শিশু আইন ও আদালত নিয়ে নিম্ন আদালত এবং হাইকোর্টে বিচারিক বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে বলে মন্তব্য হাইকোর্টের। আদালতের প্রত্যাশা, শিশু আইনের সাংঘর্ষিক অবস্থা, অসংগতি ও বিভ্রান্তি দূর করতে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেবে। এ লক্ষ্যে সাতটি নির্দেশনাও দিয়েছে হাইকোর্ট।
২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে পুরান ঢাকার লালবাগে একটি হত্যা মামলার আসামি হৃদয়ের জামিন সংক্রান্ত রায়ে এমন অভিমত, পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা দেয় বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ। রায়টি গতকাল বুধবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়। ১৭ পৃষ্ঠার মূল রায়টি লেখেন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি; এতে একমত পোষণ করেন কনিষ্ঠ বিচারপতি।
গত ১ আগস্ট হৃদয়কে জামিন দেয় হাইকোর্টের একই বেঞ্চ। এ হত্যা মামলায় গত বছর ৯ অক্টোবর হৃদয়কে ১৯ বছর দেখিয়ে পুলিশ ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠায় ও রিমান্ডে নেয়। পরে ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ হৃদয়ের বয়স নির্ধারণপূর্বক তাকে শিশু হিসেবে গণ্য
করে জামিন নামঞ্জুর করে টঙ্গীর জাতীয় কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠিয়ে দেয়। এরপর আইনজীবীর মাধ্যমে জামিনের জন্য হাইকোর্টে আবেদন করে হৃদয়।
শিশু আইন ও আদালত নিয়ে রায়ে হাইকোর্ট বলে, ‘দৈনন্দিন বিচারিক কাজের অভিজ্ঞতার আলোকে এ কথা উচ্চারণে আমাদের দ্বিধা নেই যে, শিশু আইন ও আদালত নিয়ে বর্তমানে নিম্ন আদালত ও হাইকোর্ট বিভাগে এক ধরনের বিচারিক বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে।’
আদালতের অভিমত, ‘এ ধরনের বিভিন্নমুখী প্রবণতার মূল কারণ শিশু আইনে ধারা ১৫ ক এবং ১৬(৩)-এর সংযোজন। কারণ এ দুটি ধারা অনুযায়ী ম্যাজিস্ট্রেট কর্র্তৃক অপরাধ আমলে নেওয়ার পর শিশু আদালতে মামলার নথি না পাঠানো পর্যন্ত শিশু আদালত কোনো অপরাধ বিচারার্থে গ্রহণ করতে পারবে না।’
হাইকোর্ট বলে, ‘নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনালগুলোর মধ্যে এ সংশয় হয়তো কাজ করে যে, অপরাধ আমলে নেওয়ার আগে শিশু আদালত হিসেবে এখতিয়ার প্রয়োগের কোনো সুযোগ নেই। এ ধারণা একেবারে অবান্তর ও ভিত্তিহীন। কারণ শিশু আইনের ধারা ২১, ২৯ ও ৫২-এর বিধানগুলো লক্ষ করলে এটা সুস্পষ্ট হবে যে, বিদ্যমান আইনেই শিশু আদালতকে বিচার পূর্ববর্তী অবস্থায় অর্থাৎ অপরাধ আমলে নেওয়ার আগে শিশুর বয়স, জামিন এবং হেফাজত সংক্রান্ত বিষয় নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে এবং একজন শিশুকে গ্রেপ্তার-পরবর্তী ২৪ (চব্বিশ) ঘণ্টা সময়ের মধ্যে নিকট শিশু আদালতে উপস্থাপনের নির্দেশনা রয়েছে।’
রায়ে আদালত বলে, ‘শিশু আইনে সাংঘর্ষিক অবস্থা, বিদ্যমান অসংগতি, অস্পষ্টতা ও বিভ্রান্তি অবিলম্বে দূর করা প্রয়োজন এবং আদালত এটাও প্রত্যাশা করে যে, এ লক্ষ্যে সরকার স্বল্পতম সময়ের মধ্যে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’ সরকার শিশু আইন সংশোধন অথবা শিশু আইন, ২০১৩-এর ধারা ৯৭-এর বিধান মূলে গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা অস্পষ্টতা ও অসংগতি দূর করতে পারে বলেও অভিমত দিয়েছে হাইকোর্ট।
এছাড়া এই রায়ের অনুলিপি প্রয়োজনীয় অবগতি ও ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট আদালত/ট্রাইব্যুনালসহ সমাজকল্যাণ ও আইন সচিব এবং সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
সাত নির্দেশনা : ১. সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট কেবলমাত্র মামলার তদন্ত কার্যক্রম তদারকি করবেন এবং এ সংক্রান্ত নিত্যনৈমিত্তিক প্রয়োজনীয় আদেশ এবং নির্দেশনা প্রদান করবেন।
২. রিমান্ড সংক্রান্ত আদেশ শিশু আদালতেই নিষ্পত্তি হওয়া বাঞ্ছনীয়। তবে আইনের সংস্পর্শে আসা শিশু (ভিকটিম ও সাক্ষী) বা আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত শিশুর জবানবন্দি সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট লিপিবদ্ধ করতে পারবেন।
৩. তদন্ত চলাকালীন সময়ে আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত শিশুকে মামলার ধার্য তারিখে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজিরা হতে অব্যাহতি দেওয়া যেতে পারে।
৪. তদন্ত চলাকালে আইনের সঙ্গে সংঘাতে জড়িত শিশুর রিমান্ড, জামিন, বয়স নির্ধারণসহ অন্তর্বর্তী যেকোনো বিষয় শিশু আদালত নিষ্পত্তি করবে এবং এ সংক্রান্ত যেকোনো দরখাস্ত ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দাখিল হলে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট নথিসহ ওই দরখাস্ত সংশ্লিষ্ট শিশু আদালতে প্রেরণ করবেন এবং সংশ্লিষ্ট শিশু আদালত এ বিষয়টি নিষ্পত্তি করবে।
৫. অপরাধ আমলে নেওয়ার আগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল শিশু আইনের অধীনে কোনো আদেশ প্রদানের ক্ষেত্রে ‘শিশু আদালত’ হিসেবে আদেশ প্রদান করবে এবং এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞ বিচারক শিশু আদালতের বিচারক হিসেবে কার্যপরিচালনা এবং শিশু আদালতের নাম ও সিল ব্যবহার করবেন।
৬. আইনের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতি হলো এই যে, আইন মন্দ বা কঠোর হলেও তা অনুসরণ করতে হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত তা সংশোধন বা বাতিল না হয়। সে কারণে নালিশি মামলার ক্ষেত্রে শিশু কর্র্তৃক বিশেষ আইনগুলোর অধীনে সংঘটিত অপরাধ সংশ্লিষ্ট বিশেষ আদালত বা ক্ষেত্রমতো ট্রাইব্যুনাল শিশু আইনের বিধান ও অত্র রায়ের পর্যবেক্ষণের আলোকে অভিযোগ গ্রহণের পর প্রয়োজনীয় আইনি কার্যক্রম গ্রহণের পরে অপরাধ আমলে গ্রহণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য নথি সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট প্রেরণ করবে, এরপর ম্যাজিস্ট্রেট অপরাধ আমলে গ্রহণের বিষয়ে প্রয়োজনীয় আদেশ প্রদান এবং অপরাধ আমলে গ্রহণ করলে পরবর্তীতে নথি বিচারের জন্য শিশু আদালতে প্রেরণ করবেন।
৭. শিশু আইনের প্রাধান্যতার কারণে বিশেষ আইনগুলোর অধীনে জি.আর মামলার ক্ষেত্রে শিশু কর্র্তৃক সংঘটিত অপরাধের জন্য পৃথক পুলিশ রিপোর্ট দেওয়ার বিধান থাকায় সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশ রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে অপরাধ আমলে গ্রহণ করবেন।