ভুয়া সমবায় ব্যাংক নিবন্ধন দিয়ে অবসরে গিয়ে বড় কর্তা

ঢাকা জেলা সমবায় দপ্তরের সাবেক চার কর্মকর্তা দি ঢাকা আরবান কো-অপারেটিভ ব্যাংক লিমিটেডের নামে অবৈধ ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনায় প্রতারণা ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কমিশনের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ওই চারজন চাকরিতে থাকাকালে জালিয়াতির মাধ্যমে নিবন্ধন দিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে অবৈধ ব্যাংকিং করার সুযোগ করে দেন। তাদের মধ্যে দুজন অবসরে যাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তথা এমডিসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে বসে সুযোগ-সুবিধা নেন। সমবায় অধিদপ্তর থেকে ভুয়া নিবন্ধন নিয়ে সমবায় প্রতিষ্ঠানটি তফসিলি ব্যাংকের মতো সারা দেশে শাখা খুলে অবৈধ ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও দুদকের উপপরিচালক সেলিনা আক্তার গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দি ঢাকা আরবান কো-অপারেটিভ ব্যাংকের অনিয়ম ও জালিয়াতি নিয়ে সিরিজ মামলা হবে। রবিবারের মামলাটি করা হয়েছে শুধু প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদন সংক্রান্ত জালিয়াতির বিষয়ে। এখানে আর্থিক জালিয়াতির

 অভিযোগ (চার্জ) আনা হয়নি। কারণ তারা সারা দেশে একশর বেশি শাখা খুলে কমপক্ষে হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। আর্থিক অভিযোগ আনার জন্য পরিষ্কারভাবে বলতে হবে, কোন শাখা থেকে কত গ্রাহকের কত টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। সমবায় অধিদপ্তরে কয়েক দফায় চিঠি দেওয়ার পরও তারা চাহিত তথ্য সরবরাহ করেনি। এই বিষয়ে তারা অসহযোগিতা করছে। প্রতিষ্ঠানটির মোট শাখার সংখ্যা পর্যন্ত দেয়নি। আমরা প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি, ঢাকার মতিঝিল, কারওয়ান বাজার, মিরপুর, পুরান ঢাকা, আশুলিয়া, খুলনা, বাগেরহাট, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহের গফরগাঁওসহ গ্রামেগঞ্জে পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠানটির একশর বেশি শাখা ও লক্ষাধিক গ্রাহক রয়েছে। এসব শাখার মাধ্যমে তারা গ্রাহকদের আমানত রাখা হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শিগগিরই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বাগেরহাট ও নারায়ণগঞ্জে মামলা করা হবে। শুধু নারায়ণগঞ্জ শাখা থেকে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করার তথ্য আমরা পেয়েছি। এগুলো নিয়ে বিস্তারিত কাজ চলছে। আমরা ব্যাংকের মোট গ্রাহক সংখ্যা, শাখা, আত্মসাৎকৃত টাকার পরিমাণ নিরূপণ করে দায়ীদের শনাক্তে কাজ করছি। সেগুলো মামলার চার্জশিটে ও পরবর্তী মামলার এজাহারে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’

এ বিষয়ে সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধন ও মহাপরিচালক আমিনুল ইসলাম গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দি ঢাকা আরবান কো-অপারেটিভ ব্যাংকের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় ঢাকা জেলা সমবায় কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের জড়িত থাকা ও দুদকের মামলার তথ্য আমার জানা নেই।’ তিনি বলেন, “সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধন নিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যাংক শব্দ ব্যবহার করতে পারে না। কারণ আমরা কোনো ব্যাংক অনুমোদন দেওয়ার কর্র্তৃপক্ষ নই। এটা দেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্স ডিভিশন। সমবায়ের অনুমোদন নিয়ে দি ঢাকা আরবান কো-অপারেটিভ ব্যাংকসহ কিছু প্রতিষ্ঠানের ‘ব্যাংক’ শব্দ ব্যবহার ও অবৈধ ব্যাংকিং করে প্রতারণার অভিযোগ আমরা পেয়েছি। আমরা যখনই তাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যাই, তখন তারা হাইকোর্টে রিট করে আমাদের আটকে দেয়। সমবায়ের নিবন্ধন নিয়ে ব্যাংকিং করা সম্পূর্ণ অবৈধ ও বেআইনি।” 

ঢাকা জেলা সমবায় দপ্তরের চার কর্মকর্তা ও ব্যাংকের তিন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গত রবিবার মামলাটি করেন দুদকের উপপরিচালক সেলিনা আক্তার। আসামিরা হলেন আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার মগধরা গ্রামের রফিকুল আলম, তার স্ত্রী ও মিরপুরে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়ের সভাপতি তাহমিনা বেগম, ব্যাংকের নারায়ণগঞ্জ শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক ও কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার পেটিকরা গ্রামের মিজানুর রহমান ভূঁইয়া, ঢাকার সাবেক সমবায় কর্মকর্তা (বর্তমানে সমবায় অধিদপ্তরের যুগ্ম নিবন্ধক) বরগুনার বেতাগী উপজেলার বদনিখালী গ্রামের মিজানুর রহমান, সাবেক জেলা অডিটর ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার উথলী গ্রামের লুৎফর রহমান, ঢাকা জেলা সমবায় অধিদপ্তরের সাবেক উপসহকারী নিবন্ধক ও লালবাগের নন্দকুমার রোডের খবির খান এবং ঢাকার সমবায় অধিদপ্তরের সাবেক পরিদর্শক ও ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার মনিপুর গ্রামের মহসিন মজুমদার।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, লুৎফর রহমান ও খবির খান সরকারি কর্মচারী হিসেবে ভুয়া সমবায় ব্যাংকটি গঠনের সময় জাল কাগজপত্র তৈরিতে সহায়তা করেন। ২০০৬ সালে অবসরে যাওয়ার পর লুৎফর প্রতিষ্ঠানটির এমডি হিসেবে নিয়োগ পান। আর ২০১০ সালে অবসরে যাওয়ার পর খবির খান ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে যুক্ত হন।

দুদকের অনুসন্ধানে বলা হয়, ২০০৬ সালে ৭ মার্চ রফিকুল আলম (কথিত সদস্য নম্বর ৩৮০) নিজেকে সভাপতি ঘোষণা দিয়ে ঢাকার সমবায় দপ্তরে আবেদন করেন। রাজধানীর ১১০৭, রিং রোড শ্যামলীর ঠিকানা ব্যবহার করে ‘দি ঢাকা আরবান কো-অপারেটিভ ব্যাংক লিমিটেডের’ প্যাডে আবেদনটি করা হয়। এতে বলা হয়, ১৯৬৯ সালের ২৭ অক্টোবর এটি নিবন্ধন পেয়েছে, যার নম্বর ৭১০। সমবায় কর্র্তৃপক্ষ সমবায় আইনের ৮৯ ধারায় প্রতিষ্ঠানটি লিকুইডেশনে (সম্পদ ও দায়-দেনা নির্ধারণ করা) ন্যস্ত এবং একই আইনে একজন লিকুইডেটর (অবসায়ক) নিয়োগের বিষয়টিও আবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে কথিত সমবায় ব্যাংকটি কবে ও কেন লিকুইডেশন করা হয়েছে এবং কাকে লিকুইডেটর নিয়োগ করা হয়েছে, সে বিষয়ে কিছুই উল্লেখ করেননি রফিকুল। কিন্তু তিনি নিয়োগকৃত লিকুইডেটরের কাছ থেকে ব্যাংকের কাগজপত্র ও আসবাবপত্র ফেরত নেওয়ারও আবেদন করেন।

অনুসন্ধানে দুদক জানতে পেরেছে, এ নামে কোনো ব্যাংক বা সমবায় প্রতিষ্ঠান কখনোই নিবন্ধন পায়নি বা এ সংক্রান্ত কোনো নথি সমবায় অধিদপ্তরে সংরক্ষিত নেই। ২০০৬ সালের ৬ জুলাই মিজানুর, লুৎফর, খবির, মহসিন পরস্পর যোগসাজশে রফিকুলের ওই আবেদনের বিষয়বস্তু বিবেচনায় না নিয়ে ভুয়া নিবন্ধন ও লিকুইডেশন তৈরি করে অবৈধ ব্যাংকিং করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেন। প্রতিষ্ঠানটির নামে কোনো নথি না থাকা সত্ত্বেও তারা ১৯৯০ সালের ১১ জুনের একটি ভুয়া নম্বর (লিকুইডেশন নং-৩৩৩৮) দেখান। এর মাধ্যমে ১৯৪০ সালের ‘দি বেঙ্গল কো-অপারেটিভ অ্যাক্ট’ অনুযায়ী রফিকুলকে ‘ব্যাংক’ শব্দটি ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়া হয়। এ আদেশের পর রফিকুল অসৎ উদ্দেশ্যে উচ্চ সুদে স্থায়ী ও সঞ্চয়ী আমানত সংগ্রহ, চেক বই দেওয়া ও মাসিক সুদ প্রদানসহ বাণিজ্যিক ব্যাংকের মতো কার্যক্রম শুরু করেন।

দুদক কর্মকর্তারা জানান, ব্যাংকের শাখা খুলে মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করে কিছুদিন পর তারা সেটি বন্ধ করে দেন। এরপর আবার অন্য এলাকায় শাখা খুলে একইভাবে প্রতারণা করেন। রফিকুলের স্ত্রী তাহমিনা বেগম এবং মিজানুর রহমান ভূঁইয়া ব্যাংকের বিভিন্ন পদে থেকে অর্থ আত্মসাতে সহযোগিতা ও নিজেরাও আত্মসাৎ করেন। প্রতিষ্ঠানটির প্রতারণামূলক এসব কর্মকাণ্ড সমবায় অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের নজরে ছিল। এটি নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্বও ছিল তাদের। সমবায় কর্মকর্তারা নিয়ম মেনে প্রতিষ্ঠানটি অডিটও করেন।

রেকর্ডপত্র ভুয়া হওয়ায় ১৯৬৯ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি একবারের জন্যও অডিট হয়নি। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটিকে বৈধতা দিতে অডিটর মহসিন মজুমদার ২০০৭ সালের ২৩ মে একটি অডিট প্রতিবেদন তৈরি করেন। এতে ৩৬ বছরের অডিট একসঙ্গে করার কথা বলা হয়, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা তথ্যনির্ভর ছিল। ওই প্রতিবেদনের ১১ নম্বর কলামে সমিতির সদস্য সংখ্যা উল্লেখ নেই মর্মেও বলা হয়।

দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা জানান, ব্যাংকটির মিরপুর শাখার অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে গ্রাহকরা সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধক, জেলা সমবায় অফিসার ও থানা সমবায় অফিসারের কাছেসহ বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করেন। কিন্তু বিষয়টি আমলে না নিয়ে বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যক্রম পরিচালনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা করেন তারা। এমনকি ২০০৬ সাল থেকে ২০১৫-১৬ সাল পর্যন্ত অডিট প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটিকে ‘ব্যাংক’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। ছয়-সাত বছর ধরে নানা অভিযোগ আসার পরও প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ না করে বা অর্থ আত্মসাতের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নুতন নতুন শাখা খুলতে সহায়তা করেন ওই কর্মকর্তারা। আইন অনুযায়ী, সমবায়ের নামে কোনো ব্যাংকিং করা যায় না। এমনকি এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো অনুমোদন বা ব্যাংক গঠনের কোনো শর্তও পূরণ করা হয়নি।