১৯০৬ সালে এই বাংলাদেশেই ১৯৪৭-এর স্বাধীনতার প্ল্যাটফর্ম মুসলিম লীগের জন্ম। ৩০ ডিসেম্বর ১৯০৬ ঢাকার শাহবাগে মুসলমানদের রাজনৈতিক মঞ্চ সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ সৃষ্টি হয়। যদিও ১৯৪০ সালে মুসলমানদের জন্য রাষ্ট্র/রাষ্ট্রসমূহের প্রস্তাবক ও বাঙালি নেতা আবুল কাশেম ফজলুল হক, কার্যত ১৯৩৫ থেকে মুসলিম লীগ বাঙালি নেতৃত্বের হাতছাড়া হয়ে যায়। সে সময় নেতৃত্ব গ্রহণ করেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। এ কথাও সত্য, বাঙালি নেতৃত্বাধীন সময়ে মুসলিম লীগ প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতার দরকষাকষি করার মতো শক্তিশালী দল হয়ে উঠতে পারেনি। এটি ঘটেছে জিন্নাহর নেতৃত্বে। তবে প্রাদেশিক দল হিসেবে মূলত ১৯৩৫-এর ভারত শাসন আইনে সংসদীয় আসনের নববিন্যাসে মুসলিম লীগ বাংলার ভাগ্য নিয়ন্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়। দুর্ভাগ্য কিংবা নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা ও প্রদেশের বাইরে গ্রহণযোগ্যতার ঘাটতি কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে, বিশেষ করে পাকিস্তান হাসিলের সময় তাদের তেমন কোনো গুরুত্ব ছিল না।
১৯৪৭-এ শেষ ভাইসরয় মাউন্টব্যাটেন ভারতবর্ষে যাদের গণ্য করার মতো নেতা বিবেচনা করেছেন তাদের একজনও বাঙালি নন।
ম্যারি কলিন্স এবং ডোমিনিক ল্যাপিয়েরের মাউন্টব্যাটেনের সাক্ষাৎকারভিত্তিক গ্রন্থ ‘মাউন্টব্যাটেন অ্যান্ড দ্য পার্টিশন অব ইন্ডিয়া’ এই সত্যটি আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরেছে। তারা মাউন্টব্যাটেনকে ভারতীয় নেতাদের সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে বললে তিনি যে জবাব দেন তার অনুবাদ নিম্নরূপ :
আমি জানতাম পাঁচজনের সত্যিকার গুরুত্ব রয়েছে। তারা হলেন : (জওয়াহেরলাল) নেহরু, (মোহনদাস করমচাঁদ) গান্ধী, (সর্দার বল্লভ ভাই) প্যাটেল, লিয়াকত আলী খান এবং (মোহাম্মদ আলী) জিন্নাহ। এটা বেশ কৌতূহলজনক যে পাঁচজনেরই একই রকম পাঁচটি সাধারণ গুণ রয়েছে।
প্রথমত : তাদের সবাই মধ্যবয়স অতিক্রম করেছেন এবং পরস্পরের বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক করে জীবন কাটিয়েছেন।
দ্বিতীয়ত : মানুষকে উত্তেজিত করার কলাকৌশল তাদের বেশ রপ্ত করা আছে, তারা সবাই স্বাধীনতার জন্য নিবেদিত, যে ধরনেরই হোক, প্রশাসন সম্পর্কে তাদের বিন্দুমাত্র ধারণা নেই।
তৃতীয়ত : তারা সবাই আইনজীবী। তারা ইংল্যান্ডের ইন্্স অব কোর্টে সবাই ডিনার করেছেন। তাদের প্রায় সবাই ব্রিটিশ সাংবিধানিক আইন সম্পর্কে ভালোভাবে অবহিত। (গান্ধী এবং নেহরু ইনার টেম্পল-ইন-এর ব্যারিস্টার, প্যাটেল মিডল টেম্পল-ইন, জিন্নাহ লিভুন’স-ইন এবং লিয়াকত আলী খান ইনার টেম্পল-ইন থেকে ব্যারিস্টার)।
চতুর্থত : স্বাধীনতা দিয়ে আমরা কী করব এটা আমার কাছে সম্পূর্ণ নতুন, কিন্তু তাদের সবার কাছে বড়জোর সারা জীবনের উদ্যোগের ফল।
পঞ্চমত : তাদের সবারই নিজস্ব যে মানবজীবন তা সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক কর্মকা-ে ডুবে আছে। তারা কোন প্রেক্ষাপট থেকে এসেছেন কেউ জানে নাÑ অন্তত আমি জানি না।
কাজেই তারা যখন আমার কাছে এলেন আমিই বরফ গলাব এ নিয়ে আমি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলাম, আমাকে তাদের জানতে হবে। প্যাটেলকে নিয়ে এগোতে আমার অনেক সমস্যা হয়েছে আমি তাদের নিজেদের সম্পর্কে বলার জন্য ডেকেছি। তারা কী চান সে কথা বলতে সবাই আসতে চান। তারা যেন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ আমাকে তাদের প্রোপাগান্ডা শোনাবেন। কিন্তু আমি তা শুনব না। আমি বলেছি, ‘আমি আপনাদের প্রোপাগান্ডা চাই না; আমার কী করা উচিত যে কথা আমাকে বলবেন না। আমি আপনাদের জীবন সম্পর্কে জানতে চাই।’
গান্ধী, নেহরু, প্যাটেলÑ তারা সবাই ইংরেজ ভাইসরয় এবং গভর্নরদের সঙ্গে কাজ করে অভ্যস্ত। তবুও তারা বিভিন্ন সময় আলাদা আলাদাভাবে আমাকে বলেছেন কাজ করার জন্য। আমাকে অন্য যে কোনো ইংলিশম্যানের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন মনে হয়েছে। তারা বলেছেন আমারটা সম্পূর্ণ বদলে যাওয়া ‘অ্যাপ্রোচ’ খোলামন আলোচনা। তারা অনুভব করেছেন তারা যা করতে চেয়েছিলেন আমি তাই করতে চেষ্টা করছি, আর আমি তা করতে পারছি কি না তারা তা অবলোকন করছেন।
সে সময়ের তিনজন প্রধান বাঙালি নেতা আবুল কাশেম ফজলুল হক (১৯৩৭ থেকে ১৯৪৩ অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী), খাজা নাজিমউদ্দিন (১৯৪৩ থেকে ১৯৪৫ প্রধানমন্ত্রী) এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী (১৯৪৫-১৪ আগস্ট ১৯৪৭) প্রধানমন্ত্রী)। কেন্দ্রে কারোরই কোনো অবস্থান ছিল না। জিন্নাহর সঙ্গে অনেকটা প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট সম্পর্কের জোরে খাজা নাজিমউদ্দিন ১৯৪৭-এ স্বাধীনতা-উত্তর পূর্ব বাংলার চিফ মিনিস্টার হলেন।
১৪ আগস্ট পাকিস্তান স্বাধীন হলো। মাউন্টব্যাটেন চেয়েছিলেন একই সঙ্গে ভারত ও পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল থাকতে, জিন্নাহ তাকে প্রত্যাখ্যান করেন। জিন্নাহ ১৫ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ ঘোষণা করেন। সাত সদস্যের পরিষদে লিয়াকত আলী খান প্রধানমন্ত্রী
১. লিয়াকত আলী খান
২. ইব্রাহিম ইসমাইল চুন্দ্রীগড়
৩. সরদার আবদুর রব নিশতার
৪. রাজা গজনফর আলী
৫. মালিক গোলাম মোহাম্মদ
৬. যোগেন্দ্রনাথ ম-ল
৭. ফজলুর রহমান
প্রথম ৫ জনই পশ্চিম পাকিস্তানের, পূর্ব বাংলার দুজনকে জিন্নাহ নির্বাচন করেন কার্যত অযোগ্য; কিন্তু অনুগত বিবেচনা করেই। যোগেন্দ্রনাথ ম-ল দীর্ঘদিন মন্ত্রিত্ব করে সঙ্গোপনে ভারতে চলে যান; তিনি নিরুদ্দিষ্ট হওয়ার পর তার একটি পদত্যাগপত্র আবিষ্কৃত হয়। অপরজন ফজলুর রহমান রাষ্ট্রভাষা উর্দুর প্রবক্তাদের একজন। ১৯৪৭-এর ডিসেম্বরে মন্ত্রীর সংখ্যা ৭ থেকে ১০-এ উত্তীর্ণ করা হয়। নতুন যোগ দেওয়া পীরজাদা আবদুস সাত্তার এবং চৌধুরী মুহাম্মদ জাফরুল্লাহ পশ্চিম পাকিস্তানের, তৃতীয় জন ঢাকার খাজা শাহাবুদ্দিন অন্তত বাঙালি সংস্কৃতির ধারক ও বাহক নন।
ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হলেও মুসলিম লীগের প্রথম প্রেসিডেন্ট আগা খান এবং জেনারেল সেক্রেটারি সৈয়দ হাসান বিলগ্রানি। মুসলিম লীগের সদর দপ্তর প্রথমে আলীগড় সাব্যস্ত হয়, পরে লক্ষ্মৌতেই স্থানান্তরিত হয়।
সর্বভারতীয় মুসলিম লীগে কিংবা পরবর্তী সময়ে পাকিস্তান মুসলিম লীগে বাঙালি মুসলমানের কার্যকর কোনো নেতৃত্ব ছিল না, এটা স্বীকার করতেই হবে। যদি ভারতের কথাও ভাবা যায়, গোখলের বাঙালি বন্দনার পর ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে বাঙালি হিন্দুরও যোগ্য প্রতিনিধিত্ব ছিল না। ১৯৪৭-এর দুই প্রধান বাঙালি কংগ্রেস নেতা প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ ও এবং বিধান চন্দ্র রায় ছিলেন প্রাদেশিক নেতা, কোনোভাবেই কেন্দ্রীয় নন। অথচ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম প্রেসিডেন্ট পুরোদস্তুর বাঙালি উমেশ চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর মতো নেতা কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট থাকার পরও ছিটকে পড়েছেন নেহরু-প্যাটেলদের কনুইয়ের গুঁতোয়।
১৯৪৭-এ বাঙালির নেতৃত্ব ব্যর্থতার কারণ হিসেবে যত ষড়যন্ত্র তত্ত্বই উপস্থাপন করা হোক না কেন, তারা আসলে মার খেয়ে গেছেন যোগ্যতা ও কৌশলের ঘাটতির কারণে, সর্বভারতীয় মুসলিম লীগেও, সর্বভারতীয় কংগ্রেসেও।
লেখক
সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ও কলামনিস্ট