রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলার পর থমকে যায় জাপানসহ বিভিন্ন দেশের সহায়তানির্ভর প্রকল্পের কাজ। আটকে যায় কাঁচপুর, মেঘনা ও গোমতী সেতু নির্মাণ এবং বিদ্যমান সেতু পুনর্বাসন প্রকল্পও। চার মাস কাজ বন্ধ থাকার পর বিদেশিদের বাড়তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কাজ শুরু হয়। এই বাড়তি নিরাপত্তার জন্য ‘কাঁচপুর, মেঘনা ও গোমতী সেতু নির্মাণ এবং বিদ্যমান সেতু পুনর্বাসন’ প্রকল্পে মূল বরাদ্দের বাইরে ৫০২ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে বলে দাবি করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এখন এই অর্থ কোথা থেকে আসবে, তা বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা। জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থা জাইকাকে বিষয়টি জানানোর পর তারাও কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেনি। চিঠি চালাচালির মধ্যেই আটকে আছে ৫০২ কোটি টাকার উৎসের সন্ধান। অতীতে বাংলাদেশের কোনো প্রকল্পে এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। ফলে সুরাহার উপায়ও খুঁজে পাচ্ছে না সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। প্রকল্প তদারকি সংস্থা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রকল্প পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিরাপত্তা জোরদার করার কারণে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ঠিকই। কিন্তু পরিমাণ এত বেশি হওয়ার কথা নয়। আলোচনা করে বিষয়টি সুরাহা করার পক্ষে মত দিয়েছেন তারা। যদিও প্রকল্পের কাজ শেষ হয়ে গেছে কয়েক মাস আগেই।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয় ৮ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাইকার অর্থায়ন ৬ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা এবং বাংলাদেশ সরকারের ২ হাজার ৫৭ কোটি টাকা। প্রকল্পে মোট বরাদ্দকৃত সাড়ে আট হাজার কোটি টাকার পুরোটা খরচ হয়নি। প্রায় এক হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। তবে বরাদ্দবহির্ভূত ওই খাতে খরচ হয়েছে ৫০২ কোটি টাকা।
প্রকল্পে যৌথভাবে জাপানের চারটি প্রতিষ্ঠান কাজ করে। চুক্তি অনুযায়ী ২০১৬ সালের ৩ জানুয়ারিতে কাজ শুরু হয় এবং এ বছরের জুনে সম্পন্ন করার কথা থাকলেও তার আগেই শেষ হয়। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলার কারণে কাজ গড়ে চার মাস বন্ধ ছিল। এ কারণে সরকার প্রকল্পের মেয়াদ ছয় মাস বাড়িয়ে চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করেছিল। এ প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ের সাত মাস আগেই সম্পন্ন হয়। এরমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্বিতীয় মেঘনা ও দ্বিতীয় গোমতী সেতু উদ্বোধনও করেছেন।
প্রকল্পটি নিয়ে আইএমইডির উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান ভূঁইয়ার করা পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হলি আর্টিজানে সংঘটিত মর্মান্তিক সন্ত্রাসী হামলার কারণে প্রকল্পের কর্মকা- বন্ধ হয়ে যায়। প্রকল্পের সার্বিক কাজে নিয়োজিত বিদেশি বিশেষজ্ঞ ও টেকনিশিয়ানদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা প্রদানের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পুলিশ, আনসার, ঠিকাদার, জাইকা এবং জাপান দূতাবাসের প্রতিনিধিদের পরামর্শক্রমে একটি নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এই পরিকল্পনায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা দেয়াল, ওয়াচ টাওয়ার, সিসি ক্যামেরা ব্যবস্থা, অ্যালার্ম, আর্চওয়ে, কন্ট্রোল রুমমহ নিরাপত্তার সব ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ ছাড়া প্রকল্প সাইটে পর্যাপ্ত সংখক পুলিশ ও আনসার সদস্য নিয়োগ করা হয়।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োগ ও সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে জাইকা ও জাপানি রাষ্ট্রদূতের উপস্থিতিতে নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সভা হয়ে আসছিল। ওইসব সভায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানি (ওএসজেআই-জেভি) বাড়তি ব্যয় নিয়ে আপত্তি করে আসছিল। আপত্তির মধ্যে ছিল নিরাপত্তা সুযোগ সুবিধা বাড়ানো এবং এর পরিচালন ব্যয়।
প্রতিবেদন বলা হয়েছে, প্রকল্প শেষে এখন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি খাতের উল্লেখ করে ৫০২ কোটি টাকা দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে টাইম রিকভারি কস্ট ৫২.০৯ কোটি টাকা, রিমেইনিং সিকিউরিটি কস্ট ২৭০ কোটি টাকা এবং এ সংক্রান্ত অন্যান্য খরচ বাবদ ২৩২.৫৬ কোটি টাকা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দাবি করে, সন্ত্রাসী হামলায় প্রকল্পের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়ে এবং সমস্যার সৃষ্টি হয়। কিন্তু কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করতে বিভিন্ন টাইম রিকভারি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। ফলে এই অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এই দাবি বা অভিযোগ প্রকল্প পরিচালক বা প্রকল্প পরামর্শক প্রকৌশলী কর্তৃক এককভাবে নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে ডিসপিউট এডজুডিকেশন বোর্ড (ডিএবি) ও আর্বিট্রেশনের মাধ্যমে এ দাবি নিষ্পত্তি করা গেলেও তা সময়সাপেক্ষ। কিন্তু প্রকল্পের কাজ শেষ হয়ে যাওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এই অর্থ পেতে বিভিন্ন সংস্থার কাছে চিঠি দিয়েছে। বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য জাইকার মধ্যস্থতায় মন্ত্রণালয় ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানির সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিভিন্ন বৈঠকে তাগাদা দেওয়া হয়। কিন্তু আজও তার কোনো রূপরেখা বা পদ্ধতি সম্পর্কিত আদেশ জারি হয়নি। পরিকল্পনা কমিশনের সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট (সিপিটিইউ) কর্র্তৃক আপস মীমাংসা সংক্রান্ত রূপরেখা দেওয়া কথা। ওই রূপরেখা না পাওয়া পর্যন্ত বিষয়টি সুরাহা হচ্ছে না।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিপিটিইউর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য নতুন। এর আগে অন্য কোনো প্রকল্পে এ ধরনের খরচ করার ইতিহাস নেই। এ জন্য শুধু এই প্রকল্পে নয়, অদূর ভবিষ্যতে অন্য প্রকল্পেও এই ধরনের সমস্যা হলে কীভাবে সমাধান হবেÑ তা নিয়ে একটি গাইডলাইন তৈরি হচ্ছে। শিগগির এটি জারি করা হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বিষয়ে আইএমইডিকে প্রকল্প পরিচালক ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবু সালেহ মো. নুরুজ্জামান বলেন, নির্দিষ্ট মেয়াদে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে সংশ্লিষ্টদের পরামর্শক্রমে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। এ কারণে কিছু অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ঠিক, কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যে পরিমাণ অর্থ দাবি করেছে, খরচ এত বেশি হয়নি। শিগগির আলোচনা করে বিষয়টি মীমাংসা করা হবে।
আইএমইডির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এরমধ্যে হলি আর্টিজানের ঘটনার কারণে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি বা অভিযোগ প্রকল্পের পরামর্শক কর্র্তৃক মূল্যায়ন ও যাচাইবাছাই করা হয়েছে। এতে সরকারের কর, ইন্স্যুরেন্স ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ৭৮ কোটি টাকার দাবির পক্ষে যৌক্তিকতা পাওয়া গেছে। যদিও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বিষয়টি মেনে নেয়নি। এ সংক্রান্ত ‘ঊর্ধ্বতন সভায়’ বিষয়টি আলোচনাপূর্বক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে আইএমইডি।
এ বিষয়ে আইএমইডি সচিব আবুল মনসুর মোহাম্মদ ফয়জুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতিবেদনে প্রকল্পের নানা বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। নিরাপত্তার বিষয়টি ছিল একটি অংশ। এই প্রতিবেদনে ভবিষ্যৎ প্রকল্প প্রণয়নে কিছু পরামর্শও দেওয়া হয়। যেন প্রকল্প প্রস্তুত থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত এখান থেকে শিক্ষা নেওয়া যায়।