অন্তরে-বাহিরের ঋত্বিক

“১৯৬৮ সাল শেষ হয়ে এলো। আমার টেস্ট পরীক্ষা দেওয়ার পর সেদিন কলেজের শেষ ক্লাস। আমার ছেলের জন্মদিন। পাঁচ বছর পূর্ণ হবে। হঠাৎ দুটি ছেলে এসে বলে ‘রাস্তায় ঋত্বিকবাবু অজ্ঞান হয়ে গেছেন। মুখের ভেতরে একটা টাকার নোট।’... সেদিন কলেজে গিয়ে বন্ধুদের কাছে ভেঙে পড়েছিলাম। এরপর মাথায় অসহ্য যন্ত্রণার জন্য পড়াশোনা করতে পারতাম না। বন্ধুরা আসতেন, আলোচনা করতাম। এই ভাবেই পরীক্ষা কীভাবে শেষ করেছি জানি না। মরণপণ চেষ্টা। শেষ আমাকে করতেই হবে। ...পরীক্ষার শেষের দিন প্রিন্সিপালের সঙ্গে দেখা করে বলি ‘মমতাদি। আমার একটি চাকরির খুব দরকার।’...”

 

এর পরের বছর ১৯৬৯-এ ঋত্বিককে মেন্টাল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। স্বামীর চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিজেও মানসিক ডাক্তারের রোগী হয়ে উঠেছেন তখন। ‘সাতটি মাস তিনটি ছেলেমেয়েকে নিয়ে একা ওই বাড়িতে ছিলাম। কেউ কোনোদিন আসেননি, হাসপাতালেও না। নারায়ণ অফিস-ফেরত আসত, মহেন্দ্রও খোঁজ নিয়ে যেত। বাবা শিলংয়ে জন্ডিসে অসুস্থ, ভাইটি অনেক দূরে মহীশূরে। সংসার চালাবার টাকা তারা পাঠিয়ে দিতেন।’

মেন্টাল হাসপাতালের ডাক্তারবাবু নিজেই রোগী ঋত্বিককে নিয়ে ঘুরতে বের হতেন। কখনো রাইটার্স বিল্ডিং, ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, রেডিও অফিসের ছাদে, ক্রিকেট খেলা দেখতে এমনকি বাড়িতেও আনতেন। মাঝে মাঝে পরিস্থিতি বোঝার জন্যে একাও ছাড়তেন ঋত্বিককে। “কিন্তু বাড়িতে এলেই তো ‘লক্ষী, পয়সা দাও, ড্রিঙ্ক করব’!”

একটা চাকরির জন্য লক্ষ্মী অর্থাৎ সুরমা ঘটক তখন হন্যে হয়ে ঘুরছেন। চাকরি পেলেই তিনটে বাচ্চা নিয়ে দূরে

কোথাও চলে যাবেন। বাচ্চাদের বাঁচাতে হবে, মানুষ করতে হবে। ‘বহু চেষ্টা বহু প্রতীক্ষা বহু অপেক্ষার পর’ শিলং-এ একটা স্কুলে চাকরি পাওয়ার পর বারো বছরের সংসার গুটিয়ে নিতে হয়েছে। সুরমার বাবা খুব স্নেহ করতেন ঋত্বিককে। শ্বশুরমশাইকে ঋত্বিক বললেন, ‘বাবা! আমার মদ খেয়েই জীবন কাটবে। লক্ষ্মী যাচ্ছে, খুব ভালো করছে।’ বাড়ির বই, রেকর্ড এমনকি পাখাগুলোও বিক্রি করে মদ খাওয়ার অদম্য নেশায় আক্রান্ত তখন তিনি। কিন্তু সংসার ছাড়া মানে ‘মৃত্যুপুরীর জীবন’ থেকে বের হওয়া কেবল। কিন্তু ঋত্বিককে আদৌ ছাড়তে পারেননি সুরমা।... যে পর্যন্ত জানা হলো তা এ বইয়ের খ-াংশ মাত্র। মনে হতে পারে, বইজুড়ে একজন শক্তিমান সৃজনশীল অথচ মদ্যপ অবিবেচক স্বামীর সমালোচনা করা হয়েছে হয়তো। কিন্তু আদতে এ বই যে-কোনো পাঠকের জন্যই এক অন্যমাত্রার অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে।

 

কোলকাতায় ঋত্বিকের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার আগেই বাম-রাজনীতিতে সক্রিয়তার জন্য শিলং-এ দুই বছর জেল খাটার অভিজ্ঞতা হয়েছিল সুরমার। সে কথা লেখা আছে তার শিলং জেলের ডায়েরি বইয়ে।  ততদিনে ঋত্বিক তার প্রথম চলচ্চিত্র ‘নাগরিক’ শেষ করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্বাসকে চলচ্চিত্র আর নাটকের মধ্য দিয়ে শিল্পে পরিণত করে একটা ‘এডুকেটেড’ শ্রেণি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন তিনি। সুরমার সঙ্গে পথ হেঁটেছেন একই পার্টি আর নাটকের দলের সূত্রে। শুরু থেকেই ঋত্বিকের সঙ্গে মেলামেশায় সাবধান করেছেন তাকে অনেকেই। জেনেছিলেন, ঋত্বিক ‘ভীষণ ইনটেলেকচুয়াল কিন্তু ভীষণ ট্রটস্কাইট।’ বক্তৃতা শুনে, ‘বিসর্জন’ নাটকে রঘুপতির চরিত্রে অভিনয় দেখে, ‘নাগরিক’ দেখতে দেখতে পর্দার পেছনের পরিচালকের অন্য জীবন দেখানোর যুক্তিতে, আর তারই লেখা ও পরিচালনা ‘দলিল’ নাটক, যেটি সর্বভারতীয়  বোম্বে সম্মেলনে পুরস্কার পেয়েছিল, গণনাট্য সংঘের সেই নাটকে একটা ভিড়ের দৃশ্যে একটুখানি অভিনয় করেছিলেন সুরমা... নাটক শেষে ধন্যবাদ জানাতে এসে, দিনের পর দিন রাস্তায় হেঁটে হেঁটে রাজনৈতিক ও শিল্প বিষয়ে স্বপ্ন বিনিময় করতে করতে কোনো এক মুহূর্তে জীবনের লক্ষ্য তাদের এক বিন্দুতে মিশে গেছে।

 

১৯৫৪-৫৫ এর দিকে, তাদের প্রেমের শুরুতে এক চিঠিতে সুরমাকে ঋত্বিক লিখেছেন, “আমি বোঝাতে চেয়েছি, ‘দেবী’ কথাটার যতগুলো পড়হহড়ঃধঃরড়হ আছে,Ñ ক্ষমা, স্নেহ, মমতা, নীরবতা, স্নিগ্ধতা। আরও যেন কী কীÑ সবগুলোর একত্রে বসবাস তোমার মধ্যে দেখেছি।” সেই দেখা কেন মিথ্যে হয়ে গেল! এ বইয়ের শেষ দিকে, উপসংহারেরও পরে ‘সুখে-দুঃখে একুশ বছর’-এ একটানে সুরমা তাদের পরিচয়-দাম্পত্য-পারিবারিক আবহাওয়া-কাজের পরিবেশ এবং পরিণতি বর্ণনা করেছেন। প্রশ্ন উঠতে পারে, বইটির নাম ঋত্বিক এবং লিখছেন তারই সহধর্মিণী। অথচ উপসংহারেরও পরে এলো দাম্পত্য প্রসঙ্গ! এই বইটির লেখক সুরমা ঘটকের বিশেষত্ব এখানেই।

 

নিজের বেড়ে ওঠা বা পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে তেমন কিছু লেখেননি সুরমা ঘটক। তবে, বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এইটুকু জানিয়েছেন যে, যে-কোনো ডকুমেন্ট গুছিয়ে রাখার মতো একটা ভালো গুণ তার বরাবর ছিল। ফলে, এ বইয়ের প্রথম সাতটি অধ্যায়ে এমন এক ঋত্বিককে তিনি তুলে ধরেন যা তার ঐ ভালো গুণটির ফলেই সম্ভব হয়েছে।

 

ঋত্বিকের লেখা সমস্ত চিঠি তিনি সযতেœ রেখেছেন। শুধু তাকে লেখা চিঠিই নয়, বিভিন্ন প্রয়োজনে অন্যদেরও যেসব চিঠি লিখেছেন তার ড্রাফট রেখেছেন। বিভিন্ন পত্রিকায় ছাপা হওয়া প্রবন্ধ। এমনকি বক্তৃতার ড্রাফটও। এ বইয়ের প্রথম সাতটি অধ্যায়ে ঋত্বিকের লেখা চিঠি আর প্রাসঙ্গিক প্রবন্ধের অংশবিশেষ থেকে ব্যক্তি মানুষটিকে স্পর্শ করা যায়। সেই মানুষটি দেশভাগের ভয়াবহ শিকার, সেই মানুষটির অন্তরে ফেলে যাওয়া শৈশবের স্মৃতি দগদগে ঘা হয়ে আছে! সেই মানুষটির বুকের মধ্যে পূর্ববঙ্গের নদীর স্রোত বয়ে চলে। ঢাকের বাদ্যি বাজে, কাশফুল দোল খায়! সেই মানুষটি নাটক-পাগল থিয়েটার-অন্তপ্রাণ! হাসপাতালে অসুস্থ শরীরেও নাটক লেখেন। নাটক পরিচালনাই শুধু নয়, অভিনয়ও করেন। নাটকে ছড়িয়ে দিতে চান নিজের রাজনৈতিক বোধ।

 

সেই মানুষটির রাজনৈতিক জ্ঞান টনটনেÑ পার্টির জন্য একটা ‘সাংস্কৃতিক লাইন’ যে কতটা জরুরি সে বিষয়ে প্রস্তাবনা লিখে জমা দেন সিনিয়র নেতাদের কাছে আর নেতারা তা অবহেলায় ফেলে রাখেনÑ হারিয়ে ফেলেন! সেই মানুষটি চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত অল্প আয়ের খেটে খাওয়া শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা নিয়ে সোচ্চার। সেই মানুষটি পুনায় ঈর্ষণীয় শিক্ষক হয়ে ওঠেন। আবার সেখান থেকেই ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে হতাশ মনে ফিরে আসেন। সেই মানুষটি বোম্বে থেকে ভালো কাজ মানে, মন ভরে কাজ করবার স্বাধীনতা আছে যে কাজে তেমন প্রস্তাব পেলে শিশুদের মতো উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন! সেই মানুষটি গান ভালো বোঝেন...বাহাদুর খাঁয়ের কাছে সরোদ শিখতে যান। সেই মানুষটির সিনেমার জন্য রবিশংকরের সুর করা ঘুমপাড়ানি গান ‘সোনা ছেলে, ভালো ছেলে আর কেঁদো না। পরীরানী আসবে খনি’ Ñশুনে বোম্বে বসে ছেলের কথা মনে পড়ে আর  বাড়িতে ‘ফিরে এসে এই গান রোজ ছেলেকে গেয়ে শোনাতেন আর বাইরে নিয়ে গিয়ে পায়রা দেখাতেন রোজ সকালবেলা।’

 

সেই মানুষটি একটু সচ্ছলতার জন্য স্ত্রীকে আরও যোগ্য হয়ে উঠবার উৎসাহ দিতে থাকেন। নিজেও আরও কিছু বাড়তি আয়ের জন্যে শর্টহ্যন্ড শিখতে চান। সেই মানুষটির রয়েছে ভারতীয় দর্শন-ইতিহাস-ঐতিহ্য আর মিথোলজির সংমিশ্রণেই নিজস্ব চলচ্চিত্র গড়ে তুলবার সংকল্প। সেই মানুষটি চলচ্চিত্রের সস্তা বাজারি আবদারের কাছে কিছুতেই আপোস করতে রাজি নন। একের পর এক তথাকথিত ‘ব্যবসা অসফল’ ছবি, আর্থিক বিপর্যয়ের মধ্যেও সেই মানুষটি ১৯৬৩-৬৪-এ ‘মানব সমাজ, আমাদের ঐতিহ্য, ছবিকরা ও আমার প্রচেষ্টা’ প্রবন্ধে দর্শকদের উদ্দেশে লেখেন, ‘আপনারা আমাদের অনুভব করুন, বুঝুন, আমরা একটা বহতা নদীর মাঝ দিয়ে বইছি, আজ এই মুহূর্তে আমরা যা, তাই আমাদের শেষ পরিণতি নয়। আমরা অনেক বড় হয়ে অনেকটা ছায়া দেব, শুধু জলসিঞ্চনের অপেক্ষা।...এই যে, একটা ঢাকনার মতো মানুষের সব শুভকে ঢেকে রেখেছে শুধু প্রাণধারণের গ্লানি, সেটা হঠাৎ যেদিন উঠে যাবে, সেদিন হাইড্রোজেন শক্তির পরিব্যাপনের মতো মানুষের ইচ্ছা আর ক্ষমতা ব্যাপ্ত হবে। সেদিন আমরা আর কাঁদুনি গাইতে আসব না। সেদিন রাস্তায় এত গুলিও চলবে না, এত মা-ও কাঁদবে না, আর আমরা চুটিয়ে ছবি করবই। কারণ, বহু পাঁচিল সেদিন ধসে যাবেই।’

 

বাইরের সংগ্রামী কর্মী ঋত্বিককে অনুভব করে নেওয়া যায় সুরমা ঘটকের পরিচ্ছন্ন পরিকল্পনায় অনুষ্টুপ থেকে প্রকাশিত এ বইয়ের প্রথম সাত অধ্যায়ে। তারপর একটা উপসংহারও টেনেছেন। তারপর সংক্ষেপে আবার লিখেছেন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘সুখে-দুঃখে একুশ বছর’ তারপর পরিশিষ্টে ঋত্বিকের চলচ্চিত্র বিষয়ক তথ্যাবলি। সাত অধ্যায় শেষে উপসংহারের ইতি টেনে লিখেছেন, ‘প্রথম যেদিন দেখেছিলাম বারবার মনে হয়েছিল একটি ঋজু চেহারা, ঋজু চরিত্র, নিজের বক্তব্যে সোচ্চার। আশ্চর্যভাবে আশা-নিরাশায়, সুখে-দুঃখে, সুস্থ ও অসুস্থ অবস্থায় ওই ঋজু মানুষটির বক্তব্য সোচ্চারই থেকেছে। এখানেই মানুষটির বৈশিষ্ট্য, এইখানেই তিনি ঋত্বিক। পুরোহিত। একদিন যাকে দেখে মনে হয়েছিল, বাংলাদেশের এক ছেলে মার্কসবাদে বিশ্বাস করে এগিয়ে নিয়ে যাবেন সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে, ভারতীয় ঐতিহ্যকে, আজ তার সৃষ্টি আলিঙ্গন করছে দেশ-বিদেশ ও মহাদেশকে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিজের বক্তব্যে সোচ্চার। এই আপোসহীন শিল্পী ও শহীদ। এবং নিজের শিল্পসৃষ্টিতে অনন্য এই ঋত্বিককে আমার প্রণাম।’

 

সুরমা ঘটক এভাবেই ‘সহধর্মিণী’র নতুন এক সংজ্ঞার্থ দাঁড় করান এ বইয়ে।

 

বই: ঋত্বিক, লেখক: সুরমা ঘটক, প্রকাশক: অনুষ্টুপ

 

লেখক

কবি ও অধ্যাপক