়েছে ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস’। বাংলাদেশও নানা আয়োজনে দিবসটি পালন করেছে। মূলত বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি করা। এখন প্রশ্ন আমরা কতটা স্বাস্থ্য সচেতন। উচ্চশিক্ষিত কিছু মানুষ হয়তো স্বাস্থ্য সচেতন। কিন্তু আমরা অধিকাংশই স্বাস্থ্য সচেতন নই। প্রধান কারণ মূলত অশিক্ষা ও দারিদ্র্য। এ দুটো মৌলিক এবং অবশ্যই বাস্তবিক কারণ আমাদের সিংহভাগ জনসংখ্যার স্বাস্থ্য সচেতনার অন্তরায় হয়েছে। কোন বয়সের পর কোন চিকিৎসাটা জরুরি তা আমরা অনেক সচেতন মানুষও হয়তো সেভাবে জানি না। এটা একাধারে আমাদের অজ্ঞতা এবং অবহেলাও। আমরা যেন জানিই না সুচিকিৎসা পাওয়া প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার; আমাদের সংবিধানে এই অধিকার  নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। তবে এটাও সত্য যে, বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য খাতে অনেক সাফল্য দেখিয়েছে। বিশেষ করে সংক্রামক রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সফলতা প্রভূত। এমন একটা সময় ছিল যখন হাম, বসন্ত, কলেরা, প্লেগে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়েছে। সেই কঠিন সময় আমরা অনেক আগেই পার করে এসেছি। হাম, বসন্ত, কলেরা ও প্লেগ এখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে। এমনকি পোলিও নির্মূল হয়েছে অনেক আগেই। ডায়রিয়ার ক্ষেত্রেও আমাদের সাফল্য বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। বলার অপেক্ষা রাখে না, ওরস্যালাইন এক যুগান্তকারী উদ্ভাবন আর এর কৃতিত্ব বাংলাদেশের। উন্নত কোনো দেশে হলে নিশ্চিত নোবেল মিলত। অথচ আমরা ভেবেও দেখি না, অত্যন্ত সরল এক সমাধান সারা বিশ্বের প্রতিনিয়ত অযুত-নিযুত মানুষের জীবন বাঁচাচ্ছে। এ যেন এক জাদুকরী নিদান। এছাড়া সফলতা এসেছে মা ও শিশুর মৃত্যুর ক্ষেত্রেও। আগের তুলনায় মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার অনেকাংশে কমে এসেছে।

 

আবার বিপরীত চিত্রও রয়েছে। বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে অসংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিনকে দিন বেড়ে চলেছে; যা রীতিমতো আশঙ্কার, আতঙ্কের। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, পক্ষঘাতগ্রস্থতা, কিডনি রোগ, অটিজম ও মানসিক রোগীর সংখ্যা মাত্রাতিরিক্ত। এসব অসংক্রামক জটিল রোগের ক্ষেত্রে প্রয়োজন রোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা। আর যেসব রোগ প্রতিরোধযোগ্য সেসব রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে সমন্বিত চিকিৎসা প্রদানের মাধ্যমে সুস্থ করে তোলা; এজন্য প্রয়োজন সমন্বিত চিকিৎসাব্যবস্থা।

 

দেশে এখন সবার আতঙ্কের নাম ডেঙ্গু। বিশেষ করে গত কয়েক বছর ধরেই এই রোগের সঙ্গে আমরা পরিচিত। তবে এবার এর ব্যাপকতা ও মৃত্যুর সংখ্যা আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে। অথচ ডেঙ্গু রোগের কারণ যে মশা সেই মশা নিধনে পুরোপুরি ব্যর্থ সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য বিভাগ। এটা আমাদের চরম ব্যর্থতা। এই ব্যর্থতার দায় কোনোভাবেই স্বাস্থ্য বিভাগ এড়াতে পারে না। মশা মারার ক্ষেত্রে নাগরিক হিসেবে আমাদের যেমন দায়িত্ব রয়েছে তেমনি সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়েরও রয়েছে কিছু বাড়তি দায়িত্ব। সরকার বিভিন্ন সময় মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। সেসব সেবা মানুষের নাগালে পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার উন্নতির ও তা নিশ্চিত করার জন্য গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের উদ্যোগ মন্ত্রণালয়কেই নিতে হবে।

 

একটা দেশের উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত নানা অনুষঙ্গ। এখানে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা খাত। যদিও আমরা ভেবে দেখি না যে এটা আজ বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাতও। এ খাতের বার্ষিক টার্নওভার মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো। এখানে কেবল দক্ষ এবং সুচিকিৎসকই নয়, প্রয়োজন বিভিন্ন পেশাদারকর্মী যাদের থাকবে আধুনিক শিক্ষা আর কাজের মাধ্যমে অর্জিত দক্ষতা। পাশাপাশি প্রয়োজন নিয়মিত গবেষণা। আরও একটা পূর্বশর্ত থেকেই যায়, ওষুধের দাম ও মান নিয়ন্ত্রণ। প্রতিটি শর্ত সঠিকভাবে পূরণ করতে পারলে, কোনো সন্দেহ নেই চিকিৎসা খাতে সাফল্য অর্জন নিশ্চিত করা যাবে। সেরা প্রতিষ্ঠান, সেরা গবেষণা, সেরা চিকিৎসক এবং এমনকি চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রথা প্রচলনের মাধ্যমে উৎসাহিত করতে পারলে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব হবে না। নাগরিকদের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে সরকারি-বেসরকারি উভয় খাতের মধ্যে আরও সমন্বয় প্রয়োজন।  প্রয়োজন সকলে মিলে স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজলভ্য করা, মানুষের আস্থার জায়গায় ফিরিয়ে আনা।

 

লেখক : সাংবাদিক