ডাকলেও আসে না সিটি করপোরেশন

মশা-লার্ভা ধ্বংস চলছে ব্যক্তিগত উদ্যোগে

দেশি-বিদেশি কীটতত্ত্ববিদ ও সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপ রাজধানীর যেসব স্থানকে এডিস মশার প্রজননের জন্য উপযুক্ত বলে চিহ্নিত করেছে সেসব স্থানে এডিস মশা নিধন ও লার্ভা ধ্বংসে দুই সিটি করপোরেশনের তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। মাঝেমধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোর ডাকে সেখানে করপোরেশনের মশক নিধন দল গেলেও পরে আর কোনোই খোঁজ রাখেন না তারা। ফলে বাধ্য হয়ে ডেঙ্গু থেকে রক্ষা পেতে এসব স্থানে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোই নিজ উদ্যোগে এডিস মশা নিধনে কাজ করছে।

গতকাল বুধবার সরেজমিনে ডেঙ্গুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এমন বেশ কয়েকটি স্থানে ঘুরে এ চিত্র পাওয়া গেছে। এর বাইরে এমন  

 কিছু স্থানের খোঁজ মিলেছে, যেখানে মশা নিধনে এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। মশার প্রচুর লার্ভা দেখা গেছে। এর মধ্যে একটি স্থানের এক পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ও আরেক স্থানের এক নিরাপত্তাকর্মীর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এমনকি মশার অত্যাচারে অতিষ্ঠ এসব স্থানের কর্মীরা ডেঙ্গু আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশে এসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের প্রধান কীটতত্ত্ববিদ ডা. ভূপেন্দর নাগপাল ১৯টি স্থানকে এডিসের প্রজননের জন্য উপযুক্ত স্থান হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেছেন, এডিস মশা সবচেয়ে বেশি থাকে সরকারি পরিবহন পুলে। এর পরপরই এডিস থাকে হাসপাতালের নিচে খোলা জায়গায়, ছাদে, পরিত্যক্ত যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্রে। এরপর বেশি থাকে পুলিশের পরিবহন পুলে ও আটকের পর পুলিশ যেখানে বিভিন্ন ধরনের যানবাহন স্তূপ করে রাখে। এ ছাড়া বিমানবন্দরের চৌবাচ্চা ও রানওয়ের আশপাশে, পার্ক, নার্সারি, ফোয়ারা, সিভিল ডিপার্টমেন্টের নির্মাণাধীন ভবনে। সরকারি অফিসগুলোতে এডিসের বিস্তার বেশি। এ ছাড়া বাসাবাড়ির গ্যারেজে, বাড়ির মূল ফটকের লোহার গেটের ফাঁকে, পরিত্যক্ত কমোডে, বিদ্যুতের তার আটকানোর সরঞ্জামাদিতে মশা ডিম পাড়ে।

এর আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বর্ষা মৌসুমের এডিস মশার জরিপ করে। গত জুলাইয়ে শেষ হওয়া সে জরিপ অনুযায়ী, মহানগরীর গাবতলী বাস টার্মিনাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মিরপুর-১২ নম্বর বিআরটিসি বাস ডিপোর ৬০-৮০ শতাংশ পাত্রে মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। আর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কমলাপুর বিআরটিসি বাস ডিপো, কমলাপুর রেলওয়ে কলোনি, মহাখালী বাস টার্মিনাল ও শাহজাদপুর বস্তিতে যত্রতত্র ফেলে রাখা জমাট পাত্রের ৮০ শতাংশের মধ্যে লার্ভা মিলেছে। এ ছাড়া ওই জরিপে সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল, কড়াইল বস্তি, মেট্রোরেল প্রকল্প এলাকার উন্নয়ন স্পটের ২০-৬০ শতাংশ জমাট পানিতে মশার লার্ভা মিলেছে।

গতকাল বুধবার সরেজমিনে ঘুরে ডেঙ্গুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে এখন পর্যন্ত দুই সিটি করপোরেশনকে মশা নিধন ও লার্ভা ধ্বংসে কাজ করতে দেখেননি বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানের লোকজন। এর মধ্যে রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানার পুলিশ সদস্যরা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ায় নিজ উদ্যোগেই থানা ও আশপাশের ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করছেন। ছিটানো হচ্ছে মশক নিধন স্প্রে। এ ছাড়া থানার পেছনের ডাম্পিংয়ের গাড়িগুলোর মধ্যে জমে থাকা পানি ও এসির পানিও জমতে দিচ্ছেন না তারা। গতকাল সকালে সরেজমিনে একজন পুলিশ অফিসারকে কয়েকজন যুবককে নিয়ে থানার পেছনের ডাম্পিং এলাকা পরিষ্কার করতে দেখা গেছে। এ ব্যাপারে থানার ডিউটি অফিসার বুলবুল আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সিটি করপোরেশনের লোকজন না আসায় এখন আমরা নিজেদের উদ্যোগে মশা নিধনে নেমেছি। মশার ওষুধ ছিটাতেও তাদের খবর দিয়ে নিয়ে আসতে হয়। ইতিমধ্যে আমাদের কয়েকজন অসুস্থ হয়েছেন। তবে বর্তমানে কেউ ডেঙ্গু আক্রান্ত নেই।

কিছুদিন আগেও পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালের পেছনের রিকশা গ্যারেজে ভাঙাচোরা রিকশা, পরিত্যক্ত টায়ার ও খানাখন্দে পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। মশার বিচরণ ক্ষেত্র ছিল। গতকাল সরেজমিনে গিয়ে গ্যারেজটি পরিষ্কার দেখা গেছে। সেখানকার রিকশাচালক ও গ্যারেজমালিক নিজ উদ্যোগে পানি জমে এডিসের লার্ভা জন্মাতে পারে এমন জিনিসপত্র সরিয়ে ফেলেছেন। ওই গ্যারেজের রিকশাচালক জাহাঙ্গীর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা নিয়মিত এখানে পরিষ্কার রাখি। কোনোভাবেই পানি জমতে দেই না। তবে মশার ওষুধ ছিটানো হয় না। সিটি করপোরেশনও কখনো এসেছে বলে দেখিনি। দুই-তিন দিন আগে পাশের গলিতে মশার ওষুধ দেওয়া মেশিনের শব্দ শুনেছি। আমাদের এখানে আসেনি।

তবে কিছু কিছু স্থানে এখনো কয়েক দিনের জমে থাকা পরিষ্কার পানি ও ময়লা-আবর্জনা দেখা গেছে। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে শেরেবাংলা নগর থানার মূল ফটকের সামনেই চোখে পড়ে বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে আবর্জনা, জব্দ করা পুরনো গাড়ি। পড়ে আছে  মরিচা ধরা পুরনো প্রাইভেট কার ও কাভার্ড ভ্যান। এসবের নিচেই ডাবের খোসা, পানির বোতল। স্থানীয়রা জানান, গাড়ি, ডাবের খোল, বোতলসহ অব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিস থানা চত্বরে খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকে। বৃষ্টি হলেই এতে পানি জমছে। এগুলো কেউ পরিষ্কার করে না।

তবে শেরেবাংলা নগর থানার ওসি জানে আলম মুন্সি দাবি করেন, নিয়মিত এসব জায়গা পরিষ্কার করা হয়। এই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সিটি করপোরেশনের লোকজন না এলেও আমরা তাদের কাছ থেকে মশক নিধন ওষুধ এনে নিজেরাই দিচ্ছি। জব্দ করা গাড়ির পাশে অনেকের ব্যক্তিগত গাড়িও রয়েছে। এসব গাড়িতে যেন এডিস মশা জন্মাতে না পারে তার জন্য নিয়মিত পরীক্ষা করে ওষুধ দেওয়া হয়।

একই চিত্র দেখা যায় আগারগাঁও পুরান থানার ডাম্পিং স্টেশনে। পুরো ডাম্পিং স্টেশনে অর্ধশত সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও শতাধিক পুরনো মোটরসাইকেল রাখা। স্তূপ করে রাখা কয়েক বছরের পুরনো ভাঙা গাড়ি। বৃষ্টি হলেই এসব ভাঙা গাড়িতে পানি জমছে। এ বিষয়ে ডাম্পিং স্টেশনের ইনচার্জ আনিসুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের এখানে গাড়ি জমে থাকলেও মশা জন্মানোর সুযোগ নেই। আমরা প্রতিনিয়ত এসব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে ওষুধ দিই। সিটি করপোরেশনের লোকজন হঠাৎ দেখা যায়। আমরা নিজেদের উদ্যোগে ডাম্পিং স্টেশনের সামনের ড্রেনের আবর্জনা পরিষ্কার করেছি।

অবশ্য ডাম্পিং স্টেশনের পেছনে বিটিসিএলের নির্মাণাধীন ভবনের বেজমেন্টে পরিষ্কার পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। পানিতে মশার লার্ভা গিজগিজ করছে। ঈদের বন্ধ থাকায় এই পানি পরিষ্কার করা হচ্ছে না বলে জানালেন ভবনের এক কর্মী। তবে প্রজেক্ট ম্যানেজার মশিউর রহমান দাবি করেছেন, কাজ বন্ধ থাকলেও প্রতিদিন পাম্প মেশিন দিয়ে পানি পরিষ্কার করা হয়। তবে পানি পরিষ্কারের কোনো আলামত চোখে পড়েনি।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও রমনা পার্কে প্রচুর মশা দেখা গেছে। এখানকার নিরাপত্তাকর্মীরা জানিয়েছেন, মশার কামড়ে তারা খুব আতঙ্কে রয়েছেন। পার্ক দুটির ভেতরে ঘাস ও গাছপালাগুলো নিজ উদ্যোগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখেন। সিটি করপোরেশন থেকে মশক নিধনে না আসায় তারা নিজেরা মশা নিধনে নেমেছেন। এর মধ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আনসার সদস্য পলাশ আলী ডেঙ্গুজ¦রে আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত ২২ জুলাই সকালে হঠাৎ জ্বর আসে। ওইদিন বিকেলে ফুলবাড়িয়া কর্মচারী হাসপাতালে ডাক্তার দেখিয়ে ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হয়। ফল পজিটিভ আসায়  চিকিৎসার জন্য গ্রামের বাড়িতে চলে যাই। মাগুরা সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হলে কয়েক দিন পর সুস্থ হয়ে ঢাকাতে আসি। তবে এখনো শরীর অনেক খারাপ।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের আরেক নিরাপত্তাকর্মী সুনু মিয়া বলেন, চারুকলা ইনস্টিটিউটের গেটে ডিউটিরত অবস্থায় দিনে-রাতে মশার কামড়ে বসা যায় না। পাশে শাহবাগ থানার গাড়ি ডাম্পিংয়ের স্থানে অনেক জঙ্গল। তার পাশ ঘেঁষে একটা নার্সারিও আছে। আমরা সব সময় ডেঙ্গু আতঙ্কে থাকি। আমাদের এই উদ্যানে ৫০ জন আনসার ও ৪০ জন পিডব্লিউডি কর্মচারী ডেঙ্গুঝুঁকি নিয়েই সব সময় কাজ করছি। এখানে সিটি করপোরেশন থেকে কখনই মশা নিধনে বা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে লোক আসে না। আমরাই করি।

রমনা পার্কের এক পরিচ্ছন্নতাকর্মীর ডেঙ্গুতে মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পার্কের নিরাপত্তাকর্মী রবিউল আলম বলেন, ঈদের তিন দিন আগে আমাদের একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী রাসেলের জ্বর হয়। পরের দিন গোপালগঞ্জে তার গ্রামের বাড়িতে চলে যায়। পরীক্ষা করে ডেঙ্গুজ¦র ধরা পড়ায় সেখানের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি হয়। ঈদের দিন জানতে পারি সে মারা গেছে। এই পার্কের ভেতরে কখনো পানি জমাট বাঁধতে দেই না, কিন্তু মশা। মশার কামড়ে কোথাও বসা যায় না। সিটি করপোরেশন থেকে যদি এখানে মশক নিধন ওষুধ দেওয়া হয় তাহলে কিছুটা কমবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রধান কীটতত্ত্ববিদ ডা. খলিলুর রহমান অবশ্য মশা নিধনে দুই সিটি করপোরেশনের বর্তমান কাজে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা জরিপের তালিকা সিটি করপোরেশনকে দিয়েছি। তারা কাজ করছে। তবে হাসপাতাল ও রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের নিজ উদ্যোগে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করতে হবে। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নির্দেশ দিয়েছেন। শুধু ওষুধ ছিটাবে সিটি করপোরেশন। আমরা সিটি করপোরেশনের মশা নিধনের কাজ পর্যবেক্ষণ করছি। এখন পর্যন্ত সন্তোষজনক। এলাকায় এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারাও কাজ করছে। তবে ৪-৫ দিন পরপর লার্ভা ধ্বংস ও প্রজনন স্থান নষ্ট করতে হবে। তা না হলে লার্ভা থেকে অ্যাডাল্ট হয়ে মশা বের হয়ে আসবে। বর্তমান আবহাওয়াও এডিসের প্রজননের জন্য উপযুক্ত।

এ ব্যাপারে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডা. মীর মুস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডিএসসিসি মশক নিধনে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। মশার প্রজনন স্থানসহ উড়ন্ত মশা নিধন করা হচ্ছে। হাসপাতাল, বাস টার্মিনাল, নির্মাণাধীন ভবন, বাসাবাড়ির ভেতর ও ছাদ পরিদর্শন করে মশার লার্ভা বা প্রজনন স্থান নষ্ট করা হচ্ছে। আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত আমাদের কার্যক্রম চলমান থাকবে।

একইভাবে ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল হাই বলেন, মশা নিধন ও লার্ভা ধ্বংসে এলাকার প্রতিটি ওয়ার্ডকে ১০ ভাগে ভাগ করে স্থানীয়দের অন্তর্ভুক্ত করে চিরুনি অভিযান শুরু করা হয়েছে। সেই অভিযানে যেসব বাসাবাড়িতে মশার লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে সেখানে ‘এই বাড়ি/স্থাপনায় এডিসের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে’ শীর্ষক স্টিকার লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে ও জরিমানা করা হচ্ছে।