বারান্দা-মেঝে সিঁড়িতে ভরে গেছে ডেঙ্গু রোগী

ডেঙ্গু রোগী নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। বারান্দা ও মেঝে ছাড়িয়ে এখন করিডোর এমনকি সিঁড়ির নিচেও ঠাঁই পেতে হিমশিম খেতে হচ্ছে ডেঙ্গু রোগীদের। হাসপাতালটির সর্বত্রই যেন এখন শুধু ডেঙ্গু রোগী। ধারণক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ায় নির্ধারিত শয্যার পরিবর্তে রোগীদের জন্য ফোমের বিছানার বিকল্প ব্যবস্থা করেও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছে না হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। সবচেয়ে বেশি দুরবস্থা শিশু ওয়ার্ডে। মাত্র ৬০ শয্যার এই ওয়ার্ডে ভর্তি রয়েছে ২৫৬ জন। এর মধ্যে ১৬০ জনই ডেঙ্গু আক্রান্ত।

হাসপাতালের আন্তঃবিভাগের তিনতলার শিশু ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, বারান্দাজুড়েই সারি সারি বিছানা পাতা। এর প্রত্যেকটিতেই রয়েছে আক্রান্ত শিশু। ওয়ার্ডে ঢোকার পথটি একপ্রকার রুদ্ধ হয়ে ছিল রোগী ও তার স্বজনদের ভিড়ে। সেখানে এক পাশে ডেঙ্গু আক্রান্ত চার বছরের শিশু সোহানাকে নিয়ে মেঝেতে একটি মাদুর বিছিয়ে শুয়ে ছিলেন মা। অতিরিক্ত মানুষের ভিড়ে হাসপাতাল ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য ছটফট করছিল সোহানা। কিন্তু হাতে স্যালাইন লাগানো থাকায় তা সম্ভব না। এজন্য কান্না জুড়ে দেয় ছোট্ট এই শিশুটি।

সোহানার মা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সোমবার সকালে ঢাকা শিশু হাসপাতালে পরীক্ষার পর ডেঙ্গু ধরা পড়লেও বেড না থাকায় সেখানে সোহানাকে ভর্তি করানো যায়নি। এই হাসপাতালে আসার পর ডাক্তাররা ভর্তি নিয়েছে, কিন্তু বেড দেয়নি। বলছে, শুক্রবার হয়তো বেড দেওয়া যাবে। অন্য হাসপাতালেও খোঁজ নিয়ে দেখেছি, সেখানে সিট খালি নাই।’

ওয়ার্ডের ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায়, একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে ছোট জটলা। জানা গেল, জটলার কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিটি ইন্টার্ন চিকিৎসক ফাহিম ইসলাম লিটন। বাকিরা সবাই ভর্তি রোগীদের স্বজন।

চিকিৎসক ফাহিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই ওয়ার্ডে ২৫৬ জন শিশু ভর্তি রয়েছে। যা ধারণ ক্ষমতার চার গুণেরও বেশি। অথচ তাদের সেবা দেওয়ার জন্য নেই পর্যাপ্ত ডাক্তার ও নার্স। এছাড়া বেড না থাকার কারণে তাদের মেঝেতে রাখা হয়েছে। তারপরও সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছি রোগীদের সুস্থ করতে। এজন্য প্রতিদিন সকাল ৭টায় হাসপাতালে এসে রাত ৮টার পর বাসায় ফিরতে হচ্ছে। জুনিয়র-সিনিয়র সব ডাক্তারের একই অবস্থা।’

এমন করুণ পরিস্থিতি শুধু শিশু ওয়ার্ডেই নয়, প্রতিটি বিভাগেই চলছে তীব্র শয্যা সংকট। এর সঙ্গে প্রতিদিনই যোগ হচ্ছে নতুন নতুন ডেঙ্গু রোগী। ফলে হাসপাতালের প্রশাসনিক বিভাগের প্রবেশমুখ থেকেই রোগীদের রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এদের বেশিরভাগই থাকছেন মেঝেতে। আবার অনেককে বারান্দায় শয্যা পেতে রাখা হয়েছে। তার ওপর রয়েছে নোংরা পরিবেশ। এর মধ্যেই চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ইতিমধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন কয়েকজন চিকিৎসক ও নার্স।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ওই হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ছিল ৪১৭ জন। আর মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে বুধবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে ৯৭ জন। অথচ বর্তমানে এই হাসপাতালে মোট শয্যার সংখ্যা ৮৭৫টি। ফলে ডেঙ্গু রোগীদের সামাল দিতে গিয়ে অন্য রোগীদের পর্যাপ্ত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক উত্তম কুমার বড়–য়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অন্য হাসপাতালগুলোতে শিশুদের স্থান না হওয়ায় এই হাসপাতালে শিশুদের চাপ বেশি। কিন্তু শয্যাসংখ্যা মাত্র ৬০টি। তবুও কাউকে ফেরত না দিয়ে হাসপাতালের মেঝেতে রাখছি। আগামী শুক্রবার থেকে প্রতিটি ১০০ শয্যাবিশিষ্ট দুটি নতুন ওয়ার্ড চালু হবে। তখন শিশুদের ওয়ার্ডের বর্তমান অবস্থার অনেকটাই পরিবর্তন হবে। এছাড়া অন্য রোগীদেরও সেখানে স্থান দেওয়া সম্ভব হবে।’