পুরান ঢাকার বংশালে শহীদ বুদ্ধিজীবী এ কে এম শামসুল হক খানের পরিবারকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেওয়া বাড়ি ও জমির লিজ নবায়ন হয়নি প্রায় দুই বছরেও। দখল নিতে লালবাগ জোনের পুলিশের সহায়তায় বাড়িটিতে লুটপাট চালায় স্থানীয় ভূমিদস্যু সহোদর আবেদ, জাবেদ ও তাদের সহযোগীরা। লালবাগ জোনের পুলিশের বিরুদ্ধে ভূমিদস্যুদের সহায়তার অভিযোগ ওঠায় পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. জাবেদ পাটোয়ারীর নির্দেশে গঠিত হয় উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি। সেই কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে বরখাস্ত হন লালবাগ জোনের তৎকালীন উপকমিশনার (ডিসি) ইব্রাহিম খান। এছাড়া বংশাল থানার তৎকালীন ওসি শাহিদুর রহমানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানান পুলিশের এক কর্মকর্তা।
শহীদ বুদ্ধিজীবী শামসুল হক খানের ছোট ভাই আজহারুল হক খান দেশ রূপান্তরকে জানান, একদিকে ভূমিদস্যুরা বাড়িঘর দখল করে নিয়েছে। অন্যদিকে জেলা প্রশাসন থেকেও তাদের জমির লিজ
নবায়ন করা হচ্ছে না। বিভিন্নভাবে তাদের হয়রানি করা হচ্ছে।
আজহারুল হক খানের ছেলে শামসুল হাসান খান বলেন, ‘আমি অনেকবার ডিসি অফিসে গিয়েছি। প্রত্যেকবারই বলা হয়েছে, আদালতের মামলা নিষ্পত্তি হোক, তারপর করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আদালতে মামলা থাকা সত্ত্বেও গত বছর আবেদ-জাবেদ ওই জমি দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু যেই জেলা প্রশাসনের জমি রক্ষার দায়িত্ব ছিল, তারা সেটা করেননি।’
শামসুল হাসান জানান, পুরান ঢাকার নবাবপুরে ২২১ নম্বরের চার কাঠা জমির লিজ নবায়নের জন্য শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে তার বাবা আজহারুল হক খান ২০১৭ সালে ঢাকা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ে আবেদন করেন। সেই আবেদনে কোনো সাড়া না পেয়ে ২০১৮ সালে আবারও আবেদন করেন ২০১৮-১৯ সালের লিজ নবায়নের জন্য। কিন্তু এখন পর্যন্ত ঢাকার ডিসি তাদের আবেদনে সাড়া দেননি।
এ বিষয়ে ঢাকার ডিসি আবু ছালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই বাড়ির বিষয়ে হাইকোর্টে একটি মামলা আছে। আইনি মতামতের জন্য জন্য আমরা সলিসিটর উইংয়ে পাঠিয়েছি। বিষয়টি ইতিবাচকভাবেই দেখা হচ্ছে।’
শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের একাধিক সদস্য দেশ রূপান্তরকে জানান, মুক্তিযুদ্ধকালীন অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে শহীদ বুদ্ধিজীবী শামসুল হক খানের মা মাসুদা খানমের নামে ১৯৭৪ সালে পুরান ঢাকার নবাবপুরে ২২১ নম্বরে চার কাঠা জমি একসনা লিজ হিসেবে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মাসুদা খানমের মৃত্যুর পর তার ছোট ছেলে আজহারুল হক খান গংয়ের নামে ১৯৯৮ সালে এই জমির লিজ হস্তান্তর হয়।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে ও সংশ্লিষ্ট নথি ঘেঁটে জানা যায়, ১৯৭১ সালে এ কে এম সামসুল হক খান কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) দায়িত্ব পালন করছিলেন। পাকিস্তানি সরকারের কর্মকর্তা হয়েও তিনি গোপনে সরকারি রেশন সরবরাহ করে যাচ্ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের। এ তথ্য জানতে পেরে তাকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি সেনারা। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য ১৯৭৪ সালে এই শহীদ পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই জমি বরাদ্দ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
শহীদ পরিবারের অভিযোগ, ২০১৮ সালে রাতের অন্ধকারে বাসায় ঢুকে, মারধর ও লুটপাট চালিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয় তাদের। আর আড়ালে থেকে বাড়ি দখলের মূল ভূমিকা পালন করেছেন খোদ পুলিশের লালবাগ জোনের দুই শীর্ষ কর্মকর্তা। ভূমিদস্যুদের কাছ থেকে ৩ কোটি টাকা নিয়ে শহীদ পরিবারকে উচ্ছেদ করেছেন। শুধু তাই নয়, শহীদ পরিবারের সদস্যদের আইনগত সহায়তা না করে বিষয়টি ভিন্ন খাতে প্রবাহের ফাঁদ পেতেছিলেন।
পুলিশের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, শহীদ পরিবারের বাড়ি দখলে মূল ভূমিকা পালনকারী হিসেবে লালবাগ জোনের তৎকালীন ডিসি ইব্রাহিম খান ও বংশাল থানার তৎকালীন ওসি শাহিদুর রহমানের নাম উঠে আসে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, পুলিশের এই দুই কর্মকর্তা ৩ কোটি টাকার বিনিময়ে ভূমিদস্যুদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের সদস্যদের থাকার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বরাদ্দ করা বাড়িটি রাতারাতি দখল করে নেয়। ঘটনার পর বংশাল থানা পুলিশের সাজানো মামলার ফাঁদে পড়ে নানা ধরনের হয়রানির মুখে পড়েন ওই পরিবারের সদস্যরা। এরপর তারা বাধ্য হয়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে আইজিপির কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। পরে আইজিপি ড. জাবেদ পাটোয়ারীর নির্দেশে গঠিত কমিটির প্রতিবেদনে আড়ালের ঘটনা বেরিয়ে আসে।
এদিকে দায়ী পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গৃহীত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের খবরে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের সদস্যরা। আজহারুল হক খানের ছেলে শামসুল হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই খবরে আমরা খুশি হয়েছি। এজন্য পুলিশ কমিশনারকে ধন্যবাদ জানানোর জন্য গিয়েছি। আইজিপি মহোদয়ের কাছেও সন্তুষ্টি প্রকাশের জন্য যাব।’
শামসুল হক খানের ভাই আজহারুল হক খান বলেন, ‘৪৩ বছর ধরে আমরা এই জায়গা ভোগ-দখল করছিলাম। একজন বুদ্ধিজীবী পরিবারের লিজপ্রাপ্ত জমি ও ভবন প্রকাশ্যে সংঘবদ্ধ বিএনপির ক্যাডার বাহিনীর সন্ত্রাসীরা দখল করে নিয়েছে। পুরান ঢাকার ত্রাস ও ভূমিদস্যু জাবেদের নেতৃত্বে বাসায় লুটপাট চালিয়ে ভবন ভাঙচুর করেছে। পুরো ভবন মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে। অথচ জেলা প্রশাসনের সম্পত্তি জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন রক্ষা না করে উল্টো নানাভাবে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে।’