বেদনাবিধুর একুশে আগস্ট

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ১৫ বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০০৪ সালের এই দিনে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে চালানো হামলায় অল্পের জন্য রক্ষা পান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, নিহত হন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের স্ত্রী ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেত্রী আইভী রহমানসহ দলের ২৪ নেতাকর্মী। আহত হন কয়েকশ। তখনকার প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বই ছিল গ্রেনেড হামলার লক্ষ্যবস্তু।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর এই ঘটনা জাতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে ঘৃণ্য অধ্যায়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার এমন অপচেষ্টা সমকালীন বিশ্ব রাজনীতিতে বিরল। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলাও তেমনই ঘৃণ্য ও নিন্দনীয়। এটি তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার প্রাণনাশের ধারাবাহিক চেষ্টারই অংশ।

বিগত চারদলীয় জোট সরকারের শাসনামলে এ সংক্রান্ত মামলা ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে নানাভাবে। ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে অনেক তথ্যও। জজ মিয়া নামের এক নিরীহ ব্যক্তিকে আটক করে তার কাছ থেকে মিথ্যা জবানবন্দি আদায় করে ঘটনার প্রকৃত কুশীলবদের আড়াল করার চেষ্টাও হয়েছে।

এই হামলাসংক্রান্ত মামলায় আদালতের দেওয়া রায়ে যে ১৯ ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড ও ১৯ ব্যক্তির যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ হয়েছে তাদের মধ্যে তৎকালীন সরকারের একজন মন্ত্রী, একজন প্রতিমন্ত্রী, একজন উপমন্ত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পুত্র, রাজনৈতিক সচিব, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক, ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক প্রমুখ রয়েছেন। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় তৎকালীন সরকারের একটি অংশ শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের হত্যা করার উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রযন্ত্রের কিছু সংস্থাকে ব্যবহার করেছিল এ বিষয়ে অনেকেই নিঃসংশয়। এটা এই অপরাধের সবচেয়ে ন্যক্কারজনক দিক। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত একটি সরকারের শাসনকালে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জীবনের ওপর এমন বর্বর আক্রমণের ঘটনা আমাদের রাজনীতির ইতিহাসে একটি কলঙ্কের অধ্যায়।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার প্রাণনাশের চেষ্টা ২১ আগস্টের আগেও অনেকবার হয়েছে। ১৯৮৯ সালের আগস্ট মাসেই ৩২ নম্বরে পঁচাত্তরের ঘাতকদের সংগঠন ফ্রিডম পার্টি দ্বারা আওয়ামী লীগ সভাপতির ওপর হামলা করা হয়। দীর্ঘসূত্রতার পরে এ ঘটনার দায়ে ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে আদালতের দেওয়া রায়ে বঙ্গবন্ধুর খুনি খন্দকার আবদুর রশীদসহ ফ্রিডম পার্টির ১১ নেতাকর্মীকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ১৯৯৪ সালে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী ট্রেনে গুলি ও বোমা হামলার ঘটনায় করা মামলার রায়ে ৯ জনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। একই মামলায় ২৫ জনকে দেওয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। ২০০০ সালের ২২ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনার জনসভায় বোমা পেতে হামলা পরিকল্পনার মামলাটিতে ২০১৭ সালের আগস্টে দেওয়া রায়ে ১০ আসামির মৃত্যুদণ্ড হয়। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সঙ্গে হরকাতুল জিহাদ নামের যে জঙ্গিগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা আদালতে প্রমাণিত হয়েছে, তারা ছাড়াও একাধিক জঙ্গিগোষ্ঠী বহু বছর ধরে বিভিন্ন নামে গোপনে তৎপর রয়েছে। এ ধরনের নিকৃষ্ট অপরাধীদের কঠোর হাতে দমন করার পরিবর্তে মদদ দেওয়া এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নির্মূল করার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে যে খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো, ভবিষ্যতে তার পুনরাবৃত্তি না ঘটাই বাঞ্ছনীয়।

২১ আগস্টের হামলা রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত। রাজনীতি ভয়াবহভাবে দুর্বৃত্তায়িত হলেই এটি সম্ভব। এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে ন্যায়বিচারের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাদেরও সজাগ হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। আইনগত ব্যবস্থা ছাড়াও দলের ভেতর থেকে প্রতিহিংসার উপাদান দূর করতে হবে। গণতন্ত্রের স্বার্থেই রাজনীতি থেকে দূর করতে হবে অপশক্তি ও অপচিন্তা। ২১ আগস্টের যেসব সাজাপ্রাপ্ত আসামি বিদেশে পলাতক রয়েছে তাদের কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে ফিরিয়ে আনতে হবে। আমরা ওই হামলায় নিহত ব্যক্তিদের প্রতি গভীর শোক ও শ্রদ্ধা নিবেদন করি। আর আহতদের প্রতি জানাই সমবেদনা।