পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ছিলেন সবচেয়ে কৃপণ

রুগ্ণ চেহারা আর জামাকাপড় দেখে মনে হতো তিনি হয়তো কোনো রাজবাড়িতে বাবুর্চির কাজ করেন। কিন্তু এই বেঁটেখাটো মানুষটিই ছিলেন অবিশ্বাস্য পরিমাণ সম্পদের মালিক। হায়দরাবাদের নিজাম থাকাকালীন তিনিই ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি। মীর উসমান আলী খানের কৃপণতা এবং দানশীলতার বিভিন্ন কাহিনী নিয়ে লিখেছেন আন্দালিব আয়ান

এত কৃপণ!

বিপুল ধনসম্পদের মালিক হয়েও সবচেয়ে সস্তা ব্র্যান্ডের সিগারেট খেতেন মীর উসমান আলী খান। তবে, কিনে খেতেন খুবই কম। তার কাছে আসা অতিথিদের কাছ থেকে চেয়ে খেতেন বেশি। নিজের জামাকাপড় ছিঁড়লে দর্জিকে পয়সা দিতে হবে এই ভেবে নিজের হাতেই তা সেলাই করতেন। তার পরা পোশাক জোড়াতালি দিয়ে আবার পরতে হতো বাড়ির কিশোরদের। ছিঁড়ে একেবারে ব্যবহার অনুপযোগী না হলে বাড়িতে নতুন জামা বা জুতা কোনোভাবেই ঢুকত না।

জানা যায়, পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ধনসম্পদের মালিক এবং একজন প্রভাবশালী শাসক হয়েও তিনি রাস্তার দোকানে খাবার খেয়ে দাম নিয়ে দোকানদারের সঙ্গে প্রায়ই ঝগড়া করতেন। তার বাড়িতে কাজ করা আরদালিদের কেউ কোনো দিন এক সিকি বকশিশ পেয়েছে এমন উদাহরণ দিতে পারেনি।

কৃপণতা সত্ত্বেও উসমান আলী ছিলেন অমিত প্রভাবশালী একজন ব্যক্তি। নিজ দেশ তো বটেই ব্রিটিশদের কাছেও তিনি ছিলেন সম্মানের পাত্র। একদিকে তিনি যেমন ছিলেন কৃপণ অন্যদিকে তিনিই আবার দানশীলতায় ছাড়িয়ে গেছেন সবাইকে। হায়দরাবাদের এই নিজামের কৃপণতা আর দানশীলতার গল্প এখনো মনোযোগ কাড়ে মানুষের।

হায়দরাবাদের শেষ নিজাম

ভারতে ব্রিটিশ শাসন চলার সময়ও কিছু শর্তের অধীনে স্বাধীন রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল হায়দরাবাদ। মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পর ১৭২৪ সালে নিজাম উল-মুলক আসফ জাহ হায়দরাবাদ রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তখন থেকে নিজামরাই ছিলেন ওই অঞ্চলের শাসক। এই রাজ্যের শেষ ও সপ্তম নিজাম ছিলেন মীর উসমান আলী খান। পিতা মীর মাহবুব আলী খান সিদ্দিকীর মৃত্যুর পর ১৯১১ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত হায়দরাবাদ ও বেরার রাজ্য শাসন করেন তিনি।

১৯৪১ সালের শুমারি অনুযায়ী, ২ লাখ ১৪ হাজার ১৮৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের হায়দরাবাদ ছিল পরাধীন ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য। বাংলাদেশের চেয়েও যা প্রায় দেড় গুণ বড়। রাজ্যের জনসংখ্যা ছিল ১ কোটি ৬৩ লাখ ৪০ হাজার।

ব্রিটিশদের কাছ থেকে পাক-ভারতের স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত ৫৬৫টি আপাত স্বাধীন রাজ্য ছিল। যারা নির্দিষ্ট পরিমাণ কর আর অন্য রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি না করার শর্তে ব্রিটিশ ভারতে আংশিক স্বাধিকার ভোগ করত। এসব রাজ্যের মধ্যে প্রভাবশালী রাজ্যগুলোর শাসকরা ব্রিটিশ ভারতের রাজধানীতে প্রবেশ করলে বন্দুকের গুলি ছুড়ে (গান স্যালুট) সম্মান জানানো হতো। এই রাজ্যগুলোকে বলা হতো স্যালুট স্টেট। মর্যাদার ভিত্তিতে সর্বনিম্ন তিনটি থেকে সর্বোচ্চ ২১টি গান স্যালুট দেওয়া হতো। হায়দরাবাদের নিজাম সর্বোচ্চ ২১টি স্যালুট পেতেন। জম্মু ও কাশ্মীর, গোয়ালিয়র ও বারোদা এবং মহীশূরের মহারাজারাও এই সম্মান পেতেন। তবে শীর্ষ সম্মানের ছিলেন হায়দরাবাদের নিজাম। মুঘল আমলেও হায়দরাবাদ ছিল একটা স্বতন্ত্র অঞ্চল।

১৯১১ সালে সর্বশেষ নিজাম উসমান আলী যখন মসনদে আরোহণ করেন, সে সময় রাজকোষ প্রায় শূন্য হতে চলেছিল। পিতা মাহবুব আলী ছিলেন উসমান আলীর সম্পূর্ণ বিপরীত। মাহবুব আলীর অমিতব্যয় এবং উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনে এক সময় রাজকোষের এমন করুণ দশা হয়। মীর উসমান আলী ক্ষমতা গ্রহণের পরই রাজ্যের আর্থিক অবস্থা ফিরতে থাকে। তার ৩৭ বছরের শাসনামলে রাজকোষ ফুলেফেঁপে ওঠে। তার ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণও ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়।

বিপুল ধনসম্পদ

হায়দরাবাদের সর্বশেষ নিজাম উসমান আলী খানের ধনসম্পদের গল্প আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। এক সময় তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হতো। সেই ১৯৪০-এর দশকের শুরুর দিকে তার ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্পদ ছিল। ১৯৩৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি টাইম ম্যাগাজিনে পৃথিবীর সবচেয়ে সম্পদশালী ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করে প্রচ্ছদে তার ছবি ছাপা হয়। দীর্ঘদিন বিশ্বের শীর্ষ ধনীর খেতাবটা তার দখলেই ছিল। টাইম ম্যাগাজিনে নিজাম উসমান আলী খানকে ‘ঐরং ঊীধষঃবফ ঐরমযহবংং’ বলে সম্বোধন করা হয়, যেখানে অন্যদের সম্বোধন করা হয় ‘ঐরং ঊীপবষষবহপু’ বলে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ২৫ লাখ পাউন্ড দান করে ব্রিটিশদের কাছে সম্মানের পাত্র হয়েছিলেন তিনি। ১৮৫ ক্যারেট ওজনের প্রকা- এক হীরা ব্যবহার করতেন পেপার ওয়েট হিসেবে। পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম এই হীরাটির বর্তমান মূল্য হাজার কোটি টাকারও বেশি। এছাড়া মুক্তা, পান্না, চুনি মিলিয়ে তার হাতে ছিল প্রায় ১৭০টিরও বেশি রতœ। পৃথিবীর সবচেয়ে দামি রোলস রয়েসের পঞ্চাশটিরও বেশি মডেল রাখা ছিল তার গ্যারেজে। তার কাছে যে পরিমাণ মুক্তা ছিল, তাতে একটি অলিম্পিক সাইজের সুইমিংপুল ভর্তি হয়ে যেত। 

রানী এলিজাবেথের বিয়ের সময় একটি হীরার নেকলেস দিয়েছিলেন এই নিজাম। বহুমূল্যবান ওই নেকলেসটি এখনো ব্রিটিশ রাজপরিবারের অমূল্য সম্পদ। আজও রানীর ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায় ‘নিজাম নেকলেস’ নামে এটি বিখ্যাত। শুধু তা-ই নয়, বলা হয় উসমান আলী খানের বাগানে অসংখ্য ট্রাঙ্ক ভর্তি স্বর্ণ মজুদ ছিল। আর ভূগর্ভে জমা ছিল প্রায় ২০ লাখ পাউন্ড নগদ অর্থ। তার মূল প্রাসাদে কর্মী ছিলেন ৬ হাজার। তার মধ্যে ৩৮ জনের কাজ ছিল শুধু ঝাড়লণ্ঠন মোছা।

ধারণা করা হয়, ১৯৬৭ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে সম্পদশালী ব্যক্তি ছিলেন। তার আয়ের মূল উৎস ছিল গোলকোন্ডা খনি। এটি ছিল একটি হীরার খনি। উনিশ শতকে বিশ্ববাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য করত হায়দরাবাদের হীরাগুলো।

রোলস রয়েসের গল্প

তখনকার দিনে ইংল্যান্ডের অভিজাত ও ধনী পরিবারগুলোর কাছে একটি রোলস রয়েস না থাকলে মান থাকত না। এই রোলস রয়েস গাড়ির খবর পৌঁছেছিল নিজাম উসমানের কানেও। তিনি কোনো কাজে একবার ইংল্যান্ড গিয়েছিলেন। সেই সফরেই তিনি একবার ঢুঁ মারলেন রোলস রয়েসের শো-রুমেও। একে তো ভারতীয়, তার ওপর পায়জামা-চাপকান পরা অবস্থায় তাকে নিম্ন শ্রেণির মানুষ ভেবে শো-রুমের লোকেরা ভাগিয়ে দিলেন।

এই অপমানের কথা কাউকে কিছু না বলে তিনি চলে যান ভারতে। এর কিছুদিন পর বাণিজ্যিকভাবেই রোলস রয়েস ভারতে আসে। ঊর্ধ্বতন ব্রিটিশ কর্মকর্তারাই ছিলেন সেগুলোর ক্রেতা। এই খবর শুনে উসমানও খবর পাঠালেন তারও দু-তিনটি চাই। এই খবর পেয়ে ভারতের ভাইসরয়ের পক্ষ থেকেই পাঠিয়ে দেওয়া হয় রোলস রয়েস। উসমান আলী সেই অপমান তখনো ভোলেননি। রোলস রয়েস হাতে পাওয়ার পর অদ্ভুত কাণ্ড করে বসলেন। সে সময় ভোরবেলা নিজামদের রাজপ্রাসাদ চৌমহল্লা প্যালেস, এর চারপাশসহ রাজ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পরিষ্কার করতে বেরোতেন ঝাড়ুদাররা। নিজাম উসমান আলী নিয়ম করলেন, এখন থেকে ঝাড়ুদাররা যাবে রোলস রয়েসে চেপে। ব্যয়বহুল এ গাড়ি চেপেই রাস্তা ঝাড় দেবেন তারা।

যথারীতি এই খবরও কানে যায় ভাইসরয়দের। তারা এসে নিজামের মান ভাঙান। উসমান আলীর গাড়িপ্রীতির কথা সবাই জানত। সে সময়কার বিলাসবহুল ও অভিজাত প্রায় সব কোম্পানির গাড়ির সংগ্রহ ছিল তার বিশাল গ্যারেজে। গাড়িগুলো এখনো তাদের সোনালি দিনের স্মৃতি হিসেবে রয়ে গেছে। তেলেঙ্গানা রাজ্য সরকারের তত্ত্বাবধানে গোটা প্যালেসটিই এখন জাদুঘর। স্থান পেয়েছে নিজামদেরই ব্যবহৃত জিনিসপত্র, অস্ত্রশস্ত্র, ছবি, নথি, দলিল, ইত্যাদি।

আরেকটি গল্প প্রচলিত আছে তাকে নিয়ে। একবার এক হাড়কাঁপানো শীতের রাতে উসমান শীতে কাঁপতে কাঁপতে তার আরদালিকে কম্বল কিনে আনতে বলেন। এও বলে দিলেন কম্বলের দাম যেন কিছুতেই ২৫ টাকার বেশি না হয়। কিন্তু এই টাকার মধ্যে শেষ পর্যন্ত কম্বল কিনতে না পেরে তার আরদালি ফিরে এসে জানায় ৩৫ টাকার নিচে কোথাও কম্বল কেনা যাবে না। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিটি আরদালির মুখে কম্বলের দাম শুনে পুরনো কম্বল গায়ে দিয়েই ঘুমিয়ে পড়লেন। সকালে ঘুম ভেঙেই তিনি বার্তাবাহকের মাধ্যমে বিকানিরের মহারাজার একটি অনুরোধ পান। বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটিতে হিন্দু ছাত্রদের জন্য কিছু সাহায্যের আবেদন। একটুও না ভেবে, তখনকার সময়ে এক লাখ টাকা তিনি পাঠিয়ে দেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে। অথচ এই মানুষটিই আগের রাতে দাম ১০ টাকা বেশি হওয়ায় একটি কম্বল কেনেননি।

কেমন শাসক ছিলেন

৩৭ বছর হায়দরাবাদের মসনদে ছিলেন উসমান আলী খান। রাজ্যের মোট বাজেটের ১১ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয় করতেন নিজাম উসমান আলী খান। তার আমলে হায়দরাবাদে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ছিল এবং গরিবদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষাব্যবস্থা চালু ছিল।

তৎকালীন হায়দরাবাদ স্টেটের মারাঠাওয়াড়া অঞ্চলে কৃষিক্ষেত্রে গবেষণা নিজামের অর্থায়নেই শুরু হয়। ১৯১৮ সালে পারভানিতে প্রথম পরীক্ষামূলক ফার্ম গড়ে তোলেন নিজাম। ১৯৪১ সালে তিনি নিজেই নিজের ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে নাম দেন হায়দরাবাদ স্টেট ব্যাংক। বর্তমানে যার নাম স্টেট ব্যাংক অব হায়দরাবাদ। ব্রিটিশ শাসিত ভারতে হায়দরাবাদই ছিল একমাত্র রাজ্য যাকে ব্রিটিশরা নিজস্ব মুদ্রা ব্যবহার করার অনুমতি দেয়। নিজামের মুদ্রার নাম ছিল, ‘উসমানিয়া সিক্কা’। এটি ‘হায়দরাবাদি রুপি’ হিসেবেও পরিচিত। নিজামের বিমানের শখও ছিল। তিনি ১৯৩০ সালে ‘হায়দরাবাদ এরো ক্লাব’ এবং বেগমপেট এয়ারপোর্ট প্রতিষ্ঠা করেন। এই বিমানবন্দর থেকে আকাশে ওড়ে ব্রিটিশ ভারতের প্রথম ব্যবসায়িক এয়ারলাইন্স নিজামের ডেকান এয়ারওয়েজ-এর ন্যাশনাল ও ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটগুলো।

হায়দরাবাদের নিজাম শিয়া মুসলমান হলেও তিনি ছিলেন ধর্মনিরপেক্ষ। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবাই তাকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসত। হিন্দু জমিদাররাও ছিল নিজামের প্রতি অনুগত। পাক-ভারতের স্বাধীনতার প্রাক্কালে নিজাম উসমান আলী খান প্রাথমিকভাবে পাকিস্তানে যোগদানের চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু ভৌগোলিক দূরত্বের জন্য তিনি পাকিস্তানে যোগদানের পরিকল্পনা পরিত্যাগ করে স্বাধীন থাকার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ভারতের তদানীন্তন উপ-প্রধান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল ভারতে যোগদানের দলিলে স্বাক্ষর করার জন্য হায়দরাবাদের নিজামকে চাপ প্রয়োগ করেন। হায়দরাবাদ সরকার সেই চাপ উপেক্ষা করে এবং ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট হায়দরাবাদকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে। চৌধুরী রহমত আলী এই রাষ্ট্রের নাম দিয়েছিলেন ‘উসমানিস্তান’। কিন্তু ভারত সরকার নিজামের এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে এবং আলোচনার টেবিলেও দুই পক্ষ কোনো সমাধান টানতে ব্যর্থ হন। শেষ পর্যন্ত ভারতীয় সেনাবাহিনী ১৯৪৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর হায়দরাবাদ আক্রমণ করে। এই আক্রমণের সাংকেতিক নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন পোলো’।

নিজামের পাঁচ হাজার সেনার পক্ষে ভারতের প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর স্থল ও আকাশ পথে হামলা প্রতিহত করা সম্ভব ছিল না। তাই কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হার মানেন নিজাম। তার হায়দরাবাদ ও বেরার স্টেট ভারতের মানচিত্রে একীভূত হয়। ১৯৫০ সালের ২৫ জানুয়ারি নিজাম মীর উসমান আলীকে হায়দরাবাদ স্টেটের রাজপ্রমুখ পদে অভিষিক্ত করে ভারত সরকার। সেই পদে তিনি ৩১ অক্টোবর ১৯৫৬ পর্যন্ত ছিলেন।

ভারতের জন্য অবদান

স্বাধীনতার পর ভারতীয় শাসকদের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক থাকলেও ভারতের জন্য তিনি মুক্তহস্তে দান করে গেছেন। ১৯৬৫ সালে ভারতকে চোখ রাঙাচ্ছিল চীন। তাদের দোসর ছিল পাকিস্তান। দেশকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচাতে ভারত তৈরি করল জাতীয় নিরাপত্তা তহবিল। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ছিলেন উসমান আলী খানের বন্ধু। তাই বন্ধুত্বের টানেই তিনি হায়দরাবাদে গেলেন এবং নিজামকে অনুরোধ করলেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা তহবিলে কিছু দান করার জন্য। সব শুনে মিটি মিটি হেসে নিজের সহকারীকে ডাকলেন উসমান। একটা কাগজে উর্দুতে কী একটা লিখে দিলেন। সেক্রেটারি কাগজটা তুলে চমকে উঠেই নিজেকে সামলে নিলেন। ভারতের নিরাপত্তা তহবিলে নিজাম উসমান আলী দিলেন ডোনেশন! চমকে গেল বিশ্ব। ওসমানের সাম্রাজ্যের তুলনায় তা সামান্যই বটে, মাত্র পাঁচ টন সোনা! শুধু তাই নয়, এর সঙ্গে যোগ করে দিলেন নগদ আরও ৭৫ লাখ টাকা। ১৯৬৫ সালে নিজামের দেওয়া ৫ হাজার কেজি সোনা এখনো ভারতের জাতীয় কোষাগারে দান হিসাবে দেওয়া সবচেয়ে বড় অর্থরাশি।

এই স্বর্ণ তহবিল দেওয়া নিয়েও একটি কাহিনী প্রচলিত আছে। ৫ টন স্বর্ণমুদ্রা ভর্তি ট্রাঙ্কগুলো যখন ভ্যানে লোড করা হচ্ছে। কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ানো নিজাম ভ্রণ কুঁচকে তার নিজস্ব অফিসারদের বলেছিলেন, ‘আমি কিন্তু পাঁচ টন স্বর্ণমুদ্রাই শুধু দান করেছি। ট্রাঙ্কগুলো নয়। তাই ওগুলো যেন আমাকে আবার ফেরত দেওয়া হয়, মনে রেখো।’ শুধু ভারত নয়, অস্ট্রেলিয়ার নৌবাহিনীর জন্যও তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ দান করেছিলেন।

ভারত ও বিদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে তিনি বিশাল অঙ্কের টাকা অনুদান হিসেবে পাঠাতেন। এর মধ্যে জামিয়া নিজামিয়া, দারুল উলুম দেওবন্দ, আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি, এমনকি বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটিও ছিল। তার তৈরি করা উসমানিয়া ইউনিভার্সিটি আজ ভারতের অন্যতম বৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয়। প্রচুর স্কুল, কলেজ, অনুবাদ কেন্দ্র নিজের হাতে গড়ে তুলেছিলেন নিজাম।

আজকের দিনে দিল্লিতে যে ঐতিহ্যশালী হায়দরাবাদ হাউজে ভারতের কূটনৈতিক সম্মেলনগুলো হয়, সেই প্যালেসটি নিজামের অর্থে বানানো। তার আমলে তিনি হায়দরাবাদ শহরেও তৈরি করেছিলেন তাক লাগানো কিছু প্রাসাদ। যেমন উসমানিয়া হসপিটাল, হায়দরাবাদ হাইকোর্ট, আসাফিয়া লাইব্রেরি (বর্তমানে স্টেট জেনারেল লাইব্রেরি), টাউন হল (বর্তমানে অ্যাসেম্বলি হল), জুবিলি হল, হায়দরাবাদ মিউজিয়াম (বর্তমানে স্টেট মিউজিয়াম), নিজামিয়া অবজারভেটরিসহ অগণিত প্রাসাদ ও মনুমেন্ট।

১৯৬৭ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ৮১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন নিজাম উসমান আলী খান। তার জানাজা ভারতের সর্ববৃহৎ জানাজাগুলোর একটি। দশ লাখেরও বেশি মানুষ সমবেত হয়েছিল উসমানের জানাজায়।