ডেঙ্গু আক্রান্ত ১৬ এলাকায় এখনো মশা-লার্ভা-বর্জ্য

রাজধানীর যেসব এলাকায় এবার ডেঙ্গু রোগী বেশি পাওয়া গেছে, সেসব এলাকায় ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার প্রজননের সবগুলো পরিবেশ এখনো বিদ্যমান। এসব এলাকার বেশ কিছু রাস্তাঘাট, ফুটওভার ব্রিজের নিচে, বাসাবাড়ি ও অফিস-কলকারখানায় মশা ও মশার লার্ভা, এডিসের বংশবিস্তারের জন্য পানির বোতল, ডাবের খোসা ও উন্মুক্ত স্থানে জমে থাকা স্বচ্ছ পানি এবং ময়লার ভাগাড় সব উপাদানই রয়েছে। খোঁজ মিলেছে ডেঙ্গু রোগীর। এলাকাগুলো হলো রাজধানীর উত্তরা, তেজগাঁও, বেগুনবাড়ি, মধুবাগ, মালিবাগ, মগবাজার, শাহজাহানপুর, কমলাপুর, রাজারবাগ, গে-ারিয়া, লালমাটিয়া, বনানী, গুলশান, বাড্ডা, রামপুরা ও মহাখালী।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের এসব এলাকায় সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগীর তথ্য জানিয়েছে। আইইডিসিআরের পর্যালোচনায়, এবারই প্রথম গোটা রাজধানীর সবগুলো এলাকায় ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী মিলেছে উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায়। আর দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মধ্যে বেশি রোগী মিলেছে গেণ্ডারিয়ায়। ডিএনসিসিতে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন উত্তরার ৯৫ নং ওয়ার্ড, রামপুরা ও মগবাজার এলাকার মানুষ। আর ডিএসসিসি এলাকায় সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে মাতুয়াইল ও দয়াগঞ্জের মধ্যবর্তী গে-ারিয়া এলাকায়। এবার মধ্য ঢাকা অর্থাৎ বারিধারা, বনানী, গুলশান, বাড্ডা, মহাখালী, নাখালপাড়া, তেজগাঁও, রামপুরা, মেরাদিয়া, খিলগাঁও, মগবাজার ও মালিবাগে ডেঙ্গু আক্রান্তের হার বেশি। অন্যদিকে, এ বছর ডেঙ্গুতে সবচেয়ে কম আক্রান্ত হয়েছেন ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ-পূর্ব অংশের মানুষ।

গত কয়েকদিনে এসব এলাকা ঘুরে ডেঙ্গু ও মশার এই চিত্র পাওয়া গেছে। এসব এলাকার মানুষ এখনো ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লেও সে অনুপাতে মশা নিধন ও মশার লার্ভা-প্রজনন স্থান ধ্বংসে দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট নন। অনেক এলাকায় সিটি করপোরেশনের লোকজন মূল সড়কে ওষুধ ছিটিয়ে চলে যান, এলাকায় আসেন না। ডেকেও মশা নিধন দলকে আনা যায় না। বর্জ্য অপসারণ করা হচ্ছে না। এমনকি এসব এলাকায় ডেঙ্গুর লার্ভা পাওয়ায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করেছে সিটি করপোরেশন।

আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের তথ্য পর্যালোচনা করে এলাকাভিত্তিক ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা নির্ণয় করেছি। যে সব এলাকায় বেশি রোগী পাওয়া গেছে, সেখানে মশা আগেও ছিল। এবার বেশি হয়েছে। এসব এলাকার বাসাবাড়ি ও  বাসিন্দারের কর্মস্থলের দিকে নজর রাখতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে হলে অবশ্যই মশা নিধন করতে হবে। মশার লার্ভা ধ্বংস করতে হবে। কারণ ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশা ১০০-৪০০ মিটার পর্যন্ত উড়তে পারে। সুতরাং কোথাও এডিস থাকলে সেখান থেকে উড়ে অন্যত্র ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটাতে পারে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে হলে সব জায়গা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। বিশেষ করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ভালো করে করতে হবে। কারণ বর্জ্যরে মধ্যে ডাবের খোসা, বোতল বা ভাঙা জিনিসপত্রের মধ্যে স্বচ্ছ পানি জমতে পারে। সেখানে এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে।

এসব এলাকায় মশা নিধন কাজ জোরেশোরে চলছে বলে দাবি করেছেন দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মীর মুস্তাফিজুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা এলাকায় এলাকায় যাচ্ছি। ওষুধ ছিটাচ্ছি। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করছি। সব সংস্থাকে নিজ নিজ দপ্তর পরিষ্কার রাখার ও মশা নিধনের উদ্যোগ নিতে চিঠি দিয়েছি। মূল দায়িত্ব তাদের। আমরা তাদের সহযোগিতা করব। গে-ারিয়ায় মশা নিধন কাজ চলছে। কোথাও কোনো গাফিলতি থাকলে দেখব।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল হাই দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত মঙ্গলবার থেকে ডেঙ্গু মোকাবিলায় আমাদের চিরুনি অভিযান শুরু হয়েছে। আমরা ‘ডোর টু ডোর’ যাব। আমাদের আওতাধীন সব বস্তিতে লোক পাঠাচ্ছি। লোকবল বাড়িয়েছি। কোথাও কোনো সমস্যা হলে আমাদের জানাবেন।

গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, উত্তরার মানুষ এখনো ডেঙ্গু আতঙ্কে রয়েছেন। উত্তরার ১২ নং সেক্টরের ১৩ নম্বর সড়কের বাসিন্দা শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী মাঈন আহমেদ ঈদের দিন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে লুবানা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও এখনো হাসপাতাল ছাড়ার মতো অবস্থা হয়নি বলে জানান মাহিনের মামা ও একই সড়কের বাসিন্দা মাজেদুর রহমান শুভ। শুভ দেশ রূপান্তরকে বলেন, মশার যন্ত্রণায় জীবন অতিষ্ঠ। কিন্তু কেউ মশা মারছে না। প্রতিটি সড়কের আশপাশে দীর্ঘদিন পানি জমে থাকলেও কেউ পরিষ্কার করে না। এমনকি সেক্টর কল্যাণ সমিতির সামনেই পানি জমে মশা জন্মালেও কখনো তারা পরিষ্কার করছে না। আর কাউকে কখনো মশা মারতেও দেখিনি। এডিসের লার্ভা পাওয়ায় গত বৃহস্পতিবার এই এলকার কয়েকটি হাসপাতালকে জরিমানা করে ডিএনসিসি ভ্রাম্যমাণ আদালত।

সরেজমিনে গতকালও শাহজাহানপুর রেলওয়ে বস্তির সর্বত্র কোরবানির পশুর হাটের বর্জ্য চোখে পড়েছে। ঈদের ১৪ দিন পার হলেও এসব বর্জ্য এখন সরানো হয়নি। এসব বর্জ্য বৃষ্টিতে  ছড়িয়ে পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। পয়ঃনিষ্কাশন নালা বন্ধ হয়ে তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। বদ্ধ নালায় মশার লার্ভা দেখা গেছে। বস্তির বাসিন্দা ইদ্রিস মিয়া বলেন, বস্তিতে সিটি করপোরেশনের কোনো বর্জ্য ব্যবস্থাপনাই নেই। বস্তির আরেক বাসিন্দা রাবেয়া বেগম জানান, মশার জন্য বস্তিতে থাকা যায় না। অনেকেরই ডেঙ্গু ধরা পড়েছে। আশপাশের আবাসিক এলাকায় মশার ওষুধ দিলেও বস্তিতে এখনো সিটি করপোরেশন থেকে কোনো ওষুধ দেওয়া হয়নি। 

একই চিত্র দেখা যায় রাজারবাগ এলাকায়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ঈদের আগে কয়েকবার মশা মারার ওষুধ দেওয়া হলেও ঈদের পর কোনো ওষুধ দেওয়া হয়নি। অনেকে ডেঙ্গুজ¦রে আক্রান্ত। রাজারবাগ পুলিশ লাইনের পাশে আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মাকসুদ চৌধুরী জানান, আশপাশের হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্তের বেশির ভাগই রাজারবাগ এলাকার।

রাজধানীর গে-ারিয়ায় সতীশ সরকার এলাকার বাসিন্দারা জানান, এই এলাকায় অনেকেই ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত। নিয়মিত এখানে ওষুধ দেওয়া হলেও মশার প্রাদুর্ভাব কমছে না। গে-ারিয়া ধূপখোলা এলাকার বাসিন্দা জাহিদ আব্দুল্লাহ জানান, মশা নিধনে সিটি করপোরেশন থেকে নিয়মিত ওষুধ দেওয়া হলেও সেটা  শুধু রাস্তায় দেওয়া হয়। গলির ভেতরে ওষুধ দিতে দেখা যায়নি। তাছাড়া ঈদের পর শুধু একবারই ওষুধ দিতে দেখা গেছে।

একই চিত্র দেখা যায় রাজধানীর লালমাটিয়া এলাকায়। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এ এলাকার দুজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানান এলাকাবাসী। এলাকার বাসিন্দা সবুর খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ এলাকায় বছরের শুরু থেকে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ছিল। এখনো অনেকেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে রয়েছে। সিটি করপোরেশনের লোক মাঝেমধ্যে রাস্তায় ধোঁয়া দিয়ে (ফগিং) চলে যায়। ভেতরে আসে না।

কারওয়ান বাজারের বিজিএমইএ ভবনের পূর্ব পাশের হাতিরঝিলের পাশে অনেকগুলো পরিত্যক্ত পানির জার, ডাবের খোসা ও প্লাস্টিকের বোতল দেখা গেছে। এগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন যাবৎ পানি জমে থাকায় মশার লার্ভা তৈরি হয়েছে। কারওয়ান বাজার রেললাইন পার হয়ে এফডিসির গেট বরাবর মগবাজার-মালিবাগ ফ্লাইওভারের যে অংশ কারওয়ান বাজারে নেমেছে, সেই অংশের দুটি পিলারের নিচে পানি জমে রয়েছে। এর একটিতে মশার লার্ভা দেখা গেছে। আরেকটিতে মশা ভাসতে দেখা গেছে। একই অবস্থা হাতিরঝিল পুলিশ ফাঁড়ির পূর্ব পাশের গর্তে পড়ে থাকা প্লাসিকের কৌটায়।

মশার যন্ত্রণায় সন্ধ্যার পর কয়েল ছাড়া বাসায় থাকা অসম্ভব বলে জানান ওই এলাকার দক্ষিণ কুনীপাড়া এলাকার বাসিন্দা আশিক। শরিফুল নামের এক চায়ের দোকানদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, সকালে দোকান খুলি রাতে যাই। কিন্তু মশা মারতে দেখি না। ঈদের পর মাত্র একদিন মশা মারতে আইছিল। কি একটু ধোঁয়া দিয়া গেছে। একটু পরেই আবার মশার যন্ত্রণা। ভয়ে থাকি কখন আবার ডেঙ্গুতে ধরে। পেটের দায়ে দোকান চালাই। নইলে গ্রামের বাড়ি যাইতাম।

মধুবাগের আমবাগান এলাকার মানুষ মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তালিকায় এই এলাকায়ও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা অনেক। আমবাগ মসজিদে নামাজ পড়তে আসা এক মুসল্লি দেশ রূপান্তরকে বলেন, কিছুদিন আগে আমি নিজেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছি। এখানে নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটানো হয় না। যাও ছিটায় তাতে মশা মরে না। তাই এখন কয়েল ও অ্যারোসল ব্যবহার করছি।

মালিবাগ আবুজর গিফারী কলেজ এলাকার বাসিন্দা শাহরিয়ার কবির নোমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতিদিন এই এলাকয় কেবল রাস্তায় মশার ওষুধ ছিটানো হয়। আমার বাসা ছোট একটি গলির মধ্যে। সেখানে কখনো কাউকে ওষুধ নিয়ে আসতে দেখিনি। আর ওষুধ ছিটানো হয় যেখানে অনেক লোকজন সেখানে। ওষুধে মশা মরে বলেও মনে হয় না।

মহাখালী দক্ষিণপাড়া বাস টার্মিনালে স্বাধীন বাংলা পেট্রল পাম্পের পাশে টিনের বেড়া ও ছাউনি দিয়ে ঘেরা একটি খাবার হোটেল। হোটেলের পেছন দিকে ময়লার স্তূপ জমা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ। হোটেল মালিক মো. জাহাঙ্গীর আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই খালের পানিতে অনেক মশা। সিটি করপোরেশনের লোকজন কখনো এখানে মশক নিধনের ওষুধ দিতে আসেনি। ভয়ে থাকতে হয় সবসময়।

মহাখালীর সাত তলা বস্তিতে বসবাসরত রাবেয়া বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, অনেক মশা টের পাই বাসার মধ্যে। কয়েল জ্বালাতে হয়। আট থেকে দশদিন আগে দুই রিকশাচালকের ডেঙ্গুজ্বরের খবর পাই এই বস্তিতে।

বনানীতে বসবাসরত মিরপুর বাংলা কলেজের ছাত্র হৃদয় হোসেন বলেন, আমাদের বাসার দিকে মাঝে মাঝে সিটি করপোরেশন থেকে মশক নিধনের জন্য অভিযানে আসে। তবে ভেতরের বাড়িগুলোতে কম যায়। সামনে কিছু কিছু জায়গায় দিয়ে চলে যায়। কয়েকদিন আগে আমার এক বন্ধু ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়। সে এখন ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসাধীন।