কেউ বলছেন ‘হেডিংলি মিরাকল’। কেউ বলছেন ‘স্পেশাল ওয়ান’। কারও চোখে আবার জল এনে দিচ্ছে বেন স্টোকসের ইনিংস। ‘দ্য এজে’র ক্রিকেট কলামনিস্ট গ্রেগ বম ইনিংসটা দেখার পর বলেছেন, ‘এবার শান্তিতে মরতে পারব...এর চেয়ে ভালো ক্রিকেট আর হয় না।’
তবে বেন স্টোকসের মহিমাময় ইনিংস সংকটেও ফেলেছে বহু ক্রিকেটবোদ্ধা আর সংবাদমাধ্যমকে। কেউ আসলে নিশ্চিত হতে পারছে না কীভাবে ১৩৫ রানের অপরাজিত ইনিংসটার বর্ণনা করা উচিত। বিশেষণের অভাব অনুভব করছেন তারা। এমন হয়, যখন শব্দ দিয়ে আর অনন্য ব্যাটিং প্রদর্শনীকে ধরা যায় না। তাই বেন স্টোকসের ইনিংস নিয়ে যা কিছুই লেখা হোক অপর্যাপ্ত মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। হচ্ছেও তাই। জেফ্রি বয়কট বলেছেন, ‘জীবনে আমি অনেক অবিস্মরণীয় ক্রিকেট মুহূর্ত দেখেছি। তবু মনে হয় গত ৫০ বছর ধরে দেখা সেইসব মুহূর্তগুলোর মধ্যে এটাই সেরা। জাদুকরী ইনিংস খেলে অ্যাশেজটা বাঁচিয়ে দিয়েছে বেন স্টোকস। আমার মনে হয় এটা বিশ্বকাপ ফাইনালের চেয়েও ভালো পারফরম্যান্স।’ কিংবদন্তি ফুটবলার গ্যারি লিনেকার ‘অ্যাবসলিউট হিরো’ বলে অভিহিত করেছেন স্টোকসকে।
বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক মুশফিক রহিম এক টুইটবার্তায় বেন স্টোকসের ইনিংসের মাহাত্ম্য বর্ণনা করেছেন এভাবে ‘কে বলে টেস্ট ক্রিকেট মরে যাচ্ছে... তাকে বলি বসুন, অ্যাশেজ উপভোগ করুন...এই ভদ্রলোক কী ইনিংসটাই না খেলল, ৪র্থ টেস্ট দেখার অপেক্ষায়।’
ইংলিশ মিডিয়াও ১৩৫ রানের বীরত্বব্যঞ্জক ইনিংসের বর্ণনায় শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না। দি সানের শিরোনাম, ‘গো আর্ন মাই সান’। কাছাকাছি বাংলা হতে পারে, ‘অ্যাশেজ জিতে নাও বৎস!’ ডেইলি টেলিগ্রাফের শিরোনাম ‘হাউইজদ্যাট’। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম স্টোকসের ইনিংসের সঙ্গে ইয়ান বোথামের তুলনা টেনেছেন। এই হেডিংলিতে ৩৮ বছর আগে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৪৯ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস খেলেছিলেন বোথাম। ইংল্যান্ড সেই টেস্ট জিতেছিল। এখনো ‘বোথাম টেস্ট’ বললে ১৯৮১ সালের হেডিংলি টেস্টের স্মৃতিচারণ করা হয়। সেই বোথাম রবিবার স্টোকসের ইনিংসকে বলেছেন ‘স্পেশাল ওয়ান’। সাবেক ইংলিশ অধিনায়ক মাইক আর্থারটন, যিনি আবার লন্ডন টাইমসের কলামনিস্টও, তিনি স্টোকসের ১৩৫ রানের অপরাজিত ইনিংসকে বলেছেন ‘টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম সেরা’। ক্রিকেটের বাইবেল উইজডেন কী বলছে স্টোকসের ইনিংস নিয়ে? উইজডেনের সম্পাদক লরেন্স বুথ বলেছেন, ‘১৩৭ বছরের অ্যাশেজ ইতিহাসের সেরা ইনিংসগুলোর মধ্যে এটা প্রথম পাঁচের মধ্যে থাকবে।’ অভিজাত ব্রিটিশ সংবাদপত্র গার্ডিয়ানের ক্রিকেট প্রতিবেদক লিখেছেন, ‘স্টোকসের ইনিংস আমার চোখ ভিজিয়ে দিল।’ হেডিংলি টেস্ট জয়ের সাফল্য কেবল ক্রিকেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না ডেইলি মেইল। পত্রিকাটির বিশেষ প্রতিবেদক লিও ম্যাকিস্ট্রে লিখেছেন, ‘ব্রিটেনের সমৃদ্ধ ক্রীড়া ঐতিহ্য বহু গৌরবময় মুহূর্তের জন্ম দিয়েছে। যার মধ্যে ১৯৬৬ সালে বিশ্বকাপ জয় এবং ২০১২ সালের লন্ডন অলিম্পিকের সাফল্য থাকবে। কিন্তু যদি র্যাঙ্কিং করা হয় তাহলে লিডসের শ্বাসরুদ্ধকর জয়টা ওপরের দিকেই রাখব।’ দি টাইমসের প্রতিবেদক ম্যাট ডিকিনসন স্টোকসের ইনিংসের প্রশংসা করতে গিয়ে টেনেছেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা এবং উসাইন বোল্টের প্রসঙ্গ। তিনি মনে করেন প্রয়োজনের মুহূর্তে এমনভাবে জ্বলে ওঠার ক্ষমতায় স্টোকস ভিন্ন দুই দেশের কিংবদন্তির সঙ্গে তুলনীয়। হেডিংলিতে টেস্ট জেতানোর মাত্র ৪৪ দিন আগে লর্ডসে ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপ জেতানোর ক্ষেত্রেও বড় ভূমিকা রেখেছিলেন স্টোকস। নাটকীয় ফাইনালে ম্যাচসেরাও হয়েছিলেন তিনি।
কেবল ব্রিটিশ পত্র-পত্রিকা নয়, প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যমও বেন স্টোকসের কীর্তির প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সিডনি মর্নিং হেরাল্ড টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স বলে আখ্যায়িত করেছে স্টোকসের ম্যাচ জেতানো ইনিংসকে। পত্রিকাটি লিখেছে, ‘স্টোকসের ব্যাট হাতে ওয়ানম্যান মিশন আর বল হাতে সিংহ-হৃদয় পারফরম্যান্স তাকে এবার নাইট হুড এনে দেবে।’ তবে সবচেয়ে ভালো লিখেছে বোধহয় সিডনির ডেইলি টেলিগ্রাফ। স্টোকসের বিস্ময়কর ইনিংস তাদের ভাষায়, ‘এমন সাহসী, গ্লামারাস আর গৌরবময় পারফরম্যান্স টেস্ট ইতিহাসে খুব বেশি নেই।’