বর্ষা মৌসুমের জরিপে রাজধানীর ১৪টি স্থানের মধ্যে ১২টি স্থানেই ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রার চেয়েও চারগুণ বেশি এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব পেয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা। এসব স্থানের মধ্যে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল বিভিন্ন বাস টার্মিনাল, রেলওয়ে স্টেশন ও সংলগ্ন এলাকা, বস্তি এলাকা, মেট্রোরেল প্রকল্প এলাকা, পুলিশ লাইনস ও হাসপাতাল এলাকা। জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, এসব স্থানে ব্রুটো ইনডেক্স ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রা ২০-এর বেশি।
অধিদপ্তরের প্রধান কীটতত্ত্ববিদ ডা. খলিলুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, মশার প্রজনন উৎস হিসাব করে এ জরিপ চালানো হয়। প্রতি ১০০ প্রজনন উৎসের মধ্যে ২০টি বা তার বেশিতে যদি এডিস মশার লার্ভা বা পিউপা পাওয়া যায়, তাহলে সেটাকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ উপস্থিতি’ বলা যায়।
গত দুদিন সরেজমিন ঘুরে এসব স্থানের মধ্যে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, কমলাপুরের টিটিপাড়ার রেলওয়ের নিরাপত্তা ব্যারাক, শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনি এবং বস্তি এলাকার মধ্যে শ্যামলী বস্তি ও তেজগাঁও রেলগেট বস্তিতে মশা ও মশার লার্ভা দেখা গেছে। এসব এলাকায় ডেঙ্গু রোগীর দেখা মিলেছে। এর মধ্যে রেলওয়ের ১০ আনসার সদস্য এখনো ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন। বিশেষ করে রেলওয়ে কলোনির ঘরে ঘরে ডেঙ্গু রোগীর খবর পাওয়া গেছে।
এসব এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, রেলওয়ে স্টেশনের ভেতরে মাঝেমধ্যে সিটি করপোরেশনের লোকজন মশার ওষুধ ছিটাতে আসেন। কমলাপুরের টিটিপাড়ার রেলওয়ের নিরাপত্তা ব্যারাক ও শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনিতে এ মৌসুমে মাত্র এক দিন মশার ওষুধ ছিটাতে দেখেছেন স্থানীয়রা। আর শ্যামলী বস্তি ও তেজগাঁও রেলগেট বস্তিতে এখন পর্যন্ত মশা নিধনের কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়নি। বস্তিসংলগ্ন প্রধান সড়ক ধরে ওষুধ ছিটানো হলেও ডেকেও বস্তির ভেতর মশক নিধনকর্মীদের আনা যায়নি।
তবে জরিপে উঠে আসা এডিসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মহাখালী বাস টার্মিনাল, কমলাপুরের বিআরটিসি বাস ডিপো ও মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকার অবস্থা বদলেছে। সেখানে নিজ উদ্যোগে মশা নিধন অভিযান অব্যাহত রেখেছেন কর্তৃপক্ষ। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। এসব স্থানের কোথাও মশার লার্ভা দেখা যায়নি।
এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাজধানীর কমলাপুর এলাকায় ও বিভিন্ন বস্তিতে মশা আগেও ছিল, এখনো আছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে হলে অবশ্যই মশা নিধন করতে হবে। মশার লার্ভা ধ্বংস করতে হবে। কারণ ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশা ১০০-৪০০ মিটার পর্যন্ত উড়তে পারে। সুতরাং কোথাও এডিস থাকলে সেখান থেকে উড়ে অন্যত্র ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটাতে পারে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সব জায়গা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
এই রোগতত্ত্ববিদ আরও বলেন, বস্তি এলাকায় এডিস মশা কম। সেখানে সাধারণ কিউলেক্স মশা বেশি। তবে বস্তিতে যদি স্বচ্ছ পানিতে কোনো লার্ভা দেখা যায়, সেটা এডিস হওয়ার আশঙ্কা বেশি। আমরা যত রোগী দেখেছি, তাতে বস্তির রোগী কম। বেশিরভাগই মধ্যবিত্ত ধনী পরিবারের, অভিজাত এলাকায়।
এ ব্যাপারে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মীর মুস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, রেলস্টেশনের ভেতর ও রেল কলোনিসহ রেলের সমস্ত ভবন এবং স্থাপনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব রেল কর্তৃপক্ষের। আমরা সব সংস্থাকে নিজ নিজ দপ্তর পরিষ্কার রাখার ও মশা নিধনের উদ্যোগ নিতে চিঠি দিয়েছি। মূল দায়িত্ব তাদের। আমরা তাদের সহযোগিতা করব। তারপরও আমরা ওই এলাকায় লোক পাঠাব। কোথাও কোনো গাফিলতি থাকলে সমাধান করা হবে। আমাদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন অভিযান চলছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল হাই দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত মঙ্গলবার থেকে ডেঙ্গু মোকাবিলায় আমাদের চিরুনি অভিযান শুরু হয়েছে। আমরা ‘ডোর টু ডোর’ যাব। শ্যামলী বস্তিতেও লোক পাঠাব। আমরা লোকবল বাড়িয়েছি। কোথাও কোনো সমস্যা হলে আমাদের জানাবেন।
জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় এ বছর বর্ষা মৌসুমে পরিচালিত নিয়মিত জরিপের অতিরিক্ত হিসেবে ৩১ জুলাই থেকে ৪ অগাস্ট সময়ে ঢাকার ১৪টি এলাকায় এই জরিপ চালানো হয়। পরে সেই জরিপের ফলাফল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।
বস্তিতে ডেঙ্গু, মশা নিধন নেই : প্রায় ১০-১৫ হাজার মানুষের বসতি এই বস্তিতে। বস্তির বাসিন্দা ইউসুফ জানান, বস্তিতে সারা বছর রোগব্যাধি লেগেই থাকে। তবে বর্তমানে বস্তির অনেকেই জ¦রে আক্রান্ত । কয়েকজনের রক্ত পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়েছে। বস্তির অন্য বাসিন্দা হালিমা খাতুন (৫৫) বলেন, ‘সব জায়গায় ওষুধ দেয় সরকার। কিন্তু আমাগো বস্তিতে এখনো কাউরে আসতে দেখি না। অনেকেরই জ¦র হইছে। হাসপাতালে গিয়ে রক্ত পরীক্ষা করার পর অনেকেরই ডেঙ্গু ধরা পড়ছে।’
একই চিত্র দেখা যায় তেজগাঁও রেলগেট বস্তি এলাকায়। বস্তির বাসিন্দাদের বেশিরভাগই জানে না ডেঙ্গু সম্পর্কে। আতঙ্ক রয়েছে তারা। বাসিন্দাদের অভিযোগ, মশা নিধনে আশপাশের আবাসিক এলাকাগুলোতে ওষুধ দেওয়া হলেও বস্তিতে আসছে না সিটি করপোরেশনের লোক। বস্তির বাসিন্দা লোকমান মিয়া জানান, বস্তির মশা নিয়ে সিটি করপোরেশনের কোনো মাথাব্যথা নেই। তাদের এলাকায় সিটি করপোরেশনের লোকজনের মশা নিধনে কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। বস্তিতে অনেকেই জ¦রে আক্রান্ত। জ¦র হলে ফার্মেসিতে যাচ্ছে, ওষুধ নিয়ে চলে আসছে। এই জ¦র যে ডেঙ্গু হতে পারে এটা কেউ চিন্তাও করছে না।
রেলওয়ে কলোনিতে মশার লার্ভা : শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনিতে ঢুকলেই চোখে পড়ে ময়লার ভাগাড়। কলোনির সর্বত্র ময়লা আবর্জনার স্তূপ। ডাস্টবিন না থাকায় ময়লা ফেলা হচ্ছে পয়ঃনিষ্কাশন নালায়। নালা বন্ধ হয়ে তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। বদ্ধ নালায় গিজগিজ করছে মশার লার্ভা।
কলোনির বাসিন্দা নয়ন হাওলাদার জানান, কলোনির ড্রেনগুলো দীর্ঘদিন যাবত পরিষ্কার করা হয় না। ড্রেনের সর্বত্র মশার লার্ভা। কলোনিতে ১৩ জন পরিচ্ছন্নকর্মী থাকলেও দু-তিনজনের বেশি দেখা যায় না। সিটি করপোরেশন থেকে এ মাসে শুধু একবার ওষুধ দেওয়া হয়েছে। অথচ মশার কারণে ঘর থেকে বের হওয়া দায়। সবুজ সরদার নামে আরেক বাসিন্দা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কলোনির প্রতিটি ভবনে একজন করে ডেঙ্গু রোগী রয়েছে। দিনের বেলাতেও ঘরের মধ্যে মশারি অথবা কয়েল জ¦ালিয়ে থাকতে হয়। অথচ এখানে কোনো ওষুধ দেওয়া হয় না।’
রেলওয়ে নিরাপত্তা ব্যারাকে ডেঙ্গু রোগী : কমলাপুর টিটিপাড়ায় রেলওয়ের নিরাপত্তা ব্যারাকের বাসিন্দারা জানান, রেলওয়ের নিরাপত্তায় দায়িত্বে থাকা ৮-১০ জন আনসার সদস্য ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে পাঁচজন ভালো হয়ে বাড়িতে বিশ্রামে রয়েছেন। বর্তমানে রেলওয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তিনজন।
ব্যারাকে কথা হয় ডেঙ্গুজ¦রে আক্রান্ত মশিউরের সঙ্গে। তিনি জানান, গত ৩ আগস্ট জ¦র হয়। পরে তিনি গ্রামের বাড়িতে চলে যান। অবস্থার অবনতি হলে মাগুরা সদর হাসপাতালে ডাক্তারের শরণাপন্ন হন। রক্ত পরীক্ষায় ডেঙ্গু পজিটিভ আসে। ওইদিন তিনি ঢাকায় এসে রেলওয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। আনসার সদস্য মনির হোসেন জানান, ব্যারাকের অনেকেই ডেঙ্গুজ¦রে আক্রান্ত। দিনের বেলাতেও মশারি টানিয়ে থাকতে হয়। ব্যারাকের সর্বত্র ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। একটু বৃষ্টি হলেই ব্যারাকের সামনের ডোবায় পানি জমে থাকে। সিটি করপোরেশনের লোকজন কখনই এখানে আসে না। চলতি মাসে একবার শুধু মশা নিধনের ওষুধ দিয়ে গেছে।
কমলাপুর রেলস্টেশনের বগিতে জমা পানি : কমলাপুর রেলস্টেশনের মূল গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই ডান পাশে চোখে পড়ে বেশ খানিকটা জায়গাজুড়ে আবর্জনা। পরিত্যক্ত মরিচা ধরা পুরনো বগি। খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকা এসব বগিতে বৃষ্টি হলেই পানি জমছে। এগুলো পরিষ্কার করে না কর্তৃপক্ষ। স্টেশনের দায়িত্বে থাকা স্টাফরা জানান, বিকেল হলেই মশার উপদ্রব বেড়ে যায়। স্টেশনে মশা নিধন ওষুধ দেওয়া হলেও মশা কমার কোনো লক্ষণ নেই। রেলস্টেশনের দায়িত্বে থাকা প্রত্যেকেই ডেঙ্গুর ভয়ে রয়েছেন।
রেলের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা জানান, ট্রেনে কোনো যাত্রী যেন এডিস মশায় আক্রান্ত না হন সেজন্য বগিগুলোতে মশা নিধন ওষুধ স্প্রে দেওয়ার নির্দেশ থাকলেও শুধু এসি কেবিনেই দেওয়া হয়। সাধারণ বগি ও আসনগুলোতে কোনো স্প্রে করা হচ্ছে না।
স্টেশনে আন্তঃনগর ট্রেনে স্প্রে করার দায়িত্বে থাকা এক কর্মী জানান, যেসব ট্রেনের বগিতে এসি রয়েছে আমরা সেখানেই স্প্রে করি, সাধারণ আসনে করা হয় না।