জমি বেহাত নিয়ে সংসদীয় কমিটির বক্তব্য সঠিক নয় বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেড (মিল্ক ভিটা) কর্র্তৃপক্ষ। গতকাল বুধবার সকালে জেলার শাহজাদপুরে সমবায়ী কৃষকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা কমিটির পরিচালক আব্দুস সামাদ ফকির। তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু মিল্ক ভিটার নামে কোনো খাস জমি বরাদ্দ দেননি। মিল্ক ভিটার নিজস্ব কোনো জমিও নেই। তবে ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু মিল্ক ভিটার আওতাভুক্ত সমবায়ী কৃষকদের গোখাদ্য উৎপাদনে খাস জমি বরাদ্দের ব্যবস্থা করেছিলেন। যেটা সরকারের কাছ থেকে মিল্ক ভিটা লিজ নিয়ে তাদের বরাদ্দ দিয়ে থাকে। ওইসব জমির বেশ কিছু অংশ ব্যক্তিমালিকানা দাবি করে মামলা হয়েছে। এসব মামলা পরিচালনার জন্য মিল্ক ভিটার পক্ষ থেকে আইনজীবী নিয়োগ করা আছে। ইতিমধ্যেই বেশ কিছু জমি উদ্ধারও করা হয়েছে।’
সরকারের মালিকানাধীন সমবায় প্রতিষ্ঠানটিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া পাঁচ হাজার একর গো-চারণ ভূমির মধ্যে বেদখল হওয়া চার হাজার একর জমি উদ্ধারে প্রতিষ্ঠানটির কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেই জানিয়ে গত মঙ্গলবার ক্ষোভ প্রকাশ করে সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কমিটির পক্ষ থেকে ওই জমি উদ্ধারে মিল্ক ভিটাকে ব্যবস্থা নিতেও বলা হয়। এছাড়া বৈঠকে মিল্ক ভিটার চেয়ারম্যান শেখ নাদির হোসেন লিপু উপস্থিত না থাকায় অসন্তোষ প্রকাশ করে কমিটি।
এ বিষয়ে মিল্ক ভিটা বাঘাবাড়ী কারখানার উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) ডা. ইদ্রিস আলী বলেন, ‘সংসদীয় কমিটি যে জমি বেদখলের কথা বলছে, তা সঠিক নয়। কারণ ওইসব সম্পত্তি মিল্ক ভিটার নিজস্ব সম্পত্তি নয়। ওগুলো সরকারের খাস সম্পত্তি। মিল্ক ভিটা সরকারের কাছ থেকে লিজ নিয়ে সেগুলো সমিতিভুক্ত সমবায়ী কৃষকদের মাঝে ঘাস উৎপাদনে বণ্টন করে থাকে। এর মধ্যে যেসব জমি মালিকানা দাবি করে মামলা করা হয়েছে, সেসব জমি উদ্ধারে মিল্ক ভিটার পক্ষ থেকে মামলা পরিচালনার জন্য একজন আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া আছে। এরই মধ্যে বেশ কিছু জমি উদ্ধারও করা হয়েছে।’
মিল্ক ভিটার মানসম্পন্ন দুগ্ধ উৎপাদনে করণীয় বিষয়ে গতকাল শাহজাদপুরের পোতাজিয়া দুগ্ধ উৎপাদনকারী প্রাথমিক সমবায় সমিতি কার্যালয়ে এ মতবিনিময় সভা হয়। এতে সমিতি পর্যায়ে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে গবাদি প্রাণী লালন-পালন, দুগ্ধ দোহন, পরিবহন, মানসম্পন্ন গো-খাদ্য খাওয়ানো, অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ও করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। মিল্ক ভিটা ব্যবস্থাপনা কমিটির পরিচালক আব্দুস সামাদ ফকিরের সভাপতিত্বে এতে প্রধান আলোচক ছিলেন শাহজাদপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মিজানুর রহমান। এতে আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) বাঘাবাড়ী শাখার বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শিহা আলম, মিল্ক ভিটার বাঘাবাড়ী কারখানার ডিজিএম ডা. ইদ্রিস আলী, পোতাজিয়া দুগ্ধ উৎপাদনকারী প্রাথমিক সমবায় সমিতির সভাপতি ওয়াজ আলী, আলমগীর জাহান বাচ্চু প্রমুখ।
এ বিষয়ে বাঘাবাড়ী মিল্ক ভিটা সমিতি বিভাগের ব্যবস্থাপক অমীয় কুমার মণ্ডল বলেন, ‘সংসদীয় কমিটি যে জমির কথা বলছে, তা সঠিক নয়। এ সম্পত্তি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জমিদারির অংশ ছিল। ১৯৫৪ সালে জমিদারি বিলুপ্ত হলে প্রজারা যে যার মতো পত্তনি নিয়ে এসএ রেকর্ডে মালিক হয়ে যায়। ১৯৬৫ সালে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধের পর পাকিস্তান সরকার এসব সম্পত্তি শত্রু সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, ১০০ বিঘার ওপরের সম্পত্তি সরকারের কাছে অর্পণ করতে হবে। এসব সম্পত্তি ১৯৭৭-৭৮ সালে অর্পিত-সমর্পিত সম্পত্তি হিসেবে আরএস রেকর্ড হয়। এ সময়ও যে যার মতো যেভাবে পেরেছে নিজেদের নামে রেকর্ড করে নিয়েছে। বাকি জমি বাথানল্যান্ড হিসেবে আরএস, এসএ রেকর্ড হয়েছে। এসব বাথানল্যান্ডের বেশ কিছু জমি প্রভাবশালীরা জাল দলিল ও ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে নিজেদের নামে রেকর্ড দেখিয়ে দখল করে। এতে বাথান ভূমির পরিমাণ দাঁড়ায় ৮০০ থেকে ৮৫০ একর।
তিনি বলেন, ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু বাঘাবাড়ীতে মিল্ক ভিটা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮৩ সালে তৎকালীন সরকারপ্রধান এইচএম এরশাদ মিল্ক ভিটার আওতাভুক্ত কৃষকদের নিয়ে কৃষক সমাবেশ করেন। ওই সময় কৃষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মিল্ক ভিটার ব্যবস্থাপনায় ওই জমি বার্ষিক ফি’র মাধ্যমে লিজ দেওয়া হয়। অপরদিকে ভুয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে আদালতে কনটেস্ট করে মিল্ক ভিটা বেশ কিছু জমি উদ্ধারের পর এ সম্পত্তির পরিমাণ বর্তমানে ১৩৫০-১৩৬০ একর হয়েছে; যা এখন মিল্ক ভিটার মাধ্যমে কৃষকদের মাঝে বরাদ্দ অব্যাহত আছে। তিনি আরও বলেন, সংসদীয় কমিটি মিল্ক ভিটার নামে ৫ হাজার একর জমি কোথায় পেল তা তার জানা নেই। অচিরেই এ বিষয়ে পত্রপত্রিকার মাধ্যমে প্রতিবাদ জানানো হবে।