সরকারের কাছে বিপুল পরিমাণের বকেয়াকে কেন্দ্র করে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে টানাপড়েনে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন দেশের শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোনের শেয়ারহোল্ডাররা। নিট মুনাফায় ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও বকেয়া আদায়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কঠোর পদক্ষেপের প্রভাব পড়েছে শেয়ার দরে। এর ফলে মাত্র সাড়ে চার মাসে কোম্পানিটি সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি বাজারমূল্য হারিয়েছে। পর্যবেক্ষণে এমন তথ্য মিলেছে।
১৯৯৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত যন্ত্রপাতি আমদানিসহ বিভিন্ন বিষয়ে গ্রামীণফোনের কাছে বিটিআরসি ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পাওনা ও এর সুদ মিলিয়ে ১২ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা দাবি করে গত ২ এপ্রিল চিঠি পাঠায় বিটিআরসি। পাওনা পরিশোধে ব্যর্থতায় বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানায় বিটিআরসি। আর এরপর থেকেই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত গ্রামীণফোনের শেয়ারের দর কমতে থাকে।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি বছরের ১ এপ্রিল গ্রামীণফোনের ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) কেনাবেচা হয় ৪১৭ টাকায়। এ সময় এ কোম্পানির বাজারমূল্য ছিল ৫৬ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা। নিট মুনাফায় ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও পাওনা আদায়ে বিটিআরসির কঠোর পদক্ষেপের কারণে পরের দিন ২ এপ্রিল থেকেই গ্রামীণফোনের শেয়ার দর কমতে থাকে। সর্বশেষ গ্রামীণফোনের নতুন প্যাকেজ অনুমোদন না দেওয়া ও বিদ্যমান প্যাকেজের নবায়ন না করার বিটিআরসির উদ্যোগের কারণে ধারাবাহিকভাবে কমতে শুরু করে, যা গতকাল ৩১৭ টাকায় নেমে আসে। এর ফলে চলতি বছরের ১ এপ্রিল থেকে গতকাল পর্যন্ত গ্রামীণফোনের শেয়ার দর কমে প্রায় ২৪ শতাংশ। এ সময় গ্রামীণফোনের বাজারমূল্য কমেছে ১৩ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা।
একটি কোম্পানির শেয়ার দর বিবেচনায় বাজারমূল্য যাচাই করা হয়। গ্রামীণফোন হচ্ছে দেশের পুঁজিবাজারের সবচেয়ে বড় বাজার মূলধনী কোম্পানি। এ কারণে গ্রামীণফোনের শেয়ার দর কমে যাওয়ার প্রভাব পুরো বাজারেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। গত ১ এপ্রিল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধন ছিল ৪ লাখ ১৩ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। সে সময় ডিএসইর বাজার মূলধনের ১৩ দশমিক ৬২ শতাংশই ছিল গ্রামীণফোনের। শেয়ার দরের বড় পতনের কারণে বর্তমানে ডিএসইর বাজার মূলধনের ১১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশে নেমে এসেছে গ্রামীণফোনের মূলধন।
বড় মূলধনী কোম্পানি হওয়ায় গ্রামীণফোনের শেয়ার দর এক টাকা কমলে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স কমে শূন্য দশমিক ৬ পয়েন্ট। চলতি বছরের ১ এপ্রিল থেকে গতকাল পর্যন্ত গ্রামীণফোনের শেয়ার দর কমেছে ১০০ টাকা। এ হিসাবে এ সময় ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ৬০ পয়েন্ট কমেছে শুধুুমাত্র গ্রামীণফোনের শেয়ারের পতনের কারণে।
এদিকে বিটিআরসি গ্রামীণফোনের কাছে ১২ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা দাবি করলেও এর সঙ্গে একমত নয় বলে সে সময় জানায় গ্রামীণফোন। পাওনা পরিশোধে সময় বেঁধে দিয়ে বিটিআরসি চিঠি পাঠালেও পরবর্তীকালে গ্রামীণফোন এক বিবৃতিতে জানায়, ‘বিটিআরসি যে অর্থ দাবি করেছে, গ্রামীণফোন তার সঙ্গে একমত নয়। বিটিআরসির সঙ্গে অনেকবার মিথস্ক্রিয়া ও নিরীক্ষকদের সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতা বাড়ানো সত্ত্বেও এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে, এই নিরীক্ষায় তাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো প্রতিফলিত হয়নি।’ নিরীক্ষা প্রক্রিয়ায় ত্রুটি ছিল দাবি করে গ্রামীণফোন জানায়, ‘সমগ্র নিরীক্ষা কার্যপ্রণালীতে ত্রুটি রয়েছে। সেখানে তাদের পর্যবেক্ষণ আমলে নেওয়া হয়নি। এখন সঠিক পদক্ষেপ নির্ধারণের জন্য তারা নিজেরাই একটি নিরীক্ষা করবে।’
প্রসঙ্গত, যন্ত্রপাতি আমদানিসহ বিভিন্ন বিষয়ে গ্রামীণফোন ও রবি আজিয়াটার কাছে সরকারের পাওনার পরিমাণ দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের কাছে ১২ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা ও রবি আজিয়াটার কাছে ৮৬৭ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। ১৯৯৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত যন্ত্রপাতি আমদানিসহ বিভিন্ন বিষয়ে গ্রামীণফোনের কাছে বিটিআরসির পাওনা ও এর সুদ মিলিয়ে ১২ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা দাবি করে গত ২ এপ্রিল চিঠি পাঠায় বিটিআরসি।
তবে বকেয়া অর্থ পরিশোধ না করায় গত ৪ জুলাই গ্রামীণফোনের ৩০ শতাংশ ও রবির ১৫ শতাংশ ব্যান্ডইউডথ কমিয়ে দেয় বিটিআরসি। এই নির্দেশনা কার্যকরের পর থেকে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা নানা সমস্যায় পড়েন। গ্রাহকরা ভোগান্তিতে পড়ায় গত ১৭ জুলাই ইন্টারনেটের গতি কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে অপারেটর দুটিকে অনাপত্তি পত্র (এনওসি) না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিটিআরসি। এতে করে অপারেটর দুটির নতুন প্যাকেজ অনুমোদন বন্ধ হয়ে যায়। এরপরও বকেয়া আদায়ে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় চলতি মাসে গ্রামীণফোন ও রবির বিদ্যমান প্যাকেজ নবায়ন না করার প্রস্তাব সংক্রান্ত একটি উদ্যোগের অনুমোদন চেয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে বিটিআরসি।