শহীদ পরিবারের জমি দখলে সহায়তা ডিসি ইব্রাহিমের

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) লালবাগ বিভাগে উপকমিশনার (ডিসি) থাকার সময় ১২ দফায় সেরা ডিসি হওয়ার গৌরব অর্জন করা কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইব্রাহিম খানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। গতকাল সোমবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পুলিশ অধিশাখার সচিব মোস্তফা কামালউদ্দিন স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। মোহাম্মদ ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি বিশেষ সুবিধা নিয়ে এক শহীদ মুক্তিযোদ্ধার বাড়ি দখলে সহযোগিতা করেছেন। এই পুলিশ কর্মকর্তা সর্বশেষ ডিএমপির ওয়ারী ক্রাইম জোনের উপপুলিশ কমিশনার পদে কর্মরত ছিলেন।

আদেশে বলা হয়েছে, ‘উপপুলিশ কমিশনার ওয়ারী ঢাকাকে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা-আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী সাময়িক বরখাস্ত করা সমীচীন মর্মে প্রতীয়মান হওয়ায় চাকরি থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হলো। সাময়িক বরখাস্তকালীন সময় তিনি পুলিশ অধিদপ্তরে সংযুক্ত থাকবেন এবং প্রচলিত বিধি অনুযায়ী খোরপোষ ভাতা প্রাপ্য হবেন।’

মোহাম্মদ ইব্রাহিম বিগত জুলাই মাসে ডিএমপির অপরাধ পর্যালোচনা সভায় ত্রয়োদশবারের মতো ডিএমপির শ্রেষ্ঠ ডিসি মনোনীত হয়ে পুরস্কার লাভ করেন।

অভিযোগ রয়েছে, ইব্রাহিম খান লালবাগ বিভাগের ডিসি থাকাকালে একটি ভূমি দস্যুচক্রকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের বাড়ি দখলে সহায়তা করেন। বংশাল থানার ২২১, নবাবপুর রোডের জমিটি লিজমূলে মালিক ছিল শহীদ বুদ্ধিজীবী এ টি এম শামসুল হকের পরিবার। শামসুল হক ১৯৭১ সালে শহীদ হন। পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার পরিবারের নামে ওই বাড়িটি বরাদ্দ দেন। সেখানে চার কাঠা সম্পত্তির ওপরে একটি তিনতলা মার্কেট ছিল। বাড়িটি প্রথমে লিজ দেওয়া হয়েছিল শামসুল হকের স্ত্রীর নামে। তিনি মারা যাওয়ার পর তার ছেলে আজহারুল হকের নামে লিজ নবায়ন করা হয়। ওই সম্পত্তিতে মাসুদা করপোরেশন নামের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছিল। যা আজহারুল হকের ছেলে শামসুল হাসান খান পরিচালনা করতেন। ২০১৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর এই সম্পত্তিতে হানা দেয় স্থানীয় ভূমিদস্যু আবেদ-জাবেদ। তারা দুই ভাই পুরান ঢাকার চিহ্নিত ভূমিদস্যু বলে অভিযোগ রয়েছে। আবেদউদ্দিন ও জাবেদউদ্দিন ওই বাড়ির আশপাশের অন্যান্য জমিও দখল করে নিয়েছে। জানা যায়, তাদের দখলে ২২০, ২২২, ২২৩ ও ২২৪ হোল্ডিংও রয়েছে। যার মধ্যে ২২০ নম্বর হোল্ডিংয়ে বহুতল ভবন করে তা ভাড়া দিয়েছে। গত বছর ২৮ সেপ্টেম্বর শহীদ পরিবারের ওই সম্পত্তির ওপর থাকা তিনতলা ভবনটি মাটির সঙ্গে গুঁড়িয়ে দেয় আবেদ-জাবেদ। ওই সময় ওই ভবনে ৫ কোটি টাকার মালামাল ছিল। যার সব লুট করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন শামসুল হাসান খান। তারা ওই রাতে পুলিশের কাছে সহায়তা চেয়েও পাননি। পরে তারা আদালতের দ্বারস্থ হলে আদালত নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কিন্তু সেই নিষেধাজ্ঞা জারির পরেও আবেদ-জাবেদ সেখানে ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করে। এমনকি তারা বেজমেন্ট তৈরি করে ফেলে। এ বিষয়ে পুলিশ কমিশনারের কাছে অভিযোগ করা হলে তিনি স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের কাছে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চান। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন কমিশনারকে জানায়, ‘কাজ বন্ধ রয়েছে। পরে পুলিশ কমিশনার একটি বিশেষ টিম পাঠিয়ে দেখতে পান ভবন নির্মাণের কাজ ঠিক চলছে।’ ওই ঘটনার পরই ডিসি ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়।

মুক্তিযোদ্ধার বাড়ি দখলে পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও পক্ষপাতমূলক আচরণের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করে মুক্তিযোদ্ধার পরিবার। তারা এ ঘটনায় পুলিশ সদর দপ্তরে ডিসির বিরুদ্ধে অভিযোগ করে। অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটি করে পুলিশ সদর দপ্তর।

তদন্ত কমিটি ডিসি ইব্রাহিম খানের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার, তদন্তে অসহযোগিতা ও দায়িত্ব অবহেলার প্রমাণ পায়। তার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় চলতি বছর ২৩ মে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি (পারসোনাল ম্যানেজমেন্ট-১) আমিনুল ইসলাম তাকে একটি চিঠি দিয়ে এসব অপরাধের বিষয়ে ব্যাখ্যা জানতে চান।

চিঠিতে বলা হয়, ভুক্তভোগীর এসব অভিযোগ শুনেও ডিসি ইব্রাহিম বংশাল থানার ওসিকে ব্যবস্থা নিতে কোনো নির্দেশনা দেননি বা নির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। পুলিশ সদর দপ্তরে ডিসি যে তদারকি প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন, সেটা তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন না করে জমা দিয়ে অসত্য তথ্য উপস্থাপন করেছেন। এছাড়াও তিনি দায়িত্বে অবহেলা করেছেন। ব্যাখ্যার জন্য ডিসি ইব্রাহিমকে ১০ কার্যদিবস সময় দেওয়া হয়। তার ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হওয়ায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাকে বরখাস্ত করার সুপারিশ করে সদর দপ্তরে।