সমাজ বদলের ক্রান্তিকাল বলেই অপরাধ এত বেশি

অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান স্বনামখ্যাত অপরাধ বিশেষজ্ঞ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার হাত ধরেই ২০১৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষা কার্যক্রম চালু হয়। অধ্যাপনার পাশাপাশি অপরাধ, শ্রমসম্পর্ক ও শ্রমিক আন্দোলন, সামাজিক-আন্দোলন, নগর গবেষণা, রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ বিষয়ে গবেষণা এবং লেখালেখি করছেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করার পর কানাডার ক্যালগ্যারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স এবং পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য এবং শিক্ষক সমিতির দুবারের নির্বাচিত যুগ্ম সম্পাদক তিনি। সম্প্রতি গণপিটুনিতে হত্যা, ধর্ষণ, শিশু ধর্ষণ এবং স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায় ছাত্রছাত্রীদের ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়ন নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আহমেদ মুনীরুদ্দিন

দেশ রূপান্তর : সম্প্রতি আমরা দেশে একের পর এক গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনা ঘটতে দেখছি। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী ২০১১ সাল থেকে ২০১৯ সালের জুন মাস পর্যন্ত সাড়ে আট বছরে সারা দেশে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে মোট ৮২৬ জনকে। এর মধ্যে চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত গণপিটুনিতে ৩৬ জনকে হত্যা করা হয়েছে। গুজবকে কেন্দ্র করে গণপিটুনির মতো সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার কারণ কী বলে মনে করেন?

জিয়া রহমান : সব অপরাধকে এক পাল্লায় মেপে বিচার করা যাবে না। গুজবের কারণে গণপিটুনি এবং তার ফলে হত্যা বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। আমাদের সমাজে এটা একটা ট্র্যাডিশনাল ক্রাইম। এতে নতুন কোনো ডাইমেনশন নেই। যে সমাজে আধুনিক বিদ্যাশিক্ষার আলো ছড়ায়নি। যেখানে এখনো মানুষ ধর্মীয় কুসংস্কার, ঝাড়ফুঁক-তুকতাকে বিশ্বাস করে সেখানে গুজবের মতো ঘটনা দ্রুত ছড়াবে এটাই স্বাভাবিক। পদ্মা সেতুতে শিশুর মাথা লাগবে এমন গুজব তাই এখানে দ্রুত ছড়িয়েছে এবং এর ফলে অনেকগুলো নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটেছে এটা দুঃখজনক। তবে, এখানে একটা বিষয় লক্ষণীয় যে, আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয় না এবং বিচার বিভাগও এর দ্রুত বিচার করতে পারে না। এই দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে।

দেশ রূপান্তর : সমাজে এখন প্রায়শই নানা ধরনের সহিংসতার বিস্তার ঘটতে দেখা যাচ্ছে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হত্যা। নানারকম নৃশংস অত্যাচার-নিপীড়নের মাধ্যমে হত্যা। ছেলের হাতে মা খুন হচ্ছে, বাবার হাতে মেয়ে খুন হচ্ছে, সন্তানকে হত্যা করে মা বা বাবা আত্মহত্যা করছে। পারিবারিক পরিসর থেকে সামাজিক পরিসরে এমন নানা সহিংস অপরাধের ঘটনা নিয়মিতভাবেই গণমাধ্যমের শিরোনাম হচ্ছে। কোনো সামাজিক অস্থিরতার কারণে কি এসব ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে?

জিয়া রহমান : আমাদের সমাজ এখন একটা ক্রান্তিকালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সমাজ যখন হঠাৎ বড় কোনো পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায়, সমাজে যখন ভাঙাগড়া চলতে থাকে, তখন সমাজে নানা ধরনের নানা মাত্রার নতুন নতুন অপরাধ ঘটতে শুরু করে। বিখ্যাত ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুরখেইম এটা তার বিখ্যাত ‘এনোমি তত্ত্ব’ দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। ট্র্যাডিশনাল সোসাইটি বা প্রথাগত সমাজব্যবস্থা থেকে মডার্ন বা আধুনিক সমাজে কিংবা আধুনিক সমাজ থেকে পোস্ট মডার্ন বা উত্তরাধুনিক সমাজে উত্তরণকালে সমাজে একটা দোদুল্যমানতা তৈরি হয়। পুরাতন অনুশাসন, পুরাতন মূল্যবোধ ভেঙে পড়ছে কিন্তু আধুনিক যুগের ধ্যানধারণা চিন্তাভাবনা বিকশিত হচ্ছে না, নতুন মূল্যবোধের সঙ্গে পুরনো মূল্যবোধের একটা সাংঘর্ষিক অবস্থা বিরাজ করছে; নতুন সামাজিক কাঠামো তৈরি হচ্ছে না, এমন সমাজেই নানা মাত্রায় অপরাধ ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের এখানেও এখন সমাজ বদলের এমন ক্রান্তিকাল চলছে বলেই অপরাধ এত বেশি। এখন উইয়ার্ড কাইন্ড অব ক্রাইম ঘটছে যা আগে দেখা যায়নি। এই যে স্বামী স্ত্রীকে হত্যা করছে, স্ত্রী স্বামীকে হত্যা করছে পরকীয়া প্রেমের সূত্র ধরে, এসব ঘটনা আগে আমাদের দেশে ছিল না।

দেশ রূপান্তর : গণপিটুনিই হোক কিংবা চলন্ত বাসে দলবদ্ধ ধর্ষণ, দেশে যখন এমন কোনো একটা ঘটনা ঘটতে থাকে তখন একের পর এক একই ধরনের অপরাধের খবর আসতে থাকে সারা দেশ থেকে। অপরাধ বা সহিংসতার একটা বিশেষ প্রবণতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়, এমনটা কেন ঘটে বলে মনে করেন?

জিয়া রহমান : আসলে এর যথাযথ কোনো একটা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে কি না বলা যাচ্ছে না। তবে অনেকগুলো কারণ এখানে সম্ভবত একত্রে কাজ করে। একটা হলো আমাদের দেশের ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেমটাÑ পুলিশ, প্রসিকিউশন, প্রিজন, এখনো ভালোভাবে গড়ে তোলায় যায়নি। মানুষের মধ্যে যে এ বিষয়ে প্রবল ভীতি আছে বা আস্থা আছে কোনোটাই বলা যাবে না। আবার আরেকটা দিক হলো, গণমাধ্যম এবং ফেইসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ভূমিকা। যখন কোনো একটা বিশেষ অপরাধ ঘটতে থাকে তখন পত্রপত্রিকা পড়ে, টেলিভিশনে বা ফেইসবুকে দেখে মানুষের মধ্যে ওই বিষয়ে সচেতনতা তৈরি হয়ে যায়। তার আশপাশে কোথাও এমন কিছু ঘটতে দেখলে সে দ্রুত খবর দেয়, প্রতিবাদ করে, বিক্ষোভ করে। ফলে তখন ওইসব ঘটনার খবরই একের পর এক আসতে থাকে। আবার আরেকটা দিক হলো, এমন অপরাধ ঘটতে দেখে অন্যান্য মানুষের মধ্যেও তার নিজের চাহিদাগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তার অবদমনগুলো তাকে তাড়িত করে এবং সেও ওইরকমভাবে বিকৃত পন্থায় তার উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে চায়।

দেশ রূপান্তর : গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার কারণে, সেখান থেকে দেখে অপরাধের কোনো একটা বিশেষ ধরনকে হয়তো মানুষ অনুসরণ করতে পারে বা ওই একই অপরাধ করার সুযোগ নিতে উৎসাহিত হতে পারে। সমাজে অপরাধ ঘটছে তার খবর প্রচারিত হচ্ছে। কিন্তু অপরাধের বিচার বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি তুলনামূলকভাবে খুবই কম ঘটছে এবং সংগত কারণেই বিচারের খবরও কম প্রচারিত হচ্ছে। ফলে মানুষের মধ্যে অপরাধের শাস্তি পাওয়া নিয়ে ভীতি তৈরি হচ্ছে না। এভাবে কি বলা যেতে পারে? বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে তো অনেকেই অপরাধ বাড়ার একটা বড় কারণ বলে মনে করেন?

জিয়া রহমান : দেখুন, বিচার না হওয়া বা বিচারহীনতার সংস্কৃতি অবশ্যই একটা বড় সমস্যা। কিন্তু কোনো সাধারণ মানুষ, সে যখন কোনো অপরাধ করে, তখন যে আসলে অপরাধ করে সে পার পেয়ে যাবে কি না এটা ভেবেই সে অপরাধ ঘটায় এটা হয়তো বলা যাবে না। কারণ সে অপরাধ করে তার নিজের ভেতরের তাড়না থেকে, নিজের লিপ্সা চরিতার্থ করতে। আমরা এমন সমাজে আছি যেখানে এখন ইন্টারনেটের কারণে আপনি দুনিয়ার সবকিছু দেখতে পারছেন। মানুষ পশ্চিমের সিনেমা দেখছে, পর্নোগ্রাফি দেখছে, সেখানকার বিত্ত-বিলাসের জীবন দেখছে। কিন্তু দেশের সমাজটা বদ্ধ। তার জন্য সেসব সুযোগ নেই। পশ্চিমে ছেলেমেয়েরা লিভ টুগেদার করছে। আমাদের এখানে পারছে না। এখানে নানা সামাজিক ধর্মীয় ট্যাবু আছে। এগুলোই তো অবদমন করছে। ফলে সে বিকৃত পন্থা বেছে নিচ্ছে। পশ্চিমে কিন্তু যৌনপল্লী আছে, মানুষ যৌনকর্মীদের কাছে যাচ্ছে, কিন্তু এখানে সেটা হচ্ছে না। এগুলো যৌন বিকৃতি, ধর্ষণের মতো অপরাধের অন্যতম কারণ।

দেশ রূপান্তর : সম্প্রতি দেশে শিশু ধর্ষণের ঘটনা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এই ছয় মাসে বাংলাদেশে ৩৯৯ জন শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছে বলে জানাচ্ছে বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন। স্কুলে এবং মাদ্রাসায় একের পর এক শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী?

জিয়া রহমান : শিশু ধর্ষণ, মাদ্রাসা বা ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্ষণ যে শুধু বাংলাদেশেই ঘটছে তা কিন্তু নয়। পশ্চিমেও এটা হয়েছে এবং হচ্ছে। চার্চগুলোতে এটা খুব হতো। এখন আমাদের দেশের একটা বড় সমস্যা হলো সেক্স এডুকেশন বা যৌন শিক্ষার অভাব। পারিবারিক আবহ থেকে শুরু করে সমাজে শিশুদের নিরাপদ করতে স্কুলে-মাদ্রাসায় এই বিষয়ে পাঠ দিতে হবে, তাদের সচেতন করে গড়ে তুলতে হবে। আরেকটা হলো কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করা। যাতে শিশু এবং শিশুর পরিবার এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করার মতো সক্ষমতায় আমরা যেতে পারিনি।

দেশ রূপান্তর : ধর্ষণের মাত্রা কমছে না। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী ২০১৮ সালে দেশে মোট ধর্ষণের সংখ্যা ৭৩২টি। আর এ বছর প্রথম চার মাসে মোট ধর্ষণের সংখ্যা ৩৫৪টি। বলা হয়ে থাকে ধর্ষণের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক খুব স্পষ্ট। দেশে নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে সম্পত্তির উত্তরাধিকারে পুরুষের সমান সম্পত্তি না পাওয়া একটা বড় সমস্যা বলে মনে করেন অনেকে। আপনি বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?

জিয়া রহমান : অবশ্যই ধর্ষণের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক রয়েছে। আর নারীর ক্ষমতা তো দূরের কথা কিছুদিন আগেও আমাদের সমাজে নারীর কোনো মূল্যায়ন ছিল না। এখন এটা মাত্র শুরু হয়েছে। মেয়েরা লেখাপড়া শিখে চাকরি-বাকরি করছে, স্বাবলম্বী হচ্ছে। এমনকি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মেয়েরা আমাদের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ করে একটা বিপ্লবই ঘটিয়ে ফেলেছে। কিন্তু সমাজে নারীর নিরাপত্তা তৈরি হয়নি। এজন্য আসলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং নগরায়ণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন সামাজিক কাঠামো, আধুনিক ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেম ঢেলে সাজাতে না পারাÑ এসব নানা কিছু জড়িয়ে আছে। এটা একদিনে হবে না। কিন্তু সেই চেষ্টা চালাতে হবে। শিক্ষায়-দীক্ষায়, মূল্যবোধে, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে নতুন এই সময়ের উপযোগী নতুন সমাজ গঠন করতে হবে।