দক্ষিণ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ব্যবস্থাপনায় নির্মীয়মাণ ও নির্মিত ১০-১২টি শপিংমলে অন্তত পাঁচ হাজার দোকান বরাদ্দ দেওয়া হলেও তা বুঝে পাচ্ছেন না ব্যবসায়ী ও দোকানদাররা। অভিযোগ উঠেছে, দোকান বরাদ্দ বাবদ কয়েকশ কোটি টাকা ডিএসসিসির কোষাগারে জমা হওয়ার পরও তারা বরাদ্দবঞ্চিত হয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা দোকান বরাদ্দের নামে এ ঘটনাকে প্রহসন বলে আখ্যায়িত করছেন।
দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, গুলিস্তান ট্রেড সুপার মার্কেটে (গুলিস্তান পুরান বাজার হকার্স মার্কেট) সর্বমোট ১ হাজার ৭৮০টি দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়। এসব দোকান ১৯৯৬ সালে তৎকালীন সিটি মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ও ২০০৪ সালে সাদেক হোসেন খোকা বরাদ্দ দেন। দোকানদারদের কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা করে প্রায় ৮৯ কোটি টাকা আদায় করে সিটি করপোরেশন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও দোকান বুঝিয়ে দিতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। একই অবস্থা মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন হকার্স সমিতি মার্কেটে। সেখানে বরাদ্দ পেয়ে ৩ লাখ টাকা করে জমা দেন ৩৯৯ জন। একই হারে টাকা জমা দিয়েছেন গুলিস্তান ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমিতি মার্কেটে দোকান পাওয়া ৩০১ জন। ১/১১ সরকারের সময় এ দুই সমিতির সদস্যদের দেওয়া প্রায় ২১ কোটি টাকা সিটি করপোরেশনের কোষাগারে জমা পড়ে। তাদের মধ্যেও কেউ আজও দোকান বুঝে পাননি। কিন্তু এখানেই থেমে নেই প্রতিষ্ঠানটির ঢিমেতেতালা দোকান বরাদ্দ কার্যক্রম।
গত কয়েক বছরে ডিএসসিসি ঢাকা নিউ সুপার মার্কেট, বনলতা কাঁচাবাজার, চন্দ্রিমা সুপার মার্কেট, ২নং পলাশী রোড সাইড মার্কেট, যাত্রাবাড়ী কাঁচাবাজার, সূত্রাপুর কাঁচাবাজার, কাপ্তানবাজার (মুরগিপট্টি) মার্কেট, ঢাকেশ্বরী রোড সাইড মার্কেট, চানখাঁরপুল রোড সাইড মার্কেট, ইসলামবাগ মার্কেট কাম কমিউনিটি সেন্টার, ফুলবাড়িয়া সুপার মার্কেট-২ এবং ব্লক ‘এ’ ও ‘বি’, খিলগাঁও মার্কেট, দয়াগঞ্জ রোড সাইড মার্কেট, নবাবগঞ্জ কাঁচাবাজার, ইসলামবাগ কাঁচাবাজার মার্কেট, ৩৮/৬ নর্থ ব্রুক হল রোড সাইড মার্কেট, সিমসন রোড সাইড মার্কেট নির্মাণের কাজ হাতে নিয়েছে। কাগজে-কলমে মার্কেটগুলোর বেশিরভাগ দোকান বরাদ্দ দেওয়া হলেও নির্মাণকাজে নেই কোনো অগ্রগতি।
২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর সরকার ঢাকা সিটি করপোরেশনকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এই দুই ভাগে বিভক্ত করে। একই সঙ্গে আইন পরিবর্তন করে নির্বাচন অবধি ৬ মাস মেয়াদে প্রশাসক নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়। ২০১১ সালের ৩ ডিসেম্বর প্রথম দফায় ডিএসসিসির প্রশাসক নিয়োগ হয়। ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল নির্বাচনের পর ডিএসসিসির মেয়র পদে সাঈদ খোকন আসীন হন। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ডিএসসিসির ৮৬টি বিপণিবিতান রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ৪০টির বেশি বিপণিবিতানের দশা জরাজীর্ণ। নতুন মেয়র দায়িত্ব নেওয়ার পর ডিএসসিসির এক সভায় পুরনো কিছু বিপণিবিতান ভেঙে নতুন ২৭টি বিপণিবিতান নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরে আরও ১০টি বিপণিবিতান ভেঙে আধুনিকায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু ডিজাইন, নকশা চূড়ান্ত হওয়ার পরও এগুলোর নির্মাণকাজ শুরু করা হয়নি।
ডিএসসিসির এসব মার্কেটের ৩০ শতাংশ দোকান মেয়রের নামে বরাদ্দ করা হয়েছে। নগর বিশেষজ্ঞদের আপত্তি সত্ত্বেও ২০১৬ সালের ১৩ অক্টোবর এক সরকারি গেজেটের মাধ্যমে মেয়রের বরাদ্দ ১০ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। সংশ্লিষ্টরা এর আগে মেয়রের নামে বরাদ্দ হওয়া দোকানের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরেছিলেন। মেয়রের নামে বরাদ্দ দোকানের ১০ শতাংশ সুনির্দিষ্ট করা হলেও বাকি ২০ শতাংশ মেয়র ইচ্ছামাফিক বরাদ্দ দিতে পারেন। অভিযোগ রয়েছে, মেয়রের নামে যেসব দোকান বরাদ্দ করা হয়েছে, সেগুলোর আগাম অর্থ আদায় করা হলেও অনেক ক্ষেত্রেই নির্মাণকাজই শুরু হয়নি।
এসব মার্কেটে যারা দোকান বরাদ্দ পাওয়ার জন্য অগ্রিম অর্থ দিয়েছেন, তারা অনেকেই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। সঞ্চয়ের একটা বড় অংশ এই বরাদ্দের জন্য বিনিয়োগ করেছেন। দিনের পর দিন নির্মাণকাজ বন্ধ থাকায় তারা আর্থিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। পাশাপাশি ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে দীর্ঘ নির্মাণ প্রক্রিয়া ও এ সংক্রান্ত দীর্ঘসূত্রতা। আর নাগরিক সেবার জন্য প্রতিষ্ঠিত সরকারি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কাজে এই ধরনের অস্বচ্ছতা কখনই কাম্য নয়। অন্যান্য সরকারি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, যেমন রাজউক, জাতীয় গৃহায়ন কর্র্তৃপক্ষ তাদের ফ্ল্যাট নির্মাণের সময় দরপত্র আহ্বান করে এবং ঠিকাদার নিয়োগদানের পরে অর্থ নিয়ে থাকে। এই স্বচ্ছ প্রক্রিয়া সিটি করপোরেশনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়া জরুরি।