সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের তিন বিচারপতিকে বিচারিক দায়িত্ব থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন গতকাল বৃহস্পতিবার এই নির্দেশ দিয়েছেন বলে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকে জানানো হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্তের পর তিন বিচারপতি ছুটি চেয়েছেন।
সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ওই তিন বিচারপতির নাম বলা হয়নি। প্রশাসনের বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী, কাজী রেজা-উল হক ও এ কে এম জহিরুল হক এই তিনজন গতকাল সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে বিচারিক কোনো কাজে অংশ নেননি। তিনজনই গতকাল ছুটির আবেদন করে ছুটিতে চলে গেছেন। তাদের বিরুদ্ধে পাওয়া অভিযোগের অনুসন্ধানের প্রেক্ষাপটে বিচারিক দায়িত্ব থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন জানিয়েছে। তবে সেই অভিযোগ কী ধরনের, সে বিষয়ে প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। সালমা মাসুদ চৌধুরী ২০০২ সালের ২৯ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। ২০০৪ সালের ২৯ জুলাই হাইকোর্টে নিয়মিত বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন তিনি। কাজী রেজা-উল হক ২০১০ সালের ১৮ এপ্রিল হাইকোর্টে অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। ২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল নিয়মিত বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন তিনি। আর ২০১০ সালের ১৮ এপ্রিল হাইকোর্টে অতিরিক্ত বিচারপতি দায়িত্ব পালন শুরু করেন জহিরুল হক। ২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল একই বিভাগে নিয়মিত বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি।
গতকাল সুপ্রিম কোর্টের নিয়মিত কার্যতালিকায় (কজলিস্ট) অন্য বিচারপতিদের নাম, বেঞ্চ নম্বর উল্লেখ থাকলেও এই তিন বিচারপতির নাম ছিল না। সকালে বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর তাদের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে, নাকি বিচারিক দায়িত্ব থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছেÑ সে গুঞ্জন ওঠে। এরপর দিনভর গণমাধ্যমকর্মীরা এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের বক্তব্য জানার চেষ্টা করলেও দায়িত্বরতদের কেউ কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। বিকেলে সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র মো. সাইফুর রহমান তার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘তিনজন বিচারপতির বিরুদ্ধে প্রাথমিক অনুসন্ধানের প্রেক্ষাপটে মহামান্য রাষ্ট্রপতির সঙ্গে পরামর্শ করে তাদের বিচারকার্য থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্তের কথা তাদের অবহিত করা হয় এবং তারা ছুটি প্রার্থনা করেন।’ এ সময় তিনি তিন বিচারপতির নাম বলতে অপারগতা প্রকাশ করলে সাংবাদিকরা ওই তিন বিচারপতির নাম বললে তিনি বলেন, ‘আপনারা তো জানেনই।’
কী ধরনের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান এবং বিচারকার্য থেকে তাদের বিরত থাকতে বলা হয়েছে এবং কারা অনুসন্ধান করছেÑ এসব প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘অনুসন্ধান গোপনীয় বিষয়। আমার কাছে এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য নেই। আমি যতটুকু জানি সেটুকুই আপনাদের বললাম। এ বিষয়ে কোনো অফিসিয়াল প্রজ্ঞাপনও দেওয়া হবে না।’
এ বিষয়ে বিকেলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম তার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির সঙ্গে পরামর্শ করে প্রধান বিচারপতি তিন বিচারপতিকে কাজ থেকে বিরত থাকতে বলেছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে বলে আমাকে জানানো হয়েছে। এই তিনজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান অন্যদের জন্য ইঙ্গিত (বার্তা)।’
তিন বিচারপতির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের অনুসন্ধান কীভাবে হবে, বা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে অনুসন্ধান হবে কি নাÑ এমন প্রশ্নে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতি অনুসন্ধানের বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করবেন। বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি রক্ষায় তারাই সিদ্ধান্ত নেবেন।’ তিনি জানান, তিন বিচারপতির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়টি বিচার বিভাগের ভাবমূর্তির রক্ষায় জনসম্মুখে প্রকাশ করা সমুচিত হবে না। মাহবুবে আলম বলেন, ‘কোনো মন্ত্রী, বিচারপতি কিংবা সাধারণ মানুষ আইনের ঊর্ধ্বে নন। সুপ্রিম কোর্টের এই পদক্ষেপের ফলে যারা নিজেদের সঠিক পথে পরিচালনা করছেন না, তাদের কাছে এটি একটি ইঙ্গিত (বার্তা) যাবে।’ এ ধরনের পদক্ষেপ আরও আগেই নেওয়া উচিত ছিল এবং আইনজীবীরাও চান সব বিচারপতি বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকুক বলেও জানান অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।
এদিকে হাইকোর্টের তিন বিচারপতিকে দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা ও তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সম্পাদক ব্যারিস্টার এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। গতকাল সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমরা তিন বিচারপতিকে দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা ও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে তদন্তকে স্বাগত জানাই। তবে কারা এই তদন্ত করছে সেটি স্পষ্ট করার দাবি করছি।’
মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘আমরা সময়ে সময়ে কতিপয় বিচারপতির বিরুদ্ধে প্রধান বিচারপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। সুপ্রিম কোর্টের অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারী দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। তাদের ব্যাপারেও সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছি। আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীরা তাদের কাছে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন। প্রধান বিচারপতি তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবেন বলে আমরা আশা করি।’