দাম ও ক্রেতার অভাবে কোরবানির পশুর চামড়া যখন নষ্ট হচ্ছে, তখনই চামড়াজাত পণ্য রপ্তানির উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের তথ্য জানাল রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে ১৬ শতাংশেরও বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে, যা দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রবৃদ্ধির প্রায় দ্বিগুণ।
ইপিবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের জুলাই মাসে দেশের দ্বিতীয় প্রধান রপ্তানি খাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ। মাসটিতে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে আয় হয়েছে ১০ কোটি ৬১ লাখ ডলার। এটি জুলাই মাসের রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ১৫ দশমিক ৪১ শতাংশ বেশি।
তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভর করে চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি রপ্তানি আয় হয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৮২ কোটি ৭০ লাখ ডলার। সেখানে রপ্তানি হয়েছে ৩৮৮ কোটি ৭৮ লাখ ৬০ হাজার ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেশি। আর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ দশমিক ৫৯ শতাংশ বেশি। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) গতকাল মঙ্গলবার পণ্য রপ্তানি আয়ের যে হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে জুলাই মাসের রপ্তানি আয়ের এমন চিত্র দেখা গেছে।
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জুলাই মাসে ৬১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে। অর্থাৎ, বাংলাদেশ থেকে চামড়ার বেল্ট, ব্যাগসহ অন্যান্য পণ্য রপ্তানির পরিমাণ গত বছরের জুলাই মাসে ১০০ টাকা হলে এবার হয়েছে ১৬১ টাকা। আর চামড়ার তৈরি জুতা রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৯ শতাংশের বেশি। তবে চামড়া রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার জুলাইয়ে ৩ শতাংশ কমেছে। ২০১৪ সালে হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের পর থেকেই চামড়া রপ্তানি কমছিল। ফলে দেশেও কোরবানির পশুর চামড়ার দর গত পাঁচ বছরে অর্ধেকের নিচে নেমে আসে। এবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গতবারের চেয়ে কাঁচা চামড়া কেনার দর না কমালেও সারা দেশে কোরবানির চামড়া বিক্রিতে ক্রেতা পাওয়া যায়নি। চট্টগ্রাম, সুনামগঞ্জ ও সাভারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কাঁচা চামড়া মাটিতে পুঁতে ও ফেলে দিয়ে নষ্ট করার ঘটনা ঘটে।
মূলত তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ভালো প্রবৃদ্ধি হওয়ার কারণে সামগ্রিক পণ্য রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তবে কৃষিপণ্য ও সিরামিক পণ্যে রপ্তানি আয় আগের বছরের তুলনায় কমেছে। গত মাসে ৩৩১ কোটি ৪ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এই আয় গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ এবং লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।
ইপিবির প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষে রপ্তানি আয় হয়েছে ৪ হাজার ৫৩ কোটি ৫০ লাখ ৪ হাজার ডলার। আর চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে সব ধরনের পণ্য রপ্তানিতে বৈদেশিক মুদ্রার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৫৫০ কোটি মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ১২ দশমিক ২৪ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছর প্রথম মাস জুলাইয়ে আয় এসেছে ৩৮৮ কোটি ৭৮ লাখ ৬ হাজার মার্কিন ডলার, লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ১ দশমিক ৫৯ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জুলাই মাসে রপ্তানি আয় অর্জিত হয়েছিল ৩৫৮ কোটি ১৪ লাখ ৮ হাজার ডলার। সে তুলনায় গত অর্থবছরের জুলাই মাসের তুলনায় রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
জানা যায়, দেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এই খাত থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে রপ্তানি আয় এসেছিল ৩ হাজার ৪১৩ কোটি ৩২ লাখ ডলার। আর চলতি অর্থবছরে এ খাত থেকে রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ হাজার ৮২০ কোটি ডলার। ২০১৯-২০ অর্থবছরের জুলাই মাসে তৈরি পোশাক খাতে পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩৩১ কোটি ৪ লাখ ডলার। এ হিসাবে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এ খাতে প্রবৃদ্ধি ৯ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আয় বেড়েছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। জুলাই মাসে নিট পোশাক রপ্তানি থেকে আয় এসেছে ১৬৭ কোটি ৮১ লাখ ৬০ হাজার ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের ৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে ওভেন পোশাক রপ্তানি করে আয় হয়েছে ১৬৩ কোটি ২৩ লাখ ২০ হাজার ডলার, যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ দশমিক ৫১ শতাংশ বেশি।
গত জুলাই মাস শেষে প্লাস্টিক পণ্যে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে ৩৭ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এ সময় আয় হয়েছে ১ কোটি ২৯ লাখ ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২ দশমিক ৬১ শতাংশ বেশি। গত জুলাই মাসে হোম টেক্সটাইল খাতে প্রবৃদ্ধি সামান্য বাড়লেও লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা কমেছে। এ সময় আয় এসেছে ৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার। চলতি অর্থবছরের জুলাই মাস শেষে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি আয়ে কিছুটা বেড়েছে। এ সময় এ খাত থেকে আয় এসেছে ৭ কোটি ৪৮ লাখ ৮০ হাজার ডলার। লক্ষ্যমাত্রা ছাড়ালেও এ সময় কাঁচা পাটে রপ্তানি আয় কমেছে ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ।
এদিকে ২০১৯-২০ অর্থবছরের জুলাই মাস শেষে কৃষিপণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ও লক্ষ্যমাত্রা কোনোটাই অর্জিত হয়নি। এ খাত থেকে আয় এসেছে ৭ কোটি ৭১ লাখ ৯০ হাজার ডলার। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রপ্তানি আয় কমেছে ১৮ শতাংশ। অন্যদিকে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি আয় কমেছে ২৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ। চলতি জুলাইয়ে হিমায়িত মাছ রপ্তানিতে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলেও আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সামান্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এছাড়া আগের বছরের তুলনায় চলতি জুলাইয়ে সিরামিক পণ্যে রপ্তানি আয় কমেছে ৮৪ শতাংশ।