ফৌজদারি কার্যবিধি, দণ্ডবিধি ও সাক্ষ্য আইনের কয়েকটি বিধান সংশোধন ও সংস্কারের মাধ্যমে যুগপোযোগী করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এক-দেড় শ বছরের পুরনো আইন দিয়ে এই আধুনিক যুগে মামলা ব্যবস্থাপনা ও মামলাজট নিরসন অনেকটা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধি চালু হয় ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে এবং দণ্ডবিধি ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে। আর ১৮৭২ সালের সাক্ষ্য আইন দিয়ে বর্তমানে অপরাধ প্রমাণ করতে হচ্ছে। তবে নানা অপরাধের বিচারের জন্য বিশেষ আইন থাকলেও যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রচলিত পুরনো আইনের সংস্কার ও সংশোধনী আনতে হবে। এদিকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলছেন, প্রয়োজন হলে অবশ্যই এসব আইন সংস্কার ও সংশোধন করা হবে।
১৫৯ বছরের পুরনো দণ্ডবিধির ৫১০ ধারা অনুযায়ী মাতলামির সাজা হিসেবে কোনো ব্যক্তি ১০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা ২৪ ঘণ্টার বিনাশ্রম কারাদণ্ড পাবে। এমন সাজার বিধানে বিস্ময় প্রকাশ করে জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলছেন, এটি হাস্যকর। আর মাতলামির মতো ঘটনায় অহরহ সামাজিক পরিবেশ নষ্ট হলেও এ অপরাধে কারও সাজা হয়েছে এমনটা তারা শোনেননি।
দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারা অনুযায়ী, ব্যভিচারের জন্য দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তি সাত বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদে সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। তবে কোনো বিবাহিত নারী বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কে (ব্যভিচার) জড়ালে শুধু সেই পুরুষের বিরুদ্ধেই মামলা করা যাবে; স্ত্রীর বিরুদ্ধে স্বামী কোনো মামলা করতে পারবেন না। একইভাবে কোনো বিবাহিত নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ালে স্বামী কিংবা ওই নারীর বিরুদ্ধে স্ত্রীও ব্যবস্থা নিতে পারবে না। তবে স্বামী যদি কোনো বিধবা বা অবিবাহিত নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান এবং স্ত্রী যদি স্বামীর অনুমতি সাপেক্ষে সম্পর্কে জড়ান তাহলে আইনে এর বৈধতা দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি এ ধারাটি চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন আইনজীবী ইশরাত হাসান। আদালত আবেদনটি আমলে নিয়ে এই ধারাটি কেন অবৈধ হবে না এ মর্মে রুল জারি করেছে।
এ ছাড়া যেকোনো স্থানে অপরাধমূলক অনধিকার প্রবেশের ক্ষেত্রে দণ্ডবিধির ৪৪৭ ধারা অনুযায়ী ৫০০ টাকা জরিমানা অথবা তিন মাস পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদে সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তেমনি গৃহে অপরাধমূলক অনধিকার প্রবেশের ক্ষেত্রে এক হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা এক বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদে সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডের কথা বলা হয়েছে।
সম্প্রতি খাদ্যপণ্যে ভেজাল নিয়ে চারদিকে নানা আলোচনা চলছে। এমনকি এ বিষয়ে উচ্চ আদালতও বিভিন্ন সময়ে আদেশ-নির্দেশনা দিচ্ছে। দণ্ডবিধির ২৭২ ধারা মতে, যেকোনো খাদ্যপণ্য মজুদ ও খাদ্য বা পানীয়জাত দ্রব্য ভেজাল মিশিয়ে বিষাক্ত বা অনিষ্ট করার শাস্তি মাত্র এক হাজার টাকা জরিমানা অথবা ছয় মাস পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদে সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
এ ছাড়া গায়ে পড়ে ঝগড়া, বিবাদ বা মারামারি করে কলহ সৃষ্টির মাধ্যমে শান্তি ভঙ্গ করলে দণ্ডবিধির ১৬০ ধারায় সর্বোচ্চ ১০০ টাকা জরিমানা অথবা এক মাস পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদে সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। প্রতিনিয়তই পাড়া-মহল্লায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নামে দিনরাত উচ্চ স্বরে গান-বাজনা, হইহুল্লোড় করে জনজীবন ব্যাহত করতে দেখা যায়। এমনকি গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তি কিংবা মৃত্যুপথযাত্রীর জীবন নিয়েও চলে খামখেয়ালিপনা। এ নিয়ে ঝগড়া-সংঘর্ষ এমনকি খুনোখুনির ঘটনাও ঘটে। কিন্তু এ ধরনের গণ-উৎপাতের মতো অপরাধের জন্য দণ্ডবিধির ২৯০ ধারায় সর্বোচ্চ ২০০ টাকা জরিমানার কথা বলা হয়েছে। আর সরকারি নিষেধাজ্ঞার পরও এ ধরনের গণ-উৎপাতের সাজা হিসেবে ছয় মাস পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদে কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
আইনজীবীদের ভাষ্য, ১৪৭ বছরের পুরনো সাক্ষ্য আইনে চলছে ফৌজদারি মামলার বিচারকাজ। ডিজিটাল এই যুগে ডিজিটাল সাক্ষ্যের অপরিহার্যতা থাকলেও এ বিষয়ে আইনে কিছুই বলা নেই। অপরাধ বা ঘটনার ভিডিও, স্থিরচিত্র, অডিও কীভাবে ব্যবহার হবে, সে বিষয়েও সাক্ষ্য আইনে স্পষ্ট কোনো সংজ্ঞা বা বিশ্লেষণ নির্ধারণ হয়নি আজও। অনেক ক্ষেত্রে ভিডিওচিত্র, স্থিরচিত্র ও অডিও অপরাধের দালিলিক প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে আসামিপক্ষ এ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে মৌখিক সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করেও মামলার বিচারকাজ চলে। এতে ন্যায়বিচার পুরো প্রতিষ্ঠিত হয় না।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চলমান মামলাজটের অন্যতম কারণ দীর্ঘদিনের পুরনো আইন দিয়ে চলছে বিচারকাজ। ফৌজদারিসহ অন্যান্য আইনকে সব সময় যুগোপযোগী করতে হয়। কেননা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের ধরনও পাল্টায়। বর্তমানে ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে অপরাধও বিস্তৃতি লাভ করছে। তাই অপরাধের ধরনের সঙ্গে সংগতি রেখে আইনগুলোকে আরও যুগোপযোগী করতে হবে, যাতে অপরাধ প্রমাণ হলে সাজা নিশ্চিত করা যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘দণ্ডবিধিতে এখনো ১০ টাকা, ১০০ টাকা, ২০০ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। এগুলো একেবারেই হাস্যস্পদ। বিচারপ্রার্থীদের হতাশা কমাতে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় এগুলোর অচিরেই পরিবর্তন ও সংশোধন কিংবা সংস্কার প্রয়োজন।’
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘আইনগুলোকে সময়োপযোগী করার জন্যই এর সংশোধন, পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করতে হবে। তবে এটি হঠাৎ করে হবে না। এ জন্য আইন কমিশনের মতামত নিতে হবে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে একটি আইন পরিবর্তনের জন্য সেখানকার আইন কমিশন বছরের পর বছর গবেষণা করে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে হঠাৎ করে আইন পাস করা হয়। যার ফলে জটিলতা আরও বাড়ে। সে জন্য আইন কমিশনকে দায়িত্ব দিতে হবে কীভাবে কী পর্যায়ে আইনের সংশোধন ও পরিবর্তন করা যায়।’
এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলাজটের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন যে খুব একটা প্রভাব ফেলে বিষয়টি তা নয়। তবে যদি প্রয়োজন হয় তাহলে অবশ্যই এসব আইনের সংশোধন ও সংস্কার করা হবে।’