মহাসড়কে অতিরিক্ত পরিবহন ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে ঈদযাত্রায় দূরপাল্লার পরিবহনে ব্যাপক শিডিউল বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ঈদের আগে শেষ কর্মদিবস শেষে বাড়ি ফেরা মানুষের ঢল নামে রাজধানীর বাস টার্মিনালগুলোতে। এদিন সকাল থেকে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলগামী কোনো বাসই সময়মতো ছেড়ে যেতে পারেনি। নির্ধারিত সময়ের চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা পর ছেড়ে গেছে গাড়ি। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েন ঘরমুখো মানুষ। পাশাপাশি দিনভর বৃষ্টিতে মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়ে।
রাজধানীর টার্মিনালগুলো ঘুরে দেখা গেছে, বৃষ্টির মধ্যে কাউন্টারে ভিড় করছেন যাত্রীরা। অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে কাউন্টারে জায়গা না পেয়ে অনেককে বৃষ্টিতে ভিজে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। পরিবহন-সংশ্লিষ্টদের
সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের বেশির ভাগ মহাসড়কে যানজটের কারণে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না বাস। স্বাভাবিক সময়ে যে গন্তব্যে পৌঁছাতে ৮ ঘণ্টা লাগে তা এখন বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এতে নির্ধারিত সময়ে গাড়ি আসতে পারছে না।
গাবতলী টার্মিনালের কয়েকজন চালক ও চালকের সহকারী জানিয়েছেন, উত্তরাঞ্চলগামী সড়কের অবস্থা সবচেয়ে বেহাল। ঢাকা থেকে এ সড়কে উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলাসহ মোট ২৩ জেলার গাড়ি চলাচল করে। সংস্কারাধীন এ সড়কে ঈদে ঢাকার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ যাত্রী পরিবহন করা হয়। কিন্তু সড়কটির বেশির ভাগ অংশ দুই লেনের হওয়ায় অতিরিক্ত গাড়ির চাপে কয়েকটি স্থানে বড় ধরনের যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এর মধ্যে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত ১৪ কিলোমিটার সড়কের অবস্থা সবচেয়ে বেশি শোচনীয়। গত বুধবার যমুনা সেতুর সামনে একটি দুর্ঘটনার কারণে পুরো রাস্তায় ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়। গতকাল ভোর পর্যন্ত যানজট ছিল অসহনীয় মাত্রায়। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যানজট কিছুটা কমে আসে। বিকেলের পর যাত্রীর চাপ বৃদ্ধি ও বৃষ্টির কারণে আবার যানজট দেখা দেয়। যমুনা সেতুতে পুরনো পদ্ধতির টোল সংগ্রহের কারণেও টাঙ্গাইলের এ অংশে যানজট সৃষ্টি হয় বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
হানিফ পরিবহনের গাবতলী কাউন্টার ম্যানেজার জামাল আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জ্যামের কারণে সময়মতো গাড়ি ঢাকায় এসে পৌঁছাতে পারছে না। ঢাকায় ঢোকার মুখে গরুবাহী গাড়ির চাপেও যানজট লেগে আছে। এতে কোনো গাড়ির টাইম রাখা সম্ভব হচ্ছে না। রাতের দিকে এ সংকট আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা হচ্ছে।’
পরিবহন-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদে যাত্রীর চাপ বেশি থাকায় ঢাকার ভেতরে চলাচলকারী প্রায় সাড়ে তিন হাজার বাস উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় যাত্রীসেবা দিয়ে থাকে। এসব বাস দূরপাল্লায় যাত্রীসেবার নামে মহাসড়কে অরাজকতা সৃষ্টি করে। চালকরা বলছেন, ফিটনেসহীন এসব বাসের চালক সড়কে ট্রাফিক আইন মেনে গাড়ি চালান না। এতে সড়কে ব্যাপক ভোগান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। এ ছাড়া কোরবানি উপলক্ষে রাজধানীর দিকে গরু পরিবহন করছে অসংখ্য ট্রাক। এসব ট্রাক রাস্তায় দাঁড়িয়ে গরু ওঠানামা করে। এতে দূরপাল্লার গাড়ির গতি স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
ঢাকা থেকে পঞ্চগড়গামী হানিফ পরিবহনের একটি বাসের চালক শুক্কুর আলী দেশ রূপান্তরকে জানান, বুধবার রাত ৮টায় পঞ্চগড় থেকে গাড়ি ছেড়ে তিনি ঢাকায় পৌঁছান বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায়। তার তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের এলেঙ্গা ছাড়াও সিরাজগঞ্জ মোড় থেকে ঘুরকা-বেলতলা এলাকা পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার সড়ক ভাঙা হওয়ার কারণে গাড়ি থেমে থেমে চলছে। বৃষ্টিতে সড়কে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এ সড়কের বগুড়ার শাজাহানপুর থেকে মহাস্থানগড় পর্যন্ত যানজট দেখা দিয়েছে। সড়ক ভাঙাচোরা হওয়ায় ইট বিছিয়ে সাময়িকভাবে চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে। তবে বৃষ্টির কারণে এর সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বগুড়ায় যানজটের কারণ যতটা না সড়ক তার চেয়ে বেশি চাঁদাবাজি। বগুড়া শহরে যানজট এড়াতে দুটি বাইপাস সড়ক রয়েছে। মাটিডালি মোড় থেকে শহরের পূর্ব অংশের বাইপাস সড়কে গাড়ি চলে খুব কম। সব গাড়ি পশ্চিম দিকের বাইপাস দিয়ে চলে। কারণ হিসেবে চালকরা বলছেন, পশ্চিম দিকের সড়কে বাস ও ট্রাক স্ট্যান্ড পড়েছে। চাঁদাবাজির সুবিধার্থে পূর্ব দিকের বাইপাস দিয়ে গাড়ি চলতে দেয় না প্রভাবশালীরা। ঈদ এলে গাড়ি ও ট্রাককে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজির মাত্রা বৃদ্ধি পায়। শ্যামলী পরিবহনের চালকের সহকারী আবদুর রশীদ বলেন, প্রশাসন চাইলে রাস্তা ক্লিয়ার করতে পারে। কিন্তু তারাও রাস্তায় ট্রাক ও গাড়ির চান্দা তোলে। জ্যাম লাগাইয়া বইসা বইসা তামশা দেখে। ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কের সিরাজগঞ্জ অংশের দবিরগঞ্জ থেকে খালকুলা পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার সড়কেও ভাঙাচোরার কারণে গাড়ি চলাচলে বেগ পেতে হচ্ছে চালকদের।
এদিকে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ও রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে দুপুর পর্যন্ত প্রায় ৫ কিলোমিটার অংশ যানজটের খবর পাওয়া যায়। বৃষ্টির কারণে এ ঘাটে চলাচলকারী ৩৪টি লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। চাপ সৃষ্টি হয় ফেরির ওপর। ১৭টি ফেরিতে মানুষ, বাস ও ট্রাক পারাপার করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয় যাত্রীদের। অন্যদিকে ২০ ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর দুপুরে শিমুলিয়া ও কাঁঠালবাড়ী নৌরুটে ফেরি চলাচল শুরু হয়।