৩০ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে নিষেধাজ্ঞা ইউজিসির

দেশের ৩০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। ইউজিসি থেকে জানানো হয়েছে, এই সব বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে কোনোটি সরকার বন্ধ ঘোষণা করেছে, কোনোটির বিরুদ্ধে সনদ বাণিজ্য, কোনোটার বিরুদ্ধে মালিকানা দ্বন্দ্ব, কোনোটার বিরুদ্ধে অবৈধভাবে আউটার ক্যাম্পাস পরিচালনা আবার কোনোটার বিরুদ্ধে অনুমোদন না নিয়েই বিভিন্ন বিষয় খুলে শিক্ষার্থী ভর্তি করিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ইউজিসি থেকে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানানো হয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির কর্মকর্তারা জানান, কোনো বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পাওয়ার পরে শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর জন্য অনুমতি নিতে হয়। উল্লিখিত প্রতিষ্ঠানগুলো সেই অনুমতি এখনো পায়নি।

 এগুলোর কেউ কেউ অনুমোদন না নিয়েও শিক্ষার্থী ভর্তি করাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ভর্তিতে নিষেধাজ্ঞা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে একটি হলো ইবাইস। এটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের (বিওটি) বা মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে। আদালতে অনেক আইনি লড়াই করেও বিশ্ববিদ্যালয়টির কোনো পক্ষ সফল হয়নি। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টি ঠিকানাবিহীন বলে জানা গেছে। বিওটি নিয়ে দ্বন্দ্ব ও আদালতে মামলা বিচারাধীন আছে আরও চারটির। এগুলো হলো সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ব্রিটানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ও সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

নানা অভিযোগে ২০০৬ সালে সরকার ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়। এ-সংক্রান্ত আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে মামলার পর প্রাপ্ত রায়ের আলোকে চলছে আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি ও দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা। এর মধ্যে প্রথমটির বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন স্থানে অবৈধ ক্যাম্পাস চালানোর অভিযোগ ছিল।  সেগুলো উচ্ছেদে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পুলিশ বিভাগকে অনুরোধ করে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। ২০১৭ সালের এপ্রিলে হাইকোর্টের নির্দেশে দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয় সরকার। এ ছাড়া কুইন্স ইউনিভার্সিটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। এটি পরিচালনার কোনো অনুমতিই দেয়নি সরকার।

অননুমোদিত ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়। এর মধ্যে ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া বনানীর ১৭ নম্বর রোডে, উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরে ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি, ধানমন্ডি এলাকায় ৮টি আলাদা ঠিকানায় আলাদা ভবনে ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ, ধানমণ্ডির ৫ নম্বর রোডে ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, ধানমণ্ডির আলাদা আলাদা ৪টি ভবনে ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটি অননুমোদিত ক্যাম্পাস পরিচালিত করছে। উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরের ৭ নম্বর রোডে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি, উত্তরায় আলাদা ৫টি ভবনে চলছে উত্তরা ইউনিভার্সিটির অননুমোদিত ক্যাম্পাস। এ ছাড়া মানিকগঞ্জে স্থাপনের অনুমতিপ্রাপ্ত এনপিআই ইউনিভার্সিটি ঢাকায় ফার্মগেটে ক্যাম্পাস চালাচ্ছে অনুমতি ছাড়াই। শান্ত মারিয়াম ইউনিভার্সিটি ও ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটিও চলছে অননুমোদিত ক্যাম্পাসে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়েও ভর্তিতে সতর্ক করা হয়েছে।

শরীয়তপুরের জেড এইচ সিকদার বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেটের সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও সাভারের গণবিশ্ববিদ্যালয় অননুমোদিত প্রোগ্রাম চালাচ্ছে।  গণবিশ্ববিদ্যালয় অননুমোদিত প্রোগ্রাম চালাচ্ছে বলে ২০১৭ সালের ২৬ এপ্রিল ইউজিসি একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। সেই বিজ্ঞপ্তির বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ আদালতে রিট করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট একটি স্থগিতাদেশ দেয়। তখন আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বিবিএ, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স, এমবিবিএস, বিডিএস ও ফিজিওথেরাপি প্রোগ্রামগুলো চালু থাকে। কিন্তু বর্তমানে আদালতের সেই স্থগিতাদেশের কার্যকারিতা ভ্যাকেট হয়ে যাওয়ায় এই প্রোগ্রামগুলো বৈধ বলে বিবেচিত হবে না বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়েছে, শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাকারী ৯৩টির মধ্যে ৭৫টিতে উপাচার্য, ২৩টিতে উপ-উপাচার্য এবং ৪৮টিতে কোষাধ্যক্ষ রাষ্ট্রপতি কর্র্তৃক নিয়োগকৃত। ইউজিসির কর্মকর্তারা জানান, রাষ্ট্রপতি কর্র্তৃক নিয়োগকৃত উপাচাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ ছাড়া বাকিরা সবাই অবৈধ। রাষ্ট্রপতি কর্র্তৃক নিয়োগকৃত উপাচার্যই শিক্ষার্থীদের সনদের স্বাক্ষর করবেন আর এটাই কেবলমাত্র বৈধ বলে বিবেচিত হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসির ভারপ্রাপ্ত পরিচালক (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়) ফেরদৌস জামান বলেন, মূলত ভর্তির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে আমরা একটি গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছি। যাতে করে বৈধ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারে। এ কারণে অবৈধ আর ঝামেলাযুক্ত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উল্লেখ করে ইউজিসির ওয়েবসাইটে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। ‘এর বাইরে যেসব বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, সেখানে ভর্তি হলে শিক্ষার্থীদের সার্টিফিকেটের বৈধতা নিয়ে কোনো বিতর্ক থাকবে না বলে জানান।

সতর্কতা জারির বিষয়ে ইউজিসির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেসব বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে আইন অমান্য করে শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে, সেখানে শিক্ষার্থীরা যাতে ভর্তি না হয় সে জন্য গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা যাতে সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে প্রতারিত না হয় সে জন্যই এটা করা হয়েছে। এ ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে ছাত্রছাত্রীরা বিপদে পড়বে। তাদের সনদ বৈধ হবে না।’