কোরবানির ঈদ সামনে রেখে মসলার বাজারে দাম লাগামহীন। বন্দরনগরীতে এক সপ্তাহেই আদা ও রসুনের দাম বেড়েছে কেজিতে ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। গতকাল বৃহস্পতিবার দেশের বৃহত্তম পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জ ঘুরে দেখা গেছে, দাম নিয়ে অসন্তুষ্ট খুচরা বিক্রেতা ও ভোক্তারা। তাদের অভিযোগ, আদা ও রসুনের দাম ইচ্ছে করেই বাড়িয়েছে পাইকাররা। যদিও পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বুকিং রেট, কর আরোপ, চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ ঘাটতির কারণে এই অবস্থা। ঈদের আগে থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত কয়েক দফায় বাড়ল বিভিন্ন মসলার দাম।
খাতুনগঞ্জ বাজারে আমদানি করা প্রতি কেজি চীনা আদা ১৪০-১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগে একই মানের আদা বিক্রি হয়েছিল ১১৫-১২৫ টাকায়। সে হিসাবে পাইকারি পর্যায়ে সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি চীনা আদার দাম ৩৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। অন্যদিকে আমদানি করা চীনা রসুনের কেজি ৩০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে পাইকারিতে ১৫০-১৬০। গত সপ্তাহের শুরুর দিকে প্রতি কেজি চীনা রসুন বিক্রি হয়েছে ১২০-১৩০
টাকায়।
জানতে চাইলে আমদানিকারক খোরশেদ আলম বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে মাস দুয়েক আগে চীনের আদা ও রসুনের বুকিং রেট বেড়েছে। এর আগে দেশীয় বাজারে আদা ও রসুনের রেট কম থাকায় ব্যবসায়ীরা আমদানি কম করেছিলেন। ফলে এখন জোগান কম কিন্তু চাহিদা বেশি। এই সুযোগে যাদের কাছে স্টকে ছিল তারা বাড়তি দামে বিক্রি করছে।’ এর সঙ্গে বাজেটে পেঁয়াজ, আদা ও রসুন আমদানিতে ৫ শতাংশ অগ্রিম কর সংযোজন হয়েছে বলে জানান তিনি। খাতুনগঞ্জে রসুনের ব্যবসায়ী মো. ইয়াছিন বলেন, ‘কোরবানি সামনের রেখে চাহিদানুযায়ী পণ্য ছাড়ছে না আমদানিকারকরা। বাড়তি দামেই রসুন-আদা কিনতে হচ্ছে। তাছাড়া দেশীয় আদা-রসুনের কদর কম থাকায় চীনা আদা-রসুনের চাহিদা বেশি।
এদিকে চলতি সপ্তাহে পেঁয়াজও বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে। গত সপ্তাহে মানভেদে কেজিপ্রতি ২৪-২৮ টাকা বিক্রি হলেও এখন পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে ৩০-৩৮ টাকায়। সপ্তাহের ব্যবধানে ৮-১০ টাকার বেড়েছে পণ্যটির। পাইকাররা বাজারে দেশি আদা-রসুনের চাহিদা কম বললেও সাধারণ ভোক্তাদের থেকে জানা গেল ভিন্ন কথা। অতিরিক্ত লাভের জন্যই ব্যবসায়ীরা চীনা আদা-রসুন বিক্রি করে অভিযোগ ক্রেতাদের। আড়তগুলো ঘুরে দেখা যায়, হাতেগোনা কয়েকটি আড়তে শুধু দেশীয় আদা-রসুন আছে। এসব দোকানে গতকাল প্রতি কেজি দেশি আদা ১০০ এবং রসুন ১০০-১১০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে।
খাতুনগঞ্জের খুচরা বিক্রেতা আমির স্টোরের ম্যানেজার জাহেদ হোসেন জানান, দেশীয় আদা-রসুন তো পাওয়া যায় না। তাই চীনা আদা-রসুনের চাহিদা বেশি থাকে। মূলত এটা নির্ভর করে পাইকারদের ওপর। আছাদগঞ্জের বাসিন্দা আবদুর রহমান বলেন, কোরবানি উপলক্ষে দুই দফা বেড়ে মসলাজাতীয় পণ্য এখন নাগালের বাইরে। এই সপ্তাহে দাম কেজিতে ২০-৩০ টাকা বেশি। বিভিন্ন উৎসব ঘিরে দাম বাড়ানো খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের নিয়মে পরিণত হয়েছে। বলুয়ারদীঘি পাড়ের বাসিন্দা গৃহিণী মর্তুজা আক্তার বলেন, দেশি আদা-রসুন কিনতে চাইলেও পাওয়া যায় না। বেশিরভাগ দোকানে সরবরাহ নেই বলছে। আদা-রসুনের গলাকাটা দাম নিচ্ছে। বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে আমরা জিম্মি।
পাইকারি বাজারের প্রভাবে খুচরা বাজারেও মসলা জাতীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। খুচরা পর্যায়ে যে জিরা কিছুদিন আগে ৩৮০ টাকায় পাওয়া যেত, সেটা এখন ৪৫০ টাকা। ৩৫০ থেকে ৩৭০ টাকার দারুচিনি এখন ৪০০ থেকে ৪২০। এলাচ কিনতে প্রতি কেজিতে গুনতে হচ্ছে প্রায় ২২০০ টাকা। খুচরাভাবে জিরা বিক্রি হচ্ছে প্রতি ১০০ গ্রাম ৪৫ থেকে ৫৫ টাকা। প্রতি ১০০ গ্রাম এলাচ ২৩০ এবং ১০০ গ্রাম দারুচিনির দাম ৪৫ থেকে ৫০ টাকা।
বক্সিরহাট বাজারের খুচরা বিক্রেতা আশীষ সেন বলেন, কিছুদিন আগেও খাতুনগঞ্জ থেকে জিরা কিনেছি কেজিপ্রতি ৩১০-৩৩০ টাকা দরে, এরপর ৩৫০ টাকা হলো। এখন কিনতে হচ্ছে ৩৮০ টাকা কেজি দরে। এলাচির দামও বেড়েছে কেজিতে ১৫০-২০০ টাকা। ভালো মানের লবঙ্গ ১০০ টাকা বাড়তিতে বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার টাকায়। খাতুনগঞ্জের খাজা ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী পাইকারি ব্যবসায়ী আবদুল মান্নান বলেন, মসলাজাতীয় এসব পণ্য যেহেতু পরিমাণে কম বিক্রি হয় তাই খুচরা বিক্রেতারা বাড়তি দাম নিয়ে লাভ করে।