ভয়ে ঘুম আসে না জজ মিয়ার

ভালো নেই দেশ-বিদেশে বহুল আলোচিত ব্যক্তি জজ মিয়া। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির সাজানো মামলায় বিনা দোষে দীর্ঘ পাঁচ বছর কারাগারে থাকা জজ মিয়ার দিন কাটছে অভাব-অনটনের মধ্যে। টাকার অভাবে মায়ের চিকিৎসা পর্যন্ত করাতে পারেননি। বোনের বিয়ের প্রস্তাব এলেও অর্থের অভাবে ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে। সরকারের পুনর্বাসন করে দেওয়ার কথা থাকলেও তা করেনি। সামনের দিনগুলো কীভাবে কাটবে তা নিয়ে অন্ধকার দেখছেন। ধানমন্ডিতে একটি প্রাইভেট অফিসে চাকরি করে কোনোরকমে সংসার চালাচ্ছেন তিনি। গত রবিবার দুপুরে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় নিজের বর্তমান জীবনের গল্প শোনান নোয়াখালীর সেনবাগ থানার বীরকোট এলাকার মোহাম্মদ জালাল ওরফে জজ মিয়া।

৩৯ বছর বয়সের জজ মিয়া চার ভাই ও এক বোনের মধ্যে মেজো। ঢাকার তেজগাঁওয়ের নাখালপাড়ায় বড় হয়েছেন তিনি। বাবার ভাঙ্গারি ব্যবসার সুবাদে পরিবারের সঙ্গে প্রথমে তিব্বত বস্তি পরে নাখালপাড়া নূরানী মসজিদের পাশে একটি বাসায় থাকতেন। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউস্থ আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে গ্রেনেড হামলার পর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি তাকে গ্রেপ্তার করে নাটক সাজায়। গত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসার পর পাল্টে যায় সব হিসাবনিকাশ। তার পর থেকেই জজ মিয়ার নাম দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। বিনা দোষে দীর্ঘ ৫ বছর কারাবাসের পর জামিনে মুক্ত হন জজ মিয়া। মামলার খরচ জোগান দিতে বিক্রি করতে হয়েছে বাবার রেখে যাওয়া ভিটেমাটিও। আতঙ্কে বাড়ি থেকে মা ও বোনকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। বেশ কিছুদিন শনিরআখড়ার সাইনবোর্ড এলাকায় থাকেন। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের চৌধুরীপাড়ায় ৫ হাজার টাকা বাসা ভাড়া দিয়ে থাকেন। যে কোম্পানিতে চাকরি করেন সেখান থেকে বেতন পান ১৫ হাজার টাকা। বোন মোরশেদা আক্তার ৭ হাজার টাকা বেতনে তৈরি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। দুই বছর আগে নোয়াখালীতে সুফিয়া বেগমকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে জাহানারা আক্তার সুমাইয়া নামে ৮ মাস বয়সী সন্তান আছে। ১৫ বছর আগে তার বাবা আব্দুর রশিদ মারা যান। বছর দেড়েক আগে মা জোবেদা খাতুনও মারা গেছেন চিকিৎসার অভাবে।

গত রবিবার দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারের পর কয়েক দফা রিমান্ডে নিয়ে তার ওপর ব্যাপক অত্যাচার করেছে পুলিশ। ক্রসফায়ার দিতে একদিন জঙ্গলেও নিয়ে গিয়েছিল। মিথ্যা সাক্ষী দিতে বারবার চাপ দেয় পুলিশ। জীবন বাঁচাতে রাজি হলে ক্রসফায়ার থেকে রক্ষা পান। রিমান্ড শেষ হলে কারাগারে পাঠানো হয়। দুই পায়ে ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে কনডেম সেলে রাখা হতো। খুব কষ্ট দিয়েছে ওরা।

জজ মিয়া বলেন, ওই সময় মতিঝিল শাপলা চত্বরের সামনে ফল বিক্রি করতাম। মাঝেমধ্যে স্টেডিয়াম মার্কেট এলাকায় পোস্টার বিক্রি করতাম। ২০০৫ সালের মে মাসে বাড়িতে যাই। ওই বছরের ৯ জুন গ্রামের চৌকিদার বাড়িতে এসে বলল, তোমার নামে থানায় মামলা আছে। সেনবাগ থানার এসআই কবির আসতেছে তোমার কাছে। তুমি এখানে বসে থাক। পরে পুলিশ এসে আমাকে থানায় নিয়ে যায়। এলাকার জামাল মেম্বার কবির দারোগাকে জিজ্ঞেস করেন, কী হয়েছে? কেন তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু দারোগা কোনো কথাই বলেননি। থানায় নেওয়ার পর কবির দারোগা বলেন, তোমার নামে এখানে কোনো মামলা নেই। ঢাকা থেকে সিআইডির এসপি রশিদ স্যার আসছেন। ঢাকায় তোমার নামে বড় মামলা আছে। পরে তার হাত ও চোখ বাঁধা হয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে মারধর শুরু করে পুলিশ। জজ মিয়া পুলিশের কাছে জানতে চানÑ কেন আমাকে মারা হচ্ছে। তখন পুলিশ বলছিলÑ তুই এত বড় হামলা চালিয়ে গ্রামে এসে লুকিয়ে আছিস। তুই আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালিয়েছিস। বারবার বলার পরও পুলিশ তার কোনো কথা শোনেনি। পরদিন সকালে ঢাকায় সিআইডি কার্যালয়ে আনা হয়। সেখানে আবদুর রশীদ ও রুহুল আমিন স্যার আমাকে বলেন, আমরা যা বলি তাই হবে। আমাদের কথা না শুনলে তোরে ক্রসফায়ারে দেব। আর কথা শুনলে তোরে বাঁচাইয়া আনব। তোর ফ্যামিলিকে মাসে আড়াই হাজার টাকা করে দেওয়া হবে।

কঠোর নির্যাতনের কথা স্মরণ করে জজ মিয়া বলেন, গ্রেনেড হামলার কথায় রাজি না হলে পুলিশ আমার ওপর নানা কায়দায় নির্যাতন করে। ফ্যানের সাথে ঝোলানো হয়। আরও কত কী! নির্যাতনের পরপরই আমাকে হামলার ভিডিও ফুটেজ দেখানো হয়। সিআইডির এসএস রুহুল আমিন আমাকে বললেনÑ তুই নিজে বাঁচ, পরিবারকে বাঁচা, আমাদেরও বাঁচা। ঘটনা স্বীকার করলে তোকে কারাগার থেকে বের করে আনা হবে। তোকে রাজসাক্ষী করা হবে। একপর্যায়ে নিজের জীবনের মায়ায় ও পরিবারের কথা চিন্তা করে দায় স্বীকারের সিদ্ধান্ত নেই। সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা পুলিশকে জানালে তারা একটি কাগজে জবানবন্দি লিখে মুখস্থ করতে বলে।

জজ মিয়া জানান, ১৭ দিন রিমান্ডে থাকাকালীন ওই জবানবন্দি মুখস্থ করেন। পরে আদালতে সন্ত্রাসী রবিন, শফিক, বকুল, হাশেম, লিংকন, আনু, মুকুল, সুব্রত বাইন, জাহিদ, জয় ও মোল্লা মাসুদকে জড়িয়ে জবানবন্দি দেন। ওই জবানবন্দিতে বলা হয়Ñ হামলায় নেতৃত্ব দেয় বাড্ডার সন্ত্রাসী মুকুল। জজ মিয়া বলেন, কাশিমপুর কারাগারে থাকাকালীন এসপি রুহুল আমিন ও এএসপি রশিদ একাধিকবার আমার সাথে দেখা করেন। তারা বলেন, জবানবন্দিতে যা বলেছিস তা যেন ঠিক থাকে পরবর্তী সময়ে। ওই সময় মোবাইল ফোনে মায়ের সাথে কথা বলার সুযোগ করে দেন তারা। আমাকে কনডেম সেলে রাখত সার্বক্ষণিক। সব সময় ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে রাখত। রুম থেকে বের হতে দিত না। কারও সঙ্গে দেখা করতে পারতাম না। তিনবার খাবার দিত। মামলার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তারা আমার মাকে বলেছিলেন, আপনার ছেলের বিষয়ে কোনো চিন্তা করবেন না। সাক্ষ্য দেওয়ার পর তাকে বিদেশ পাঠিয়ে দেওয়া হবে। যতদিন সাক্ষ্য শেষ না হচ্ছে ততদিন আপনার সংসার চালাতে টাকা দেওয়া হবে।

জজ মিয়া বলেন, আমি তো কোনো অপরাধী ছিলাম না। কেন আমার মতো একটি ছেলেকে তারা গ্রেনেড হামলার আসামি করে ফেলল। এখনো আমার ভয় কাটছে না। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময়ও ভয় করেÑ কখন জানি কে আমার ক্ষতি করে দেয়। এখন আমার অনেক শত্রু। আমাকে মেরে ফেলতে পারে। সেই নির্যাতনের কথা মনে পড়লে গা শিউরে ওঠে। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর জজ মিয়া নামে নিজেকে পরিচয় দিচ্ছি না।

জজ মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, গ্রেনেড হামলা মামলায় রায় হওয়ার কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করি। উনাকে নির্যাতনের কথা বলি। আমাকে সান্ত¡না দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, তোমাকে পুনর্বাসন করা হবে। সরকার সব ধরনের সহায়তা করবে। কিন্তু আজও আমাকে পুনর্বাসন করা হয়নি। ৩ মাস আগে আবারও প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে নোয়াখালীর স্থানীয় সাংসদের মাধ্যমে আবেদন করেছি। কিন্তু কোনো সাড়া পাচ্ছি না। খুব কষ্টে যাচ্ছে দিন। টাকার জন্য বোনের বিয়ে দিতে পারছি না। মায়ের চিকিৎসা পর্যন্ত করাতে পারিনি। বিএনপি-জামায়াত সরকার আমার জীবনটা এলোমেলো করে দিয়েছে। যাদের ফাঁসির রায় হয়েছে তা যেন দ্রুত কার্যকর করা হয়। আর সরকার যেন আমার দিকে তাকায়। যেন পরিবার নিয়ে বাকি জীবনটা সুন্দরভাবে কাটিয়ে দিতে পারি।