মিরপুরের চলন্তিকা বস্তিতে আগুন

পোড়া ঘর আগলে এখনো পড়ে আছে ক্ষতিগ্রস্তরা

রাজধানীর মিরপুরের চলন্তিকা বস্তিতে আগুনে সর্বস্বান্ত হওয়াদের একজন আবুল হোসেন (৩৫)। বস্তিটিতে ১৫টি ঘরের মালিক ছিলেন তিনি। নিজে তিনটি ঘর নিয়ে থাকতেন। আগুনে পুরোপুরি পুড়ে যাওয়া বস্তিটিতে গতকাল সোমবার গিয়ে দেখা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত ঘরের পাশে কপালে হাত দিয়ে বসে আছেন আবুল হোসেন। পাশেই বসে তার মা।

পোড়া ঘরের ওপর বসে থাকার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে আবুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৩৬ বছর ধরে এখানে আছি। আমাদের ঘরে দুটি ফ্রিজ, দুটি টেলিভিশন এবং ছোট ভাইয়ের ল্যাপটপ, ওভেন ও আলমারিসহ প্রায় ৬ লাখ টাকার মালামাল ছিল। সব শেষ হয়ে গেছে। ঘরের পজিশনও পাব কি না জানি না। পোড়া মালামাল ফেলে রেখেছি যাতে জায়গা হাতছাড়া না হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয় প্রশাসন বা নেতাদের কেউ আমাদের সঙ্গে কথা বলেনি। কী করব বুঝতে পারছি না।’

আগুনে সর্বস্বান্ত হওয়াদের একজন দিনমজুর আবদুল সাত্তার (৪০)। বস্তির পশ্চিম পাশে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে থাকতেন। দিনমজুর হলেও তার ঘরে ছিল এলইডি টিভি, ফ্রিজ, ফ্যান। আগুনে সব পুড়ে গেছে। গতকালও দেখা গেছে পোড়া ঘরের পাশে স্ত্রী, তিন ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে বসে আছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার ঘরে সব মিলে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকার মালামাল ছিল। কিছুই নিতে পারিনি। আমার পাশের দুটি ঘরে থাকত মেয়ে-জামাই ও ভাতিজা। তাদের ঘরেও ৪০ হাজার টাকার বেশি মালামাল ছিল।’

সাজেদুল নামে এক ভাড়াটিয়া বলেন, ‘আমার ঘরে এলইডি টিভি, চারটি গানের বড় বক্স, আলমারি, কাপড়চোপড়সহ মোট ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার মালামাল ছিল, সব পুড়ে গেছে।’

টিনের খুপরি ঘরের ভাড়াটিয়ারা জানিয়েছে, বস্তির প্রায় ২০ হাজার ঘরের প্রতিটিতে ৩৫ থেকে ৪৫ হাজার টাকার মালামাল ছিল। বেশিরভাগ ঘরেই ছিল ফ্রিজ, এলইডি টিভি, ওভেন, খাট ও আলমারিসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র। বস্তিতে থাকা ঘরমালিকদের কারও কারও ছিল লাখ টাকার মালামাল। আগুন থেকে বাঁচতে জীবন নিয়ে পালিয়েছেন সবাই। কারও ঘরে নগদ টাকাও ছিল, কিন্তু সরিয়ে নেওয়ার সময় পাননি।

এদিকে আগুনে ঘর পোড়ার চার দিন অতিবাহিত হলেও কোনো আর্থিক সহায়তা পায়নি ক্ষতিগ্রস্তরা। তবে গতকাল সোমবার ক্ষতিগ্রস্ত বস্তিবাসীর মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করতে গিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্তদের নতুন করে ঘরবাড়ি করে দিয়ে পুনর্বাসন করা হবে। আমি আপনাদের আশ্বস্ত করছি আমরা এই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় যতদিন সাহায্যের দরকার, ত্রাণের দরকার ও পুনর্বাসন পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকার আপনাদের পাশে আছে।’

অন্যদিকে বস্তির ঘরের মালিকরা রয়েছেন আতঙ্কে। অনেকেই গ্রামের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে ঘরের পজিশন কিনেছিলেন। একটি পজিশন এক থেকে দেড় লাখ টাকায় কেনা। পজিশন ধরে রাখতে পোড়া মালামাল রেখে দিয়েছে অনেকে। তাদের আশঙ্কা স্থানীয় প্রভাবশালীরা জায়গা দখল করে নেবে। নাম প্রকাশ না করে বস্তির তিনটি ঘরের এক মালিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখানে অনেকেই আছেন যাদের একশর ওপর ঘর আছে। তারা স্থানীয় প্রভাবশালী। বস্তিতে থাকে না, কিন্তু বাইরে থেকে সব নিয়ন্ত্রণ করে। আমরা যারা অল্প কিছু ঘরের মালিক তারা আতঙ্কে আছি। জায়গা দখল হলে কিছুই করার থাকবে না। কারণ এই জায়গার কোনো দলিল আমাদের নেই। বছর তিনেক আগে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে হোল্ডিং নম্বরসহ কাগজ দিয়েছিল। আগুনে সব পুড়ে গেছে।’

গতকালও বস্তিবাসীদের স্থানীয় স্কুল ও ভবনের নিচে থাকতে দেখা গেছে। সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিভিন্ন এনজিওর কর্মীরাও সহায়তা করছে। তিন বেলা খাবার পেলেও মাথা গোঁজার স্থায়ী জায়গা চায় তারা। আগুনে বই-খাতা পুড়ে যাওয়াতে শিক্ষার্থীরা পড়েছে বিপাকে। বন্ধ রয়েছে বস্তির শিশুদের শিক্ষাদানকারী শুরভি, আরবান ও ব্র্যাক স্কুলের কার্যক্রম। মিরপুর জার্মান টেকনিক্যালের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী নুর আলম (১৬) বলে, ‘আগুনে আমার বই, ল্যাপটপ সব পুড়ে গেছে। প্রি-টেস্ট পরীক্ষা দিতে পারছি না।’

বস্তির শিশুদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেসরকারি এনজিও শুরভি, আরবান ও ব্র্যাক পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাদান করছে বস্তিটিতে। কিন্তু আগুনে পোড়ার পর থেকে বন্ধ রয়েছে শিক্ষা কার্যক্রম।

গত শুক্রবার রাতে বস্তিতে আগুন লাগার পরপরই জীবন বাঁচাতে এক কাপড়ে বেরিয়ে যায় এখানকার বাসিন্দারা। আগুনে সম্পূর্ণ বস্তিই ভস্মীভূত হয়েছে। কয়েক হাজার মানুষ ঘরছাড়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের বেশিরভাগই দিনমজুর, রিকশাচালক ও পোশাকশ্রমিক।