বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অভিন্ন নীতিমালা বেমানান

গত কিছুদিন ধরে সংবাদ আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুমুল আলোচনার বিষয়, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ে নেই; থাকলেও কেন অবস্থান এত পেছনে। কত যে বিচিত্র বিশ্লেষণ, তার ইয়ত্তা নেই। ছাত্র ও শিক্ষকদের রাজনীতি থেকে শুরু করে র‌্যাংকিং ঘোষণাকারী প্রতিষ্ঠানের টাকা চাওয়া পর্যন্ত কত রকমের কারণ যে আমরা শুনলাম! তবে একটা বিষয়ে মোটামুটি সকলেই একমত, আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের ‘মান’ কমছে।

শিক্ষকদের সেই ক্রমনিম্নমুখী মানের পতন ঠেকাতে নানা রকম উদ্যোগের কথাও শোনা যাচ্ছে। তারই একটি, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের নিয়োগ ও পদোন্নতির একটি অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন। উদ্যোগটি মূলত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের; গত মাসে মন্ত্রণালয়ে এ নিয়ে একটি বৈঠকে এই নীতিমালা চূড়ান্ত করার কথা ছিল। সেই বৈঠকে শিক্ষক প্রতিনিধি না থাকা, এবং শিক্ষকদের তুলনায় আমলাদের প্রতিনিধিত্ব বেশি থাকা নিয়ে বিস্ময় ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। বৈঠকটি শেষ পর্যন্ত হয়নি, তাই আপাতত ঝুলে আছে এই নীতিমালা।

মন্ত্রণালয়ের সেই বৈঠকে শিক্ষক প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়নি সত্যি, কিন্তু তারচেয়েও বড়, নির্মম সত্যি হলো বৈঠকে যে নীতিমালার খসড়াটি চূড়ান্ত করার কথা সেটি কোনো আমলার করা নয়! বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তত্ত্বাবধানে মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়েই গঠিত একটি কমিটি এই সুপারিশ করেছে। এ ব্যাপারে শিক্ষকদের নির্বাচিত প্রতিনিধি, মানে শিক্ষক সমিতি ফেডারেশনের নেতাদের মতামতও নেওয়া হয়েছে।

অন্য যে কোনো নীতিমালার মতো এই নীতিমালাতেও নিশ্চয়ই কিছু ভালো কথাও আছে, সেই সঙ্গে কোনো না কোনো ‘যুক্তি’ দিয়ে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়েছে এর সমালোচনাযোগ্য ‘নীতি’গুলোকে। কিন্তু সম্ভাব্য এই ভালোমন্দের বিচার করার আগেই আসলে এই নীতিমালা বাতিলের দাবি তোলা উচিত ছিল। কারণ, ‘অভিন্ন নীতিমালা’ বিষয়টাই তো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনের ধারণার সঙ্গে বেমানান! আমরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে দেখতে চাই, নিজেরাও র‌্যাংকিং করতে চাই, আবার সেই সঙ্গে চাইব র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষে থাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর তলানিতে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ-পদোন্নতির নীতিমালা অভিন্ন হবে, এটা কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না। পৃথিবীর কোনো দেশেই হয় না। অক্সফোর্ড কিংবা কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় যে যোগ্যতার বিচারে শিক্ষক নিয়োগ দেয়, সেই একই যোগ্যতা মাপকাঠি হলে ইস্ট লন্ডন বা উইম্বলডন ইউনিভার্সিটি কোনো শিক্ষকই নিয়োগ দিতে পারবে না। তেমনি, যত দুর্বলতাই থাকুক শতবর্ষী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর সদ্য প্রতিষ্ঠিত নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে এক পাল্লায় মাপার কোনো সুযোগ নেই। বাস্তবে কোনো র‌্যাংকিং না থাকলেও শিক্ষার্থীসহ সকল স্টেকহোল্ডারদের মধ্যেই একটা কাল্পনিক র‌্যাংকিং আছে, আর সেই র‌্যাংকিংয়ের সূত্র ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেলে কোনো শিক্ষার্থী যেমন নোবিপ্রবিতে যেতে চাইবেন না, তেমনি খুব উজ্জ্বল ব্যতিক্রম ছাড়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে কোনো শিক্ষক এমনকি ঢাকা শহরেই অবস্থিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও যেতে চাইবেন না। মুদ্রার উল্টো পিঠটাও লক্ষণীয় আমাদের বিভাগেই এমন একজন শিক্ষক আছেন, যিনি আর কয়েকমাস চাকরি করলে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেতেন এমন অবস্থায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার পদে যোগ দিয়েছিলেন। সহযোগী অধ্যাপক হতে তার আরও প্রায় আট বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে, কিন্তু তিনি তাতে অখুশি নন।

এটাই কিন্তু স্বাভাবিক, র‌্যাংকিং তো এই সেদিনের বিষয়, তার বহু আগে থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আছে সুনাম ও মর্যাদা, আছে গ্রহণযোগ্যতার মাত্রা। অক্সফোর্ড-কেমব্রিজ-এমআইটির সঙ্গে তুলনীয় নয়, কিন্তু আমাদের বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তো বাংলাদেশের সেরা। তাদের নীতিমালা আর নতুন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ-পদোন্নতির নীতিমালা অভিন্ন না হওয়াই বাঞ্ছনীয়। শুধু নীতিমালাই বা কেন, সব বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন-কাঠামোও আসলে অভিন্ন হওয়ার কথা নয়। যোগ্যতর ব্যক্তিকে প্রয়োজনে অনেক বেশি বেতন দিয়ে ধরে রাখাটাই বিশ্বজুড়ে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দস্তুর। এমআইটিতে যিনি সহকারী অধ্যাপক, সিটি ইউনিভার্সিটি অফ নিউ ইয়র্ক তাকে নিতে চাইলে উচ্চতর পদমর্যাদা ও বেতন দিতে হবে, নইলে তিনি সেখানে যাবেন কেন? এই দস্তুর জন্মলগ্নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও ছিল, কাগজে-কলমে এখনো আছে। সে কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পদে আবেদনের যে নির্ধারিত ফর্ম, তাতে একটা কলাম আছে, যেখানে আবেদনকারীর কাছে জানতে চাওয়া হয় ইপ্সিত বেতন কত চাইছেন তিনি।

তর্কের খাতিরে ধরা যাক, বিশ্বজুড়ে চর্চিত এই প্রক্রিয়াটিকে আমরা বাতিল করে দিলাম, আমাদের দেশের সববিশ্ববিদ্যালয়কে আমরা একই মানে দেখতে চাই। ঢাকা আর নোয়াখালীতে যেন কোনো পার্থক্য না থাকে। তাহলে নীতিমালাটা অভিন্ন হতেই পারে। কিন্তু কেমন হওয়া উচিত সেই অভিন্ন নীতিমালা? দুঃখের বিষয়, প্রস্তাবিত নীতিমালাটির অনেকগুলো নীতি আক্ষরিক অর্থেই আত্মঘাতী! বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কিন্তু কেবলই শ্রেণিকক্ষে পাঠদান নয়, গবেষণা ও সেই সূত্রে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা বিষয়টিকে অবহেলা করে আসা হয়েছে, প্রস্তাবিত নীতিমালাতে সেটি আরও প্রকটভাবে দৃশ্যমান।

একেবারে শুরু থেকেই ধরা যাক। এন্ট্রি লেভেল, মানে লেকচারার পদে আবেদনের যোগ্যতা নির্ধারণ করতে গিয়ে অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ের ফলাফল আগে থেকেই বিবেচ্য ছিল, এবার তার সঙ্গে যোগ করা হয়েছে এসএসসি ও এইচএসসি পর্যায়ের ফলাফলও। তার মানেটা দাঁড়াচ্ছে, একজন শিক্ষার্থী, এসএসসি পরীক্ষায় যদি কোনো কারণে খারাপ করে ফেলে, তাহলে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার সম্ভাবনা সেখানেই শেষ; পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যতই ভালো করুক, বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করুক, কোনো লাভ নেই, প্রথম ছাঁকনিতেই আটকে যাবে তার শিক্ষক হওয়ার সম্ভাবনা। বিশ্বজুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগের প্রথম শর্তই হলো পিএইচডি ডিগ্রি থাকা, আর সেই পিএইচডি অভিসন্দর্ভের মান এবং তৎপরবর্তী গবেষণায় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাই মূল বিবেচ্য। কিন্তু এখানে সেই ডিগ্রির মূল্য কেবলই ‘অন্যান্য যোগ্যতা সমান থাকলে’ অগ্রাধিকার পাওয়া, তার মান কিংবা খ্যাতিমান জার্নালে প্রকাশিত গবেষণামূলক নিবন্ধের কোনো মূল্যই নেই!

এখানেই শেষ নয়, লেকচারার নিয়োগে দক্ষতা যাচাইয়ে একটি লিখিত বাছাই পরীক্ষা আয়োজনের প্রস্তাব করা হয়েছে এই নীতিমালায়। দৃশ্যত মন্দ নয় ব্যাপারটি, শুধু একটি মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগের বর্তমান পদ্ধতির চেয়ে ভালোই হওয়ার কথা। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতা যে অন্য রকম! এই যেমন কিছুদিন আগে দেশের একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এ রকম একটি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল, যেখানে বিজ্ঞানসংশ্লিষ্ট বিষয়ের লেকচারার পদপ্রার্থীদের জন্য প্রস্তুতকৃত প্রশ্নে তাদের নিজের বিষয় থেকে কোনো প্রশ্ন না রেখে রাখা হয়েছিল তথাকথিত ‘সাধারণ জ্ঞান’ বিষয়ক, মূলত রাজনৈতিক প্রশ্ন। এমন প্রশ্নে যে বাছাই পরীক্ষা হবে, তা থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সেরা প্রার্থীকে কেমন করে খুঁজে নেওয়া যাবে? উদ্দেশ্য মহৎ হলেও এই নীতিমালা আসলে প্রায়োগিক দিক থেকে সর্বনাশ ডেকে আনবে, কারণ এই বাছাই পরীক্ষার ছাঁকনিতেই তুলনামূলক যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দিয়ে, অ্যাকাডেমিক যোগ্যতায় পিছিয়ে থাকা পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার পেছনে যুুক্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।

পিএইচডি না থাকলে এখনকার পৃথিবীর কোনো দেশেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া যায় না। আমাদের দেশের বাস্তবতায় না হয় এন্ট্রি লেভেলে সেই সুযোগ রাখা হলো, কিন্তু ভালো মানের পিএইচডিধারী যোগ্য প্রার্থী পাওয়া গেলে কেন তাকে প্রাধান্য দেওয়া হবে না? বিস্ময়কর হলেও সত্যি, প্রস্তাবিত নীতিমালায় কেবল এন্ট্রি লেভেলেই পিএইচডি ছাড়া নিয়োগের ব্যবস্থা রাখা হয়নি, পিএইচডি ছাড়া প্রফেসর পদে পদোন্নতির সুযোগও রাখা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, এ ক্ষেত্রে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে যে যোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারিত আছে, তা-ও শিথিল করার সুপারিশ করা হয়েছে।

অন্যদিকে কিন্তু কঠিন করে তোলা হয়েছে প্রফেসর হওয়ার পরের পদোন্নতির সোপানকে। প্রফেসর হওয়ার পরের পদোন্নতি? বিস্ময়কর এই পদ্ধতিটি বাংলাদেশের অতি সাম্প্রতিক আবিষ্কার! ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন-কাঠামো চালু হওয়ার আগে পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসররা ছিলেন জাতীয় বেতন স্কেলের দ্বিতীয় গ্রেডে, জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে তাদের এক-চতুর্থাংশ প্রথম গ্রেডে যেতে পারতেন। কিন্তু এই বেতন-কাঠামোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরদের বেতন-ক্রম নির্ধারিত হয়েছে তৃতীয় গ্রেডে। সেখান থেকে দ্বিতীয় গ্রেডে উঠতে হলে বেশ কিছু শর্ত পূরণ করতে হবে (শর্তগুলো অবশ্য দৃশ্যত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের চাকরির সঙ্গে মানানসই)। দ্বিতীয় গ্রেডে যারা উঠবেন, তাদের মধ্য থেকে মাত্র ১৫ শতাংশ শেষ পর্যন্ত যেতে পারবেন প্রথম গ্রেডে। এই বেতন-কাঠামোতে অবশ্য এর ওপরেও আছে সুপার গ্রেড, সেখানে প্রফেসররা যেতে পারবেন না কোনোদিনও!

এই যদি হয় আমাদের নীতিমালা, এবং মুড়ি-মিছরির এক দরের মতো করে সেটাকে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ‘অভিন্ন’ করা হয়, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিংয়ে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন না দেখাই ভালো।
লেখক

সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়