বহুবিধ সন্ত্রাসের মাঝে পথ খুঁজছে বহুজনবাদ

আমাদের দেশে এখন রাজনৈতিক খবরের অভাব নেই।  প্রাক্তন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরমের গ্রেপ্তার, কাশ্মীর পরিস্থিতি বা দেশের বেহাল অর্থনীতি আর আসামের ‘এনআরসি’ রোজই এখন খবরের কাগজের হেডলাইন।  কিন্তু এখন, বস্তুত কাল থেকেই আপাত ছোট একটি খবর শোনার পর থেকে মনটা ভারী বিষণ্ণ হয়ে আছে। খবরটা ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হলেও কোনো ন্যাশনাল মিডিয়াতেই হেডলাইন হয়নি।  ফলে আমার ধারণা এদেশের অধিকাংশ আর্বান এলিট বা নাগরিক মননে খবরটি সেভাবে ছাপ ফেলতে পারেনি। নাগরিক ভারত এখন ব্যস্ত মহাকাশে ভারতের নিত্যনতুন সাফল্য নিয়ে। কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা উঠে যাওয়ার পর সেখানে জমির দাম কত হবে বা লগ্নি করলে মুনাফা অর্জন সম্ভব কি না এইসব ‘গুরুত্বপূর্ণ’ প্রশ্ন নিয়ে। এছাড়া সুন্দরী কাশ্মীরি মেয়ে বিয়ে করার সুখ স্বপ্ন তো আছেই। এর পাশে কোথায় কোন তামিলনাড়ুর অখ্যাত কোন এক গ্রামে এক পঞ্চান্ন বছরের দলিতের কী হলো না হলো তা নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় কোথায়! পথ দুর্ঘটনায় মারা যান ওই দলিত প্রৌঢ় কুপ্পান। আত্মীয় স্বজন ও গ্রামের লোকজন যখন মৃতদেহ শ্মশানে নিয়ে যাচ্ছিলেন তখন রাস্তা আটকে দেয় উঁচু জাতের লোকেরা। বলে এ রাস্তা আমাদের। ছোট জাতের কাউকে, সে মৃত অথবা জীবিত যেই হোক তাকে এখান দিয়ে যেতে দেওয়া হবে না। নিরুপায় গ্রামের লোকজন একটা সেতুর ওপর দিয়ে দড়ি বেঁধে মৃতদেহটি শ্মশানে কোনোরকমে নামিয়ে দেয়।

কয়েক মাস আগে এ-রকমই আর একটি ঘটনা ঘটেছিল ওড়িশায়। সেখানে এক দলিত মহিলা মারা যাওয়ার পর তার স্বামী বাধ্য হয়ে মাইলের পর মাইল কাঁধে করে স্ত্রীর মৃতদেহ শ্মশানে নিয়ে গিয়েছিলেন।  কোনো গাড়ি বা অ্যাম্বুলেন্স রাজি হয়নি নীচু জাতের মৃতদেহ শ্মশানে নিয়ে যেতে। আসলে এও এক ভারতবর্ষ। অন্ধকারের ভারত। এই দেশকে আমরা অনেকেই চিনি না। আমাদের সেনসেক্স বাড়ল না কমল, জিডিপি গ্রোথ কী অবস্থায় এসব গুরুগম্ভীর আলোচনায় আড়ালে চলে যায় বিষাদে ঢাকা অন্য এক ভারত। বলা যেতে পারে এক ভারতের মধ্যে অপর এক অজানা জনপদ। তামিলনাড়ুর ওই প্রৌঢ়ের সঙ্গীরা বলেছেন এ-রকম ঘটনা নতুন কিছু নয়। সবসময় ঘটে। এবার কীভাবে যেন বিষয়টি জানাজানি হয়ে যাওয়ায় একটু আধটু শোরগোল হচ্ছে। দুদিন পর সব থিতিয়ে যাবে।

একটা ঘটনা বলি। বেশ অনেক বছর আগে বিহার গেছি। বিহার তখন প্রবল উত্তপ্ত। জাতপাতে দীর্ণ, গরিব ভূমিহীন কৃষক তখন রুখে দাঁড়িয়েছে যাবতীয় অসাম্যের বিরুদ্ধে। উঁচু জাতের প্রাইভেট আর্মির সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে বিহার তখন আক্ষরিক অর্থেই অগ্নিগর্ভ। আরা স্টেশন থেকে অভিজাত রমনা হাঁটাপথে দশ মিনিট। বাইকে করে সে পথ যেতে সময় লেগে গেল পাক্কা একঘণ্টা। ব্যাপারটা বুঝলাম অনেক পরে।  আসলে রমনা উঁচু গোষ্ঠীর দখলে। দলিতরা সেখানে নিরাপদ নয়। আমি যাচ্ছি এক কুর্সি যুবকের বাইকে।  সে অলিগলি হয়ে এসেছে নিরাপত্তার কারণে। তাই এত দেরি। ওই প্রথম ব্রাহ্মণ্যবাদী রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি পরিচয়। একটু একটু করে চিনতে শেখা মনুবাদী ভারতের দাপটে কোণঠাসা হয়ে থাকা এক অন্য ভারতকে। এখন যখন ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’-এর নামে ধর্মনিরপেক্ষ ভারত দিন দিন বদলে যাচ্ছে, ধর্মের নামে মানুষ খুন হচ্ছেন, দলিত নির্যাতন অসহনীয় হয়ে উঠছে তখন ওই অচেনা অজানা দলিত ভারতকে মনে পড়ে যাচ্ছে।

প্রবীণ কংগ্রেস নেতা জগজীবন রামের গ্রামে যাব বলে হাঁটছি। তখন দুপুর। এপ্রিলের রোদে পথ চলা দায়।  খেয়াল করিনি কখন সঙ্গের জল ফুরিয়ে গেছে। গ্রামের মধ্যে যেতে যেতে জলকষ্টে প্রায় মরো মরো অবস্থা। সামনে এক মাটির বাড়ির দাওয়ায় গামছা পরে খালি গায়ে এক বুড়ো মানুষকে দেখে একটু জল চাইলাম। আমাকে বিব্রত ও অবাক করে দিয়ে বৃদ্ধ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। কাঁপতে কাঁপতে হাত জোর করে অস্ফুটে ভোজপুরি ভাষায় কী সব বলতে লাগলেন। ভঙ্গি বিনয়ের। কিন্তু জল চাইছি অথচ দিচ্ছেন না দেখে বেশ রাগ হয়ে গেল। আর তখন সত্যিই মনে হচ্ছে একটু জল না পেলে বোধহয় মরেই যাব। এবার বাধ্য হয়ে বেশ ঝাঁঝিয়েই বললাম পানি মিলেগা অউর নহি মিলেগা জলদি বাতাইয়ে। সোজা বাংলায়, জল পাব কি পাব না সাফ সাফ বলে দাও বাপু। তার উত্তরে বৃদ্ধ যা বললেন তা শুনে আমি অবাক! উনি কাঁপতে কাঁপতেই জানালেন ‘বাবুজি হাম চামার বা। উনি বোঝাতে চাইলেন যে আমি জাতে চামার। নীচু জাতের। দলিত। আপনি ভদ্রলোক। আমার হাতে আপনাকে জল খাওয়াতে পারব না। তাহলে গুনাহ, পাপ হবে।’

এরকম এক টোলায় ভোটের সকালে হাল্কা লাইন। একজন বুড়ো ফোকলা দাঁতে হাসতে হাসতে আঙুলের কালি দেখাচ্ছে। মহাখুশি মানুষটি এই প্রথম ভোট দিতে পেরেছে। লোকটির মুখের দিকে তাকিয়ে আছি।  বয়স কম করেও আশি-পঁচাশি হবে। একুশ বছর বয়সে যে ভোটাধিকার পেয়েছিলেন আজ জীবনের শেষ দিকে এসে তিনি প্রথম ভোট দিতে পারলেন। এত বছর ধরে উচ্চবর্গের লেঠেলরা শুধু ওই লোকটি নয়, একজন দলিতকেও ভোট দিতে দেয়নি। জোর করে বাড়ি বন্ধ করে আটকে রেখেছিল। আন্দোলনের ফলে একটা গ্রামে অধিকার ফিরলেও এখনো ভারতের অধিকাংশ দলিত অধ্যুষিত গ্রামে দলিত আদিবাসীদের ভোট দেওয়ার অধিকার কতটা তা জানতে চাইলে সম্প্রতি এদেশে ‘আর্টিকল-১৫’ সিনেমাটি দেখে নিতে পারেন।

উনি যা বলেননি তাও ঘুরতে ঘুরতে বুঝেছিলাম যে আমাকে জল দিলে উনি নিজেই সমাজচ্যুত হতে পারেন বা উচ্চবর্গের হিন্দুদের হাতে মার খাওয়াও অসম্ভব নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারত। আমাদের নেতারা সবসময় সাম্যের কথা বলেন মুখে। এদেশের সংবিধানের ‘আর্টিকেল-১৫’ তে স্পষ্ট করে সাম্যের অধিকার লিখিত আছে। কিন্তু বাস্তবে তা কতটা মেনে চলা হয় তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।  এখন তা ক্রমেই বাড়ছে। সংখ্যালঘু নির্যাতন তবু আমরা শুনি। কম শুনি দলিত আদিবাসীদের ওপর অকথ্য অত্যাচারের ঘটনা। এদেশের গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার নির্বাচন। ভোটের মাধ্যমে শাসক পরিবর্তন হয় পাঁচ বছর অন্তর। ঢাকঢোল পিটিয়ে তখন গণতন্ত্রের জয় নিয়ে মাতামাতি চলে। একবার বিহারের ভোট দেখতে গেছি। দানহিবিহিটা বলে এক গ্রামে গেছি। গ্রামটা আড়াআড়ি উচ্চ ও নিম্নবর্গের মধ্যে ভাগাভাগি করা। গো বলয়ের গ্রাম ও তার জনবিন্যাসও সমাজ বিজ্ঞানের ছাত্রদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।  বিহার উত্তর প্রদেশের গ্রামে নীচু জাতের লোকেরা গ্রামের ভেতরে বাড়ি করতে পারেন না। তাদের সেই অধিকার নেই। মুসায়র, পাসি, পাসোয়ান, কাহার, চামার সব দলিতদের বাস গ্রামের বাইরে আলাদা আলাদা টোলায়। ওই নিম্নবর্গের হিন্দুদের অধিকাংশ জায়গায় শুধুমাত্র ভোটাধিকার নয়, কিছুমাত্র সাংবিধানিক অধিকারও যেখানে ধরাছোঁয়ার বাইরে সেখানে আম্বেদকর দিনকে দিন হয়ে পড়ছেন শালগ্রাম শিলার মতো। যাবতীয় বৈষম্য চলছে স্রেফ আম্বেদকরের ছবি প্রকাশ্যে টাঙিয়ে। দলিতদের অধিকার দিচ্ছি না। সামাজিক স্বীকৃতি দিচ্ছি না। উচ্চবর্গের অনুমতি ছাড়া সে ভালো পোশাক পরতে পারবে না। নাটক যাত্রা দেখতে পারবে না। এমনকি মৃত্যুর পরেও তার স্বস্তি নেই।

উঁচু জাতের রাস্তায় মৃত দলিতও অচ্ছুৎ। অথচ ভারতে যত দাঙ্গা হয়, বিশেষ করে নব্বই দশকের পর থেকে এখন যে নব্য হিন্দুত্বের রমরমা, যাদের অন্যতম কর্মসূচি ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি, যার প্রতিফলন ঘটছে একের পর এক দাঙ্গায়, তা নিয়ে সমীক্ষা করলে দেখা যাবে যে ওইসব দাঙ্গা-হাঙ্গামার  পেছনে দলিতদের সক্রিয় ভূমিকা থেকে গেছে। অধিকাংশ দাঙ্গায় মনুবাদী রাজনীতি দলিতদের ব্যবহার করেছে। রানা আয়ুব এক তরুণ সাহসী সাংবাদিক। উনি  গুজরাত গণহত্যার পেছনের নানা নেপথ্য কাহিনী নিয়ে চমৎকার একটি বই লিখেছেন ‘গুজরাত ফাইলস্’ নামে। তাতে একাধিক পুলিশ অফিসারের ইন্টারভিউ আছে। যাদের বেশিরভাগই ঘটনাচক্রে দলিত। তারা নির্দ্বিধায় জানিয়েছেন গুজরাত গণহত্যার সময় বহুবিধ গর্হিত কাজ কীভাবে তাদের দিয়ে করানো হয়েছিল। এর পেছনের পরিকল্পনা খুব জটিল নয়।  এক সংখ্যালঘু দিয়ে অন্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন করানো। পরবর্তী সময়ে এই নিয়ে তদন্তটদন্ত বা পুলিশি ধরপাকড় হলে-টলেও ষড়যন্ত্রের নীলনকশার আসল মাথা বা মূল কারিগরদের দিকে কেউ অপরাধী বলে আঙুল তুলতে পারবে না। এই চতুর, ধূর্ত মনুবাদী রাজনীতি না বুঝতে পারলে ভারত রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্র বোঝা সম্ভব নয়। মনুবাদের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে নিম্নবর্গের প্রতি চরম বিদ্বেষ। এ ঘৃণা এমন যেখানে অন্য জাতে বিয়ে করার ‘অপরাধে’ বাবা মেয়েকে, ভাই বোনকে প্রতিনিয়ত নিগ্রহ করছে। এমনকি খুন অবধি করা হচ্ছে তথাকথিত পারিবারিক সম্মান রাখার অজুহাতে। এই খুনের আবার একটা গালভরা নাম দেওয়া হয়েছে ‘অনার কিলিং’।

এতক্ষণ এত কথা বলার পরে অনেকের মনে হতেই পারে যে দলিত নিগ্রহ বা জাতি সমস্যা একান্তই গো-বলয়ের নিজস্ব সমস্যা। পশ্চিমবঙ্গে না আছে কাস্ট না রয়েছে কমিউনালিজম, সাম্প্রদায়িক কোনো সমস্যা।  ধর্মীয় বিভাজন নিয়ে আপাতত কিছু বলব না। জাতপাতের পরিস্থিতি যে কেমন ভয়াবহ তা রবিবার, ছুটির দিনে যে কোনো বহুল প্রচারিত খবরের কাগজের পাত্র-পাত্রীর বিজ্ঞাপনের পাতায় চোখ রাখলেই বুঝতে পারবেন।

ভারতের হিন্দু জাত ব্যবস্থায় যে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র বিভাজন তা যতদিন থাকবে ততদিন এদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হওয়া কঠিন। তবে এটা ঠিক যে দলিতরা আজ অনেক জায়গায় মুখ বুজে মার না খেয়ে পাল্টা প্রতিরোধের পথ নিচ্ছেন। বামপন্থি রাজনীতির ডিসকোর্সেও শোনা যাচ্ছে নতুন স্লোগান ‘জয়ভীম কমরেড’। এভাবেই নতুন বামপন্থা আম্বেদকর বা জ্যোতিরাও ফুলের সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটাচ্ছে মার্কসবাদী বীক্ষার। দলিত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনীতির সামনের সারিতে উঠে আসছে জিগনেশ মেভানির মতো ঝকঝকে তরুণ। দিল্লিতে কয়েক দিন আগে ছয়শ বছরের পুরনো ঐতিহ্যশালী সন্ত রবিদাসের মন্দির ভেঙে দেওয়ার প্রতিবাদে লাখো দলিত ঝড় তুলে অচল করে দিয়েছে রাজধানীর রাজপথ। এভাবেই স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা বা মনুবাদী ভারতের উত্থানের কালেও এদেশের দলিত রাজনীতির স্বর ক্রমেই বাড়ছে।  বহুবিধ সন্ত্রাসের মধ্যেও মাথা উঁচু করে পথ খুঁজছে বহুজনবাদ।

লেখক

ভারতের প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা