দেশের শিক্ষাবিদ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশীজনসহ সংশ্লিষ্টরা উচ্চশিক্ষা কমিশন আইনের প্রয়োজন অনুভব করেন ১০ বছর আগে। এরপরই আইনটি প্রণয়নের উদ্যোগ নেয় সরকার। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেটি আলোর মুখ দেখেনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনটির খসড়া কয়েক ধাপে পর্যালোচনার পর এখন পুরোপুরি প্রস্তুত। কিন্তু অনুমোদনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারের এক শ্রেণির আমলা। এখন কবে আইনটি আলোর মুখ দেখবে তা কেউ জানে না।
জানা গেছে, অনেক বাধা পেরিয়ে ২০১৬ সালের নভেম্বরে ‘উচ্চশিক্ষা কমিশন-২০১৩’ আইনের খসড়া প্রস্তুত করা হয়। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় খসড়াটি সচিব কমিটিতে পাঠালে তারা অনুমোদন দিয়ে মন্ত্রিসভায় পাঠায়। সেখান থেকে তিনটি বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দিয়ে ফেরত পাঠালে সচিব কমিটি তা সংশোধনে একটি সাব-কমিটি করে দেয়। এরপর গত বছরের ২৬ আগস্ট প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় আইনের খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়; যা ‘বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষা কমিশন আইন-২০১৮’ নামে অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে তোলা হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, মন্ত্রিসভায় তোলার পর আবারও কয়েকটি পর্যবেক্ষণ দিয়ে এটি ফেরত পাঠানো হয়।
উচ্চশিক্ষা কমিশন আইনের খসড়ায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) বেশকিছু ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। খসড়া অনুযায়ী, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা ও অগ্রাধিকার কমিশন নির্ধারণ করবে। কোনো বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে শিক্ষাসংক্রান্ত বা প্রশাসনিক, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে কমিশন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বা কোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অভিযোগ তদন্ত করতে পারবে। তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে কমিশন উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে।
নিয়মানুযায়ী, আইনের খসড়াটি মন্ত্রিসভা নীতিগত অনুমোদন দিলে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে ভেটিংয়ের জন্য। ভেটিং শেষে চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে মন্ত্রিসভা। মন্ত্রিসভার বৈঠকে অনুমোদনের পর জাতীয় সংসদে আইন আকারে পাসের জন্য এটি উত্থাপন করা হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির কয়েক কর্মকর্তা জানান, ইউজিসির ক্ষমতা বাড়াতে আমলাতন্ত্র বাধা হিসেবে কাজ করছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয় ইউজিসির ক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইউজিসির শীর্ষপর্যায়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশেই উচ্চশিক্ষা কমিশন আছে। বাংলাদেশে এই আইনটি করতে গিয়ে এত বাধা কেন? এটা খুবই দুঃখজনক।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এক শ্রেণির আমলা মনে করছে, উচ্চশিক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যানসহ অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যে পদ-পদবি দেওয়া হয়েছে তা তাদের পদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। মূলত সমস্যাটা তারা তাদের রাজ্যের রাজত্ব অন্যের হাতে দিতে চাইছে না। তারা মনে করছেন, তাদের ক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ আইনটি সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত। শুধু অনুমোদন দিলেই আইনটি পাস হয়ে যায়।’
আইনের খসড়া অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষা কমিশনের প্রধান হবেন চেয়ারম্যান। রাষ্ট্রপতি নির্ধারিত শর্তে তিনি চার বছর মেয়াদে নিযুক্ত হবেন এবং দ্বিতীয় মেয়াদেও নিযুক্ত হওয়ার জন্য বিবেচিত হতে পারবেন। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খ্যাতিমান ও অভিজ্ঞ ব্যক্তি উচ্চশিক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হবেন। চেয়ারম্যানের পদমর্যাদা, বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা রাষ্ট্রপতি নির্ধারণ করবেন। সংস্থাটিতে পাঁচজন পূর্ণকালীন সদস্য থাকবেন। রাষ্ট্রপতি পূর্ণকালীন সদস্যদের নিয়োগ দেবেন। চেয়ারম্যানের মতো পূর্ণকালীন সদস্যদেরও পদমর্যাদা নির্ধারণ করা নেই আইনে। রাষ্ট্রপতি পদমর্যাদা নির্ধারণ করবেন।
খসড়ায় বলা হয়েছে, উচ্চশিক্ষায় গবেষণার ক্ষেত্রে প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, যার শিক্ষকতা, গবেষণা বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে অন্যূন ২০ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে তিনি পূর্ণকালীন সদস্য হিসেবে নিয়োগের যোগ্য হবেন। রাষ্ট্রপতি নিযুক্ত ১২ জন খণ্ডকালীন সদস্য থাকবেন দুই বছর মেয়াদে। খণ্ডকালীন সদস্যদের মধ্যে সরকার মনোনীত তিনজনের মধ্যে রয়েছেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব, পরিকল্পনা কমিশনের একজন সদস্য ও অর্থ বিভাগের সচিব। এ ছাড়া খণ্ডকালীন সদস্য থাকবেন রাষ্ট্রপতি মনোনীত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন উপাচার্য, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন উপাচার্য ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন ডিন। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ অনুযায়ী, যেসব বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজনীয় সব শর্ত পূরণ করে স্থায়ী সনদ অর্জন করেছে, কেবল সেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খণ্ডকালীন সদস্য নিযুক্ত করা হবে।
তিনজন ডিনকে খণ্ডকালীন সদস্য নিয়োগের শর্তে বলা হয়েছে, যেসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খণ্ডকালীন সদস্য নিয়োগের জন্য বিবেচিত হয়েছে এমন বিশ্ববিদ্যলয় থেকে ডিন খণ্ডকালীন সদস্য হবেন না। চেয়ারম্যান অপসারণের বিষয়ে আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি যেভাবে অপসারিত হয়ে থাকেন সেই পদ্ধতিতেই চেয়ারম্যান অপসারিত হবেন। তবে সদস্যরা রাষ্ট্রপতির সন্তোষ অনুযায়ী স্বপদে থাকবেন।
ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে উচ্চশিক্ষা কমিশন আইন প্রণয়নের সময় ফিলিপাইন, নেপালসহ বিভিন্ন দেশের আইন আমরা সংশ্লিষ্টদের সরবরাহ করেছিলাম। আমরা ভিন্ন কিছু চাইনি, অন্য দেশে যেমন রয়েছে তেমনই সুপারিশ করা হয়েছে। তারপরও কোথায় আপত্তি সেটা জানা নেই। তবে আমরা চাই, দ্রুত আইনটি পাস হয়ে যাক।’
একই মন্তব্য করেছেন ইউজিসির বর্তমান চেয়ারম্যান ডা. কাজী শহীদুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘দেশের উচ্চশিক্ষা স্তরের জন্য এই আইনটি এখন খুবই সময়োপযোগী। এটি যত দ্রুত কার্যকর হবে ততই মঙ্গল।’
এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব সোহরাব হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি। কিছু পর্যবেক্ষণ রয়েছে, সাব-কমিটি সেগুলো সংশোধন করে প্রস্তুত করেছে। এখন শুধু অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। আশা করি, দ্রুতই আইনটি পাস হয়ে যাবে।’