কোরবানির চামড়া নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা এখনো কাটেনি। ট্যানারি মালিকদের কাছে কয়েক বছরের দাম বকেয়া থাকায় আড়তদাররা চামড়া বিক্রি করছেন না তাদের কাছে। কোরবানির পরও এই সূত্র ধরে চামড়া কেনা নিয়ে সৃষ্টি হয় জটিলতা। তখন চামড়া ব্যবসায়ীরা দাবি করেন, তাদের কাছে নগদ টাকা না থাকায় চামড়া কিনতে পারছেন না। তবে সরকারের তরফ থেকে চামড়া রপ্তানির বিষয়ে ইতিবাচক ঘোষণা পেয়ে গত শনিবার থেকে তারা চামড়া কিনতে শুরু করেন। গত রবিবার সরকার, ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের ত্রিপক্ষীয় সভাও হয়। সেখানে বকেয়া আদায় ও সোমবার থেকে ট্যানারি মালিকদের কাছে চামড়া বিক্রি শুরুর সিদ্ধান্তও হয়। তবে বকেয়ার কারণে রাজধানীর পোস্তা এলাকার আড়তদাররা ট্যানারি মালিকদের কাছে চামড়া বিক্রি করেননি। রাজধানীর মতো একই অবস্থা দেশের অন্যান্য এলাকারও। তবে কিছু কিছু এলাকায় আড়তদার ও ট্যানারি মালিকদের মধ্যে চামড়া বেচাকেনার খবরও পাওয়া গেছে।
দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে বিস্তারিত
রাজধানীর পোস্তার ব্যবসায়ীরা আড়ত থেকে কাঁচা চামড়া বিক্রি শুরু করেছেন। গতকাল বেশ কিছু ট্যানারি মালিক পোস্তা থেকে চামড়া কিনেছেন। তবে যেসব ট্যানারি মালিকের কাছে আড়তদাররা বকেয়া পান, তাদের কাছে চামড়া বিক্রি করেননি তারা। আর নগদে কিনতে হবে বিধায় সাভার ট্যানারিপল্লীর অনেক কারখানা মালিক চামড়া কিনতে পোস্তায় যাননি।
আড়তদাররা বলছেন, যেসব ট্যানারি মালিকের বকেয়া নেই এবং নগদ টাকা নিয়ে চামড়া কিনতে এসেছেন, আমরা শুধু তাদের কাছেই সোমবার চামড়া বিক্রি করেছি। আকিজসহ বেশ কিছু বড় প্রতিষ্ঠান গতকাল চামড়া কিনেছে। তবে সাভারের ট্যানারি মালিকরা এখনো পুরোপুরি কেনা শুরু করেননি। যেহেতু আমরা বকেয়া টাকার জন্য চাপ দিচ্ছি, তাই তারা টাকা-পয়সা জোগাড় করে কয়েক দিনের মধ্যে কেনা শুরু করবেন বলে আশা করা যায়।
বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হাজী মো. দেলোয়ার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, যারা তিন বছর ধরে টাকা দেন না, তাদের কাছে আমরা চামড়া বিক্রি করছি না। যার কোনো বকেয়া নেই, তার কাছে নগদ টাকায় চামড়া বিক্রি করতেছি। যত ট্যানারি আছে, সবাই তো দেনাদার নয়। যারা ভালো, তাদের কাছেই বিক্রি করছি।
আড়তদাররা বলছেন, ট্যানারি মালিকদের কাছে আড়তদারদের গত তিন বছরের বকেয়া প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। বকেয়া টাকা না পেলে চামড়া না কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমরা। তবে সরকারের রপ্তানির ঘোষণার পর আমরা চামড়া কিনছি। সরকারের অনুরোধে ট্যানারি মালিকদের কাছে বিক্রিও শুরু করেছি। আগামী ২২ আগস্ট এফবিসিসিআইয়ের নেতৃত্বে আমাদের পাওনা টাকা আদায় নিয়ে সভা হওয়ার কথা। ওই সভার পর ট্যানারি মালিকরা বকেয়া পরিশোধ না করলে আমরা চামড়া রপ্তানি করব।
চট্টগ্রাম ব্যুরো জানিয়েছে, জেলার আড়তগুলোতে সংগৃহীত চামড়া বিক্রি নিয়ে সংকট কেটেছে। চট্টগ্রামের একমাত্র ট্যানারি রিফ লেদারের লোকজন গতকাল সোমবার থেকে স্থানীয় আড়তদারদের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন। দুই-একদিনের মধ্যে আসবেন ঢাকার ট্যানারি মালিকরাও। আড়তদাররা বলছেন, সংগৃহীত কোরবানির পশুর চামড়াগুলোর প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এখন সবাই ট্যানারি মালিকদের অপেক্ষায় রয়েছেন।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার সমিতির সভাপতি আবদুল কাদের দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সরকার, ট্যানারি মালিক ও চামড়া ব্যবসায়ীদের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ট্যানারি মালিকরা আড়তদারদের সঙ্গে চামড়া কেনার বিষয়ে আলাপ আলোচনা শুরু করেছেন। মঙ্গলবার-বুধবারের মধ্যে ঢাকার ট্যানারি মালিকরা চট্টগ্রামে আসবেন।
রাজশাহী থেকে আমাদের প্রতিবেদক জানিয়েছেন, কম দামে চামড়া কিনেও অনিশ্চয়তা কাটেনি রাজশাহীর চামড়া ব্যবসায়ীদের। গুদামে পড়ে রয়েছে এবারের ঈদের লক্ষাধিক চামড়া। এখনো ট্যানারি মালিকরা চামড়া কিনতে শুরু না করায় দাম নিয়েও চামড়া ব্যবসায়ীদের অনিশ্চয়তা কাটেনি। তবে গত রবিবার ঢাকায় ট্যানারি মালিকদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সভায় আশ্বাসের দুশ্চিন্তা কিছুটা কমেছে তাদের। রাজশাহী জেলা চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক আবদুর রৌফ বলেন, ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন আগের বছরগুলোর মোটা অঙ্কের যে টাকা ট্যানারি মালিকদের কাছে বাকি রয়েছে সেগুলো আগে পরিশোধ করা না হলে ট্যানারিতে চামড়া দিতে চান না। ট্যানারি মালিকদের কাছে রাজশাহীর চামড়া ব্যবসায়ীদের পাওনা প্রায় ১০ কোটি টাকা।
কুমিল্লার চামড়া ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, ঢাকার পোস্তার আড়তদারদের কাছে দেড় কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। কয়েক বছর ধরে এ টাকা পরিশোধ করছেন না আড়তের মালিকরা। আড়তদাররা বলছেন, ট্যানারি মালিকরা তাদের পাওনা পরিশোধ করছেন না। তাই বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীদের চামড়ার বকেয়া টাকা পরিশোধ করতে পারছেন না তারা।
বগুড়ার চামড়া ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এবার পুঁজির অভাবে অনেকেই কোরবানির চামড়া কিনতে পারেননি। বগুড়া জেলা চামড়া ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মতিন সরকার জানান, ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে তারা ৩৫ কোটি বকেয়া টাকা পাবেন। গত তিন বছর ধরেও তাদের এই টাকা আটকে রাখা হয়েছে। বকেয়া পাওনা না পেয়ে অনেক ব্যবসায়ীই এবার চামড়া কিনতে পারেননি। সোমবার পর্যন্ত চামড়া কেনার জন্য নগদ কোনো টাকা বগুড়ায় পৌঁছেনি।
মাগুরা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে জেলার চামড়া ব্যবসায়ীদের পাওনা প্রায় ৪ কোটি টাকা। বকেয়া টাকা না পাওয়ায় এবার কোরবানিতে লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক চামড়াও কিনতে পারেননি মাগুরার চামড়া ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে পুঁজি না থাকায় চামড়া ঢাকার ট্যানারিতে পাঠাতে পারছেন না মাগুরার ব্যবসায়ীরা।
তবে ব্যতিক্রম চিত্র দেখা গেছে সাভারে। সেখানে দেখা গেছে ট্যানারি মালিকদের কাছে কাঁচা চামড়া বিক্রি শুরু করেছেন আড়তদাররা। রবিবার সচিবালয়ে সরকার, ট্যানারি মালিক ও আড়তদার এবং কাঁচা চামড়া সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের পর সোমবার সকাল থেকে সাভারের বিভিন্ন ট্যানারিতে ট্রাকবোঝাই কাঁচা চামড়া ঢুকতে শুরু করেছে।
সারা দেশের চামড়া ব্যবসায়ীরা আশা করছেন, গত রবিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সরকার, ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের ত্রিপক্ষীয় সভায় ট্যানারি মালিকদের কাছে আড়তদারদের বকেয়া টাকা নিয়ে সমাধানে পৌঁছাতে ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তা যদি ২২ আগস্ট সমাধান হয়ে যায় তবে চামড়া নিয়ে জটিলতা কেটে যাবে।